Published : 12 Sep 2026, 06:05 PM
বাগেরহাটে মশাবাহিত ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বেড়েছে। জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগকে।
এই জেলায় গত তিন মাসে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে দুই হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। মারা গেছেন তিনজন।
এর মধ্যে বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালেই গত তিনমাসে ৮৯৫ জন চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক অসীম কুমার সমদ্দার।
তিনি বলেন, জেলায় মে মাসে প্রথমে কচুয়া ও মোরেলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তি এলাকাতে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ দেখা দেয়। এরপর তা ধীরে ধীরে অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
হাসপাতালে ভর্তির রেজিস্ট্রারের বরাতে তিনি জানান, গত জুন মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২৬৩ জন, জুলাইয়ে ২৬১ জন। এরপর জুলাইতে ভর্তির রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৩৭১ জন হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন একজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, গত ৫ সেপ্টেম্বর মোরেলগঞ্জের পোলেরহাট এলাকার রহিমা বেগম (৭৩) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
তিনি আরও বলেন, “গত ১৫ দিন হলো ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা হুহু করে বেড়েই চলেছে। জনবল সংকটে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এই সীমিত জনবল নিয়ে তাদের সুচিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করছি। ”
রোগ প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. সাধন কুমার মিস্ত্রী বলেন, “বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন আক্রান্তরা চিকিৎসা নিতে ভর্তি হচ্ছেন হাসপাতালে। হাসপাতালে শয্যা সংকুলান না হওয়ায় মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে ডেঙ্গু আক্রান্তদের।
“আক্রান্তদের বেশির ভাগের বাড়ি মোরেলগঞ্জ উপজেলার দৈবজ্ঞহাটি ও কচুয়া উপজেলার বাধাল ও সাইনবোর্ড এলাকায়। এই এলাকা দুটি ডেঙ্গুর ‘হটস্পট’ বলে ধারনা করা হচ্ছে।”
হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগী পারভীন বেগম বলেন, “জ্বর, মাথা ব্যাথা, খাবারে অরুচি, শারীরিক দুর্বলতা হয়। জ্বর না কমার কারণে ডেঙ্গু পরীক্ষা করলে পজেটিভ হয়। রক্তের প্লাটিলেট অস্বাভাবিকহারে কমে যায়। এরপর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি।”
আরেক রোগী শহীদুল ইসলাম বলেন, “ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কয়েকদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছি। ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। এখন অনেকটাই সুস্থ। বাড়ির পাশে অনেকেই ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।”
বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. আ স মো. মাহবুবুল আলম বলেন, বাগেরহাটে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। এর মধ্যেই জেলায় তিনজন প্রাণ হারিয়েছেন। একজন জেলা হাসপাতালে, অন্য দুজন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারা গেছেন। তারা হলেন, কচুয়ার গোপালপুরের শামসুর রহমান (৭৫) এবং মোংলার তানিয়া (২৬)।
তিনি আরও বলেন, দিন দিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এখনই ডেঙ্গু রোগের লাগাম টানা না গেলে সামনে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন হবে। সামনে রোগীর চাপ আরও বাড়বে।
পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও অসচেতনতার অভাবে জেলাজুড়ে ডেঙ্গু রোগের বিস্তার দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে অভিযোগ চিকিৎসকের। ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাগেরহাট পৌরসভায় যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ছড়ানো ছিটানো থাকে। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভাল না। মশা নিধনের কীটনাশক ছিটানো হয় না। যার কারনে মশার উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ বিষয়ে বাগেরহাট পৌরসভার প্রশাসক মেজবাহ উদ্দীন বলেন, সারাদেশের মতো বাগেরহাটে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বেড়েছে। পৌরসভার পক্ষ থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছি। প্রতিদিনই পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে মশার লার্ভা কীটনাশক ছিটিয়ে নষ্ট করছি। ফগার মেশিন দিয়ে মশা নিধনের ওষুধ ছিটানো হচ্ছে।
এছাড়া কোনো ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলে পৌর কর্মীরা তার বাড়িতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দিচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে বাড়ির আঙিনা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতেও পৌরবাসীর প্রতি আহ্বান জানান এই কর্মকর্তা।