১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বিক্ষোভের মুখে কক্সবাজারে বাঁকখালীর উচ্ছেদ ফের স্থগিত

বাসিন্দারা বলছেন, তাদের প্রাণের উপর দিয়ে উচ্ছেদ করতে হবে।

কক্সবাজার প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Sep 2025, 10:20 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:14 PM

স্থানীয়দের বিক্ষোভের মুখে কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর তীরের উচ্ছেদ অভিযান ফের স্থগিত করেছে বিআইডব্লিউটিএ। এ দিনে অভিযানের জন্য বের হয়েও তারা ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। 

শুক্রবার সকাল থেকে কক্সবাজার প্রধান সড়ক দখলে নেয় কয়েক হাজার মানুষ। সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে ও স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভকারীরা উচ্ছেদ অভিযান বন্ধের দাবি জানাতে থাকে।

উচ্ছেদ অভিযানের পঞ্চম দিনে বুলডোজারসহ নুনিয়াছড়ায় দিকে যাওয়ার কথা ছিলো অভিযান দলের। কিন্তু প্রধান সড়কেই সেনাবাহিনীসহ অন্যরা আন্দোলনকারীদের তোপের মুখে পড়েন। এতে স্থানীয় নুনিয়ারছড়াবাসীর পাশাপাশি পেশকারপাড়াবাসীরাও যোগ দেন। তারা বুধবার অর্থাৎ তৃতীয় দিনে তাদের পাড়ায় অভিযান চালাতে দেননি।

উচ্ছেদ অংশে থাকা বাসিন্দারা বলছেন, তাদের প্রাণের উপর দিয়ে উচ্ছেদ করতে হবে। 

নুনিয়ারছড়ার বাসিন্দা কাদির হোসেন বলেন, “এই দেশটা তো সরকারের পৈতৃক সম্পত্তি নয়। যেখানে রোহিঙ্গারা জামাই আদর পাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের নাগরিক হয়েও আমরা কেন ঠাঁই পাচ্ছি না। এই অবৈধ উচ্ছেদ আমরা মানি না। কোনো নোটিশ না দিয়ে কখনো উচ্ছেদ অভিযান হতে পারে না।” 

নতুন বাহারছড়ার মোসাদ্দিক হোসেনের মতে, “আগে বাঁকখালী নদীর সীমানা নির্ধারণ করা হোক তারপর জনগণের সঙ্গে বসে উচ্ছেদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিন। আমরাও চাই, কক্সবাজারের বাঁকখালি তার অস্তিত্ব ফিরে পাক। কিন্তু এর বিপরীতে যেন জনগণের গলা কাটা না হয়। তাই সঠিক সমীক্ষা ও জনগণের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই অভিযান হোক এটাই আমাদের দাবি।”

অভিযানে আসা প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্থানীয়দের বৈধ কাগজপত্রও দেখছেন না বলে অভিযোগ করেন বিক্ষোভকারীরা। এমনকি হাই কোর্টের আদেশ কর্মকর্তারাই মানছেন বলে জানান তারা। 

বিক্ষোভে আসা একজন বলেন, “বিআইডব্লিউটিএ ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসন হাই কোর্টের রায়ের অনুকূলে বাঁকখালীর নদীর তীরে যারা অবৈধভাবে বসবাস করছে তাদেরকে উচ্ছেদ করছে। কিন্তু তারা হাই কোর্টের ওই নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করছেন না। এমনকি সেই নির্দেশনা আমরা দেখতে চাইলেও দেখাচ্ছেন না। 

“হাই কোর্টের রায়ে লেখা আছে, আরএস অনুযায়ী বাঁকখালীর পূর্ব সীমানা নির্ধারণ করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। কক্সবাজারে নদী উপকূলের যে সব জায়গা রয়েছে যেমন, বৃহত্তর নুনিয়ারছড়া ও পেশকার পাড়াবাসী নদীর উপরে উঠে নাই। নদী ভেঙে আমাদের ওপর ওঠেছে। নদীর ধর্মই ভাঙন।”

সাদ্দাম হোসেন নামের এক বাসিন্দা বলেন, “অভিযান পরিচালনাকারীরা আমাদের খতিয়ান বা খাজনার কোনো কাগজপত্রই দেখছেন না। তারা বলছে, পানি থেকে উপরের জায়গা আমরা ভেঙে ফেলব। তাহলে যুগ যুগ ধরে আমাদের বাপ-দাদার ভিটা যে স্থানে আছে, যেখানে আমরা ছোট থেকে বড় হয়েছি সেসব জায়গার কী হবে? বিএস ও এমআরআর মূলের অনেক জায়গায় তারা উচ্ছেদ করেছেন। তাদের এই অবৈধ উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আমরা রাজপথে এসেছি।”

উচ্ছেদ অভিযানে সাঁজোয়া যান নিয়ে এসেছিল সেনাবাহিনী। প্রধান সড়কেই তা আটকে দেয় বিক্ষোভকারীরা। এ সময় নারীরা সেনা সদস্যদের পায়ে ধরে বিলাপ করতে থাকে। 

এক নারী বলেন, “বর্তমানে নদী যেখানে আছে, সেখান থেকে ২০০ ফুট পূর্ব দিকে আমাদের বাপ দাদার ভিটা। ৩০০ বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা এখানে বসবাস করছে। আমাদের জায়গাগুলো তো নদীতে পড়েনি। বিভিন্ন দুর্যোগ কিংবা সময়ে সময়ে নদী ভাঙে। সেই ভাঙনের ফলেই কখনো কখনো আমাদের কাছ পর্যন্ত চলে যায়। এর মানে তো এই না যে, আমাদের জায়গা নদীর।” 

এক পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সবাই ফিরে যান। বিক্ষোভের মুখে তড়িঘড়ি করে চলে যান উচ্ছেদ অভিযানের নেতৃত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএ এর বন্দর বিভাগের পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন। 

এ বিষয়ে তিনি আর কথা বলেননি। পরে মোবাইলে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। 

বিক্ষোভের একপর্যায়ে স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা লুৎফুর রহমান কাজল আসেন। তিনি আলোচনার আশ্বাস দিলে ফিরে যান বিক্ষোভকারীরা।  

এ সময় লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, “আমরা বিআইডব্লিউটিএসহ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বলেছি, আপনারা আগে নদীর সীমানা নির্ধারণ করুন। তারপর উচ্ছেদ করতে হলে নদীর সীমানায় বসবাসকারীদের আমরা বুঝিয়ে নিয়ে আসবো। হাই কোর্টের রায় আমরাও মানি। কিন্তু স্থানীয় জনগনদের সঙ্গে বসে সেই রায় নিয়ে আলোচনা করতে হবে। রায়ে কী লেখা আছে, তারা কী করতে চাচ্ছে- সবকিছু স্পষ্ট তুলে ধরতে হবে স্থানীয় জনগণের সামনে।”

কাজল বলেন, “আমরা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে এসেছি। প্রশাসন আপনাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসবে। প্রশাসন ঠিক করে দেবে উচ্ছেদ হওয়া এলাকাবাসীর স্থান কোথায় হবে, নদীর কতটুকু জায়গা তারা উচ্ছেদ করবে। 

“যদি প্রশাসন আজ বিকালের মধ্যে আমাদের কথা না শুনে তাহলে আমরা আবার রাজপথে নামবো। কক্সবাজারের বাঁকখালি নদী তার সৌন্দর্য ফিরে পাক এটা আমাদের জন্য গৌরবের। তাই এর সৌন্দর্য ফেরাতে যা যা প্রয়োজন আমরা সবকিছুই করব। কিন্তু এর জন্য কারো যেন দুর্ভোগ না হয় সেদিকেও আমরা লক্ষ্য রাখবো।”

এদিকে উচ্ছেদ অভিযানকে ঘিরে যত মিথ্যা মামলা হয়েছে সব মামলা যেন প্রত্যাহারের দাবিও জানান বিএনপি নেতা লুৎফুর রহমান কাজল।

এর আগে উচ্ছেদ অভিযানের তৃতীয় দিনে পেশকারপাড়াতেও তোপের মুখে ফিরে আসে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। দ্বিতীয় দিনেও বাঁধার মুখে পড়তে হয় উচ্ছেদ অভিযান। 

এ নিয়ে দুইদিনে উচ্ছেদ অভিযানে বাঁধা দেওয়ায় সাড়ে ৬০০ জনকে আসামি করে দুটি মামলা হওয়ার কথা জানিয়েছে কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি ইলিয়াস খান। 

আরও পড়ুন:

কক্সবাজারে বাঁকখালীর উচ্ছেদে বাঁধাদুই মামলায় আসামি ৬৫০

বিক্ষোভের মুখে বন্ধ কক্সবাজারের বাঁকখালী তীরের উচ্ছেদ অভিযান

কক্সবাজারের বাঁকখালীর পাড়ে ফের উচ্ছেদ অভিযানবাধা দেওয়ায় আটক ৩