Published : 08 Feb 2025, 05:43 PM
সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও ১৫টি মৃত হরিণ উদ্ধার করছে বনবিভাগ। এতে ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে অধিক উচ্চতার জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনে মৃত বন্যপ্রাণীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৫টিতে।
রেমালের পর শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত বন থেকে উদ্ধার করা এসব মৃতদেহের মধ্যে ১১১টি হরিণ এবং চারটি বন্য শুকরের বলে জানিয়েছেন খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো।
তিনি জানান, বনের কটকা, কচিখালী, করমজল, পক্ষীর চর, ডিমের চর, শেলার চর, নারিকেল বাড়িয়া ও নীলকমল থেকে মৃত প্রাণীগুলো উদ্ধার করা হয়।
এছাড়া ১৮টি হরিণ ও একটি অজগর অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাদের বনে ছেড়ে দিয়েছে বন বিভাগ।
মিহির কুমার দো বলেন, রেমালের জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে বন্যপ্রাণীর। জলোচ্ছ্বাসে লবণপানি বনের মধ্যে আটকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, মঙ্গলবার থেকে সুন্দরবনে তল্লাশি করে প্রতিদিনই তারা মৃত অবস্থায় হরিণ উদ্ধার করছেন। শুক্রবার বনের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হরিণের মরদেহ অনেকাংশে পচে গেছে।
বনবিভাগ ও সুন্দরবন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালে এবার ‘অস্বাভাবিক’ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় সুন্দরবন। স্বাভাবিক সময়ে ২৪ ঘণ্টায় দুইবার ভাটা এবং দুইবার জোয়ারে পানিতে প্লাবিত হয় বনের একটি অংশ।
কিন্তু এবারই প্রথম ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগে থেকে পরবর্তী ৩৬ ঘণ্টায় বনে কোনো ভাটা হয়নি। অর্থাৎ, এই দীর্ঘ সময় পুরো বন পানিতে তলিয়ে ছিল। আর জোয়ারে পানির উচ্চতা ছিল স্বাভাবিকের চাইতে ৫ থেকে ৬ ফুট, কিছু এলাকায় এর চেয়েও বেশি।
দীর্ঘ সময় এতো উঁচু জোয়ারের ফলে সুন্দরবনে বন্যপ্রাণির বিপুল ক্ষতির আশঙ্কা করছিলেন বন কর্মকর্তারা।
তবে রেমালের তাণ্ডবে সুন্দরবনের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনও পর্যন্ত জানাতে পারেনি বন বিভাগ। বনজ সম্পদ ও বন্যপ্রাণীর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানতে বন বিভাগের সদস্যরা সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি করছেন।
তবে বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলছেন, “বনের অবকাঠামো বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়াসহ অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক পরিমাণ ৬ কোটি ২৭ লাখ টাকার ওপরে।”
অধিক উচ্চতার জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় সুন্দরবনের ভেতরে প্রাণীদের আশ্রয়ের জন্য উঁচু ডিবির পাশাপাশি মিঠাপানি ও খাবারের সংস্থান বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন এই বন সংরক্ষক।
তিনি বলেন, “সুন্দরবনে বাঘ সংরক্ষণে একটি প্রকল্পের আওতায় কিছু মাটির কিল্লা নির্মাণ করা হয়েছিল; সেই প্রকল্প এখনো চলমান আছে। সুন্দরবনে ১২টি উঁচু কিল্লা রয়েছে।
“তবে এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন দুর্যোগ আসছে। তাই এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রাণীদের সংরক্ষণে আরও কী কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে ভাবা হবে।”
বন বিভাগের দেওয়া তথ্যমতে, ২০০৭ সালে সিডরের পর সুন্দরবনে ৪০টি হরিণ, একটি বাঘ ও একটি তিমির মৃতদেহ পাওয়া যায়। ২০০৯-এ ঘূর্ণিঝড় আইলার পর তিনটি হরিণ ও একটি শূকরের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত হওয়া ঝড়গুলোতে বাঘ, হরিণসহ অন্য কোনো বন্য প্রাণীর ক্ষতি হয়নি। ২০২১ সালের ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে চারটি হরিণের মৃতদেহ পাওয়া যায়।
বন বিভাগের তথ্য বলছে, সুন্দরবনের ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে, জলভাগের পরিমাণ এক হাজার ৮৭৪ দশমিক এক বর্গকিলোমিটার, যা পুরো সুন্দরবনের আয়তনের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ।
সুন্দরবনে প্রায় ২৮৯ প্রজাতির স্থলজ প্রাণী বাস করে। এছাড়া আছে প্রায় ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৮ প্রজাতির উভচর, বিভিন্ন প্রজাতির মাছসহ ২১৯ প্রজাতির জলজ প্রাণী।
আরও পড়ুন
ঘূর্ণিঝড় রেমাল: সুন্দরবনে আরও ৪৪ বন্যপ্রাণীর মৃতদেহ উদ্ধার
রেমাল: সুন্দরবনের আরও ১৬টি বন্যপ্রাণীর মৃতদেহ উদ্ধার
ঘূর্ণিঝড় রেমাল: সুন্দরবনে মিলল ২৬ হরিণের মৃতদেহ
সুন্দরবনের নদী ফুলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত, বন্যপ্রাণী নিয়ে শঙ্কা