Published : 28 Apr 2026, 12:46 PM
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে সূচিত হতে যাচ্ছে অনন্য এক অধ্যায়।
মঙ্গলবার বেলা আড়াইটায় পাবনার ঈশ্বরদীতে এ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে (ইউনিট-১) ফুয়েল লোডিং হবে।
এর মাধ্যমেই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিচালন পর্বে প্রবেশ করবে।
এ কার্যক্রমের সব প্রস্তুতি এর মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস।
তিনি বলেন, রাশিয়ার বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এবং দেশীয় দক্ষ প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে বিকাল থেকে রিঅ্যাক্টর কোরে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপন করা শুরু হবে।
গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ ইউনিট-১ এর জন্য জ্বালানি লোডিংয়ের আনুষ্ঠানিক লাইসেন্স দেয়। এর আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মানদণ্ড অনুযায়ী কয়েক স্তরের নিরাপত্তা পরীক্ষা ও প্রি-অপারেশনাল টেস্ট সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক এবং পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান শৌকত আকবর এই পর্যায়টিকে এক ‘ঐতিহাসিক মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্পটি নির্মাণপর্ব শেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে পদার্পণ করছে। এটি দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে কার্বনমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
ফুয়েল লোডিং প্রক্রিয়া
ইউরেনিয়াম ফুয়েল লোডিং হল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি বা রিঅ্যাক্টর কোরে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও চূড়ান্ত কারিগরি প্রক্রিয়া।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা, গ্যাস বা তেলের বদলে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়ামের ছোট ছোট পেলেট ব্যবহার করা হয়, যার প্রতিটি সাড়ে চার থেকে পাঁচ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে।
এই পেলেটগুলোকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে জিরকোনিয়াম অ্যালয় দিয়ে তৈরি টিউবের ভেতর সাজিয়ে ‘ফুয়েল অ্যাসেম্বলি’ তৈরি করা হয়।
এই অ্যাসেম্বলিগুলোকে রিঅ্যাক্টরের ভেতর স্থাপন করার প্রক্রিয়াই হল ফুয়েল লোডিং। এটি সম্পন্ন হওয়ার পরই বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে ফিশন বা চেইন রিঅ্যাকশন (চুল্লিতে তাপ উৎপাদন) শুরু করা সম্ভব হয়।
ফুয়েল লোডিং একটি অত্যাধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া। একটি বিশেষ ‘ফুয়েল লোডিং মেশিন’ বা রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে এই কাজ সম্পন্ন করা হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে এ প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন হবে।
আসল ইউরেনিয়াম জ্বালানি ভরার আগে রিঅ্যাক্টরের সব সিস্টেম, পরিবহন সরঞ্জাম এবং লোডিং যন্ত্রপাতি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তা যাচাই করতে ‘ডামি ফুয়েল’ (আসল জ্বালানিহীন ডামি অ্যাসেম্বলি) দিয়ে সফলভাবে পরীক্ষা ও মহড়া চালানো হয়েছে।
অনুমোদিত নিরাপত্তা কার্যপ্রণালী মেনে, রাশিয়ান ফেডারেশনের (রোসাটম) বিশেষজ্ঞদের সরাসরি সহায়তায় রূপপুর প্রকল্পের জন্য প্রশিক্ষিত ও যোগ্য বাংলাদেশি অপারেটর এবং ফুয়েল হ্যান্ডলাররা এই লোডিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।
ফুয়েল লোডিংয়ের সময় রিঅ্যাক্টরের ভেতরের অংশ বা রিঅ্যাক্টর ভ্যাসেল পানিতে পূর্ণ রাখা হয়, কারণ পানি বিকিরণ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
এরপর রিফুয়েলিং মেশিনের সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি একে একে রিঅ্যাক্টর কোরের ভেতর নির্ধারিত স্থানে বসানো হবে।
প্রতিটি অ্যাসেম্বলি কোথায় বসবে, তা আগেই নির্ধারিত থাকে। এই বিন্যাস বা কোর কনফিগারেশন খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি রিঅ্যাক্টরের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নির্ধারণ করে।
ফুয়েল বসানোর পর কন্ট্রোল রড (যা ফিশন রিয়্যাকশন নিয়ন্ত্রণ করে) সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগতে পারে।
১৬৩টি অ্যাসেম্বলি রিঅ্যাক্টর কোরে সফলভাবে লোড করার পর কেন্দ্রটিকে ‘মিনিমাম নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতায়’ আনা হবে। এই পর্যায়টিকে ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি বলা হয়, যেখান থেকে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু হবে।
ফুয়েল লোডিং এবং আনুষঙ্গিক পরীক্ষা শেষে সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষ বা অগাস্ট মাসের দিকে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের প্রযুক্তিগত দিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শৌকত আকবর বলেন, প্রতিটি অ্যাসেম্বলি চার দশমিক ছয় মিটার বা ১৫ ফুট দীর্ঘ, ওজন প্রায় ৭৫০ কেজি। প্রতিটি অ্যাসেম্বলিতে প্রায় ৫৩৪ কেজি ফুয়েল ব্যবহার করা হয়।
“রিঅ্যাক্টরে ব্যবহৃত প্রতিটি ইউরেনিয়াম পেলেটের ওজন মাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ গ্রাম হলেও এর শক্তি উৎপাদন ক্ষমতা অবিশ্বাস্য। একটি মাত্র পেলেট থেকে প্রায় একটন কয়লার সমপরিমাণ শক্তি পাওয়া যাবে।”
তিনি বলেন, এই পেলেটগুলো কোনো বিষাক্ত ধোঁয়া বা কার্বন নিঃসরণ ছাড়াই একটি সাধারণ পরিবারের কয়েক মাসের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
জ্বালানি লোডিংয়ের পুরো প্রক্রিয়াটিতে অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করা হচ্ছে। বিশেষায়িত ফুয়েল লোডিং মেশিন ব্যবহার করে একে একে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি কোরে বসানো হবে বলে জানান তিনি।
এই সময় পুরো সিস্টেমটি ‘সাব-ক্রিটিক্যাল’ অবস্থায় থাকবে এবং সার্বক্ষণিক নিউট্রন মনিটরিং সিস্টেম চালু থাকবে যাতে কোনো প্রকার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।
প্রাথমিক উৎপাদন শুরুর পর ধাপে ধাপে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে বছরের শেষে বা ২০২৭ সালের শুরুতে রূপপুরের প্রথম ইউনিটটি ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করবে।
পুরনো খবর
জ্বালানি লোডিংয়ে প্রস্তুত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
রূপপুরে জ্বালানি লোডিংয়ের অনুমোদন, এপ্রিলের শেষে উদ্বোধনের আশা
রূপপুরে জ্বালানি লোডিং ২৮ এপ্রিল, উৎপাদন শুরু অগাস্টের মধ্যে