পুরনো গ্লানি মুছে নতুনের আহ্বান, পাহাড়জুড়ে ‘হারি বৈসু’র আনন্দ
“হারি বৈসুতে পারিবার ও সারা বিশ্বের মঙ্গল, সুখ, সমৃদ্ধি কামনায় গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্য ফুল, ধূপ ও মঙ্গলপ্রদীপ দিয়ে পূজা করি।”
“আজকে আমাদের ‘হারি বৈসু’। কালকে ‘বৈসুমা’ পরশু ‘বিসিকাতাল’। এই তিনদিন আমাদের নতুন বছর বরণের আয়োজন করি।
“বছরে একবারই এমন আয়োজন হয়, তাই সারা বছর আমরা এ ধরনের উৎসবের জন্য অপেক্ষা করি। এখানে অংশ নিতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।” কথাগুলো বলছিলেন খাগড়াছড়ির সদর উপজেলার খাগড়াপুর এলাকার বাসিন্দা টিনা ত্রিপুরা।
ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক উৎসব ‘বৈসু’ ঘিরে খাগড়াছড়ির পাহাড়জুড়ে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। চৈত্র মাসের শেষ দুদিন এবং বৈশাখ মাসের প্রথম দিন এ উৎসব পালন করা হয়। ত্রিপুরা পঞ্জিকা অনুসারে চৈত্রের মাসের ২৯ তারিখে আয়োজন করা হয় এই উৎসবের।
রীতি অনুযায়ী, হারি বৈসুর দিন অর্থাৎ উৎসবের প্রথম দিন ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ত্রিপুরা নারী-পুরুষ ও শিশুরা ফুল নিয়ে নদীর ঘাটে জড়ো হন। তারা দেবী গঙ্গার উদ্দেশ্যে নদীতে বা ছড়ায় মাধবীলতা, অলকানন্দা ও জবাসহ বিভিন্ন ধরনের ফুল ও হাতে বোনা নতুন কাপড় ভাসান।
এর মাধ্যমে পুরনো বছরের সব দুঃখ-গ্লানিকে ধুয়ে মুছে নতুন বছর যেন সবার জীবনে সুখ ও শান্তি বয়ে আনে সেই প্রার্থনা করা হয়।
সোমবার সকালে খাগড়াপুর এলাকায় ত্রিপুরা নারীদের নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘রিনাই’ ও ‘রিসা’ পরে হারি বৈসু উৎসবে অংশ নিতে দেখা যায়। ‘সালকাতাল ক্লাব’ এবং স্থানীয়দের এই উদ্যোগ উৎসবের আমেজকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
ফুল ভাসানোর উৎসবের অংশ নিতে আসা খুশি ত্রিপুরা নারীরা বলছিলেন, 'হারি বৈসু' কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি পাহাড়ের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
সেখানে সৃজিতা ত্রিপুরা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেন, “হারি বৈসুতে পারিবার ও সারা বিশ্বের মঙ্গল, সুখ, সমৃদ্ধি কামনায় গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্য ফুল, ধূপ ও মঙ্গলপ্রদীপ দিয়ে পূজা করি। পাশাপাশি হাতে বোনা নতুন কাপড় ভাসিয়ে দেই।”
জলে কেন কাপড় ভাসানো হয় জানাতে চাইলে খাগড়াপুরে হারি বৈসুর মূল আয়োজক চামেলি ত্রিপুরা বলেন, নতুন বছরে তাদের নিজস্ব পোশাক ‘রিনাই’ ও ‘রিসা’ বুননে যাতে দক্ষতা ও নিপুণতা বাড়ে সেজন্যই ফুলের সঙ্গে ভাসানো হয় হাতের বোনা ছোট কাপড়।
এদিকে হারি বৈসু উদযাপন উপলক্ষে জেলা সদরের পল্টনজয় পাড়ায় বর্ণিল আয়োজন করে ‘বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ’।
সংগঠনটির সভাপতি কমল বিকাশ ত্রিপুরা বলছিলেন, “বৈসু বাংলাদেশ ও ভারতের ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর নববর্ষ উৎসব। এটি একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসব হিসেবে আমরা প্রতি বছর উদযাপন করে থাকি।”
তিনি বলেন, “হারি বৈসু দিনটি সামাজিক ও ধর্মীয় দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ দিন ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়েরা ফুল সংগ্রহ করে। সংগৃহীত ফুলের একাংশ দিয়ে মালা গেঁথে ঘরের দরজায় টাঙানো হয়। বাকি অংশ দিয়ে নদীর তীর ও ছড়ায় দেবী গঙ্গার উদ্দেশ্যে পূজা করা হয়।”
তিনদিনের বর্ণিল এই বৈসু উৎসবের শেষ হবে ১৫ এপ্রিল।
