Published : 06 Mar 2026, 05:45 PM
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নবগঠিত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে চার মুক্তিযোদ্ধা হত্যা মামলার তিন নম্বর আসামিকে। এতে উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন কমিটি গঠন ও মুক্তিযোদ্ধা হত্যা মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছেন।
১৯৭৩ সালের ১০ মার্চ কোটালীপাড়া থেকে নৌকায় গোপালগঞ্জ শহরে ফেরার পথে টুপরিয়া নামক স্থানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউর রহমান লেবু, কমলেশ বেদজ্ঞ, বিষ্ণুপদ কর্মকার ও রামপ্রসাদ চক্রবর্তী মানিককে।
এ ঘটনায় পরদিন কোটালীপাড়া থানায় দায়ের করা হত্যা মামলার তিন নম্বর আসামি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম দাড়িয়া। তাকে এক সপ্তাহ আগে গঠন করা কোটালীপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে।
এই মামলাটির বাদী হয়েছিলেন কমলেশ বেদজ্ঞের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা লুৎফর রহমান গঞ্জর। মামলাটির বাদী পরির্বতন হয়ে দ্রুত বিচার আদালতে বিচারাধীন। বর্তমানে বাদী হয়ে বিচার প্রার্থী হিসেবে মামলাটি লড়ে যাচ্ছেন কমলেশ বেদজ্ঞের মেয়ে সুতপা বেদজ্ঞ সন্ধ্যা।
তিনি বলেন, “আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে এই ভেবে লজ্জাবোধ করছি যে, একজন খুনিকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। আমি দ্রুত এ কমিটি ভেঙে দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান শেখ বলেন, “আমাদেরকে না জানিয়ে রাতের আধারে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে আহ্বায়ক করে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা দ্রুত এ কমিটি ভেঙে দিয়ে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দাবি করছি।”

সুতপা বেদজ্ঞ সন্ধ্যা বলেন, “আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা কমলেশ বেদজ্ঞ কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন। স্বাধীন দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনে তিনি ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে কোটালীপাড়া আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
“নির্বাচন শেষে ১৯৭৩ সালের ১০ মার্চ কোটালীপাড়া থেকে নৌকা যোগে গোপালগঞ্জ শহরে ফেরার পথে টুপরিয়া নামক স্থানে পৌঁছালে হেমায়েত উদ্দিনের নেতৃত্বে আসামিরা আমার বাবাসহ চার বীর মুক্তিযোদ্ধাকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
দীর্ঘ ৫৩ বছরেও এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, “ইতোমধ্যে মামলাটির ২৩ জন আসামির মধ্যে ২০ আসামি মারা গেছেন। বাকী তিনজন আসামি জীবত রয়েছেন। হয়তো বা এ মামলার রায় হতে হতে বাকী ৩ জনও মারা যাবেন। তার পরেও আমি আমার পিতার হত্যা মামলার রায় দেখে যেতে চাই।”
১৯৭৩ সালের ১১ মার্চ দায়ের করা এই হত্যা মামলার আসামিরা হলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত উদ্দিন (বীর বিক্রম), ফারুকুজ্জামান সরদার, আবুল কালাম দাড়িয়া, মীর দেলোয়ার হোসেন, আবুল হাসেম দাড়িয়া, মোহন সরদার, মিলন সরদার, মোজাম সরদার, কুটিমিয়া সরদার, সামচুল হক মিয়া, নজির আহমেদ, ফজর আলী, আবুল হোসেন, নোয়াবালী মিয়া, জিল্লুর মোল্লা, ফুরু মিয়া, ফরমান আলী, মোতালেব মোল্লা, আবু বক্কর, মুজিবুর রহমান, মকবুল দাড়িয়া, লিয়াকত হোসেন ও ইয়াকুব আলী (ইকুব)।
এর মধ্যে ফারুকুজ্জামান সরদার, আবুল কালাম দাড়িয়া ও মিলন সরদার জীবিত রয়েছেন।
এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম দাড়িয়া নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, “৪ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার ঘটনার সঙ্গে আমি জড়িত ছিলাম না। আমাকে শত্রুতাবসত আসামি করা হয়েছিল। এই মামলার প্রকৃত আসামিরা কেউই আর জীবিত নেই।”
কমিটির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “রাতের আধারে কমিটি গঠনের কথাটি সত্য নয়। কোটালীপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সব সদস্যের মতামতের ভিত্তিত্বে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে।”
এ বিষয়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক ফিরোজ খান বলেন, “কোটালীপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বেশ কিছু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতিতে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম দাড়িয়া যে, হত্যা মামলার আসামি এটা আমার জানা ছিল না। এখন আমরা জেলা আহ্বায়ক কমিটির দায়িত্বরত মুক্তিযোদ্ধারা আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।”