২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

নৌকার 'ঘাঁটি' ভুরুঙ্গামারীতে ভরাডুবির নেপথ্যে

সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়জয়াকার হলেও কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলায় ভরাডুবির জন্য দলের নেতাদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

আহসান হাবীব নীলু

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Apr 2016, 07:37 PM

Updated : 20 Aug 2022, 12:21 PM

নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য ভুরুঙ্গামারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহজাহান সিরাজ ও সাধারণ সম্পাদক নুরন্নবী চৌধুরী খোকনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এনে পদত্যাগপত্র দিয়েছেন ওই কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক মন্টু।

শনিবার তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর এ পদত্যাগপত্র জমা দেন।

ভুরুঙ্গামারী উপজেলাকে নৌকার দুর্গ উল্লেখ করে পদত্যাগী নেতা এমদাদুল হক মন্টু বলেন, ‘উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহজাহান সিরাজ ও সাধারণ সম্পাদক নুরন্নবী চৌধুরী খোকনের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং তৃণমূল নেতাকর্মীর মতামত উপেক্ষা করাই ভরাডুবির নেপথ্য কারণ।’

তার অভিযোগ এই দুই নেতা স্বজনপ্রীতি ও অর্থের বিনিময়ে দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করেছেন। এছাড়া, রাজাকারের সন্তানসহ বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীর সহদর ভাইকে প্রার্থী করার অভিযোগও আনেন তিনি।

গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফা ইউপি নির্বাচনে এ উপজেলার সাত ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টিতে পরাজিত হন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। এসব ইউপির তিনটিতে জাতীয় পার্টি, দুটিতে বিএনপি ও একটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।

তবে দেশের চিত্র ভিন্ন। ইসির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দ্বিতীয় পর্বে ৫৪ শতাংশ ভোট পড়েছে নৌকা প্রতীকে, ধানের শীষে পড়েছে ১৭ শতাংশ। প্রথম ধাপেও ৭১২ ইউপির মধ্যে আওয়ামী লীগ ৫৪০টিতে চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়।

এমদাদুল হক মন্টুর আনা অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নুরন্নবী চৌধুরী খোকন বলেন, ‘তৃণমুলের দেওয়া মতামতের ভিত্তিতে দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নির্বাচন করা হয়। পরে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা কাজ না করায় পরাজয় বরণ করতে হয়েছে।’

আন্ধারিরঝাড় ইউনিয়নে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার মূল কারণ দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী তার পক্ষে ছিল বলে জানান তিনি।

দুটি ইউনিয়নে রাজাকারের সন্তানদের মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘তাদের বাবা মুসলিম লীগ করলেও মানবতাবিরোধী অপরাধ করেননি। স্বাধীনতাযুদ্ধের বিরোধিতাও করেননি।

‘আর তাদের সন্তানরা নিষ্ঠার সাথে দীর্ঘ দিন থেকে আওয়ামী লীগের নিবেদিত প্রাণ। শুধু তাই নয় তারা গত ১০ বছর ধরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি।’ 

তবে ভুরুঙ্গামারী সদর ইউপির সদ্য বিদায়ী সভাপতি দুলাল হোসেন বলেন, ‘উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের চাহিদা মত এক লাখ টাকা না দেওয়ায় ৬ মাস পূর্বে আমাকে অব্যাহতি দিয়ে বিএনপি নেতা ইসমাইল হোসেনকে (অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য)  ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। যা গঠনতন্ত্র পরিপন্থি।’

তিনিও দলীয় কোন্দল, স্বজনপ্রীতি, অনিয়ম ও টাকার বিনিময়ে প্রার্থী নির্বাচন করায় এই ভরাডুবি কারণ মনে করেন।

আন্ধারিরঝাড় ইউনিয়নে বিজয়ী হয়েছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী রাজু আহমেদ খোকন। তিনি ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্মসম্পাদক ও ২নং ওয়ার্ডের যুবলীগের সভাপতি।

তিনি বলেন, ‘ইউনিয়নের বর্ধিত সভার আগে আমাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর যে তালিকা দেওয়া হয় সে মোতাবেক আমি দ্বারে দ্বারে গিয়ে চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার কথা জানাই।

`কিন্তু বর্ধিত সভায় দেখা যায় সে তালিকা বদলে আত্মীয় স্বজনের নাম ঢোকানো হয়েছে। আমি ২৬ ভোট পেয়ে হেরে যাই।’

তবে মাঠের নেতাকর্মীর সমর্থন পাওয়ায় তিনি বিদ্রোহ করে ঘোড়া মার্কা নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। তিনি পান ৫ হাজার ৩৭৯ ভোট। আর নৌকা মার্কার প্রার্থী পান ৫ হাজার ৫২ ভোট।

দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী মাঠে ছিল না উল্লেখ করে তিলাই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের পরাজিত প্রার্থী আবুল হোসেন মন্ডল বলেন, ‘ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম, ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি এবং ২নং ও ৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী ভোটে আমার বিরোধিতা করে।’

এছাড়া জাতীয় পার্টির লোকজন বিএনপির সাথে আঁতাত করায় এই ভরাডুবি হয়ে বলে ধারণা তার।

তিলাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে বর্ধিত সভায় কাউন্সিলররা টাকার বিনিময়ে ভোট দেয়ায় জনপ্রিয় প্রার্থী নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি।’

দলের সম্ভাব্য চার চেয়ারম্যান প্রার্থী আন্তরিকভাবে কাজ না করায় পরাজয় ঘটেছে বলে মনে করছেন তিনি।

তবে ভুরুঙ্গামারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহজাহান সিরাজ এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে রাজি হননি।