Published : 30 Aug 2025, 12:50 PM
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ইউলুপ নির্মাণ কাজ আটকে থাকায় যানবাহনগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্ন দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে একের পর এক ঘটছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি।
স্থানীয়রা বলছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা-নোয়াখালী মহাসড়কের সংযোগস্থল পদুয়া বাজার দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ছয় জেলায় যোগাযোগের অন্যতম ব্যস্ত বাইপাস। পাদুয়া বাজার এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে ইউটার্ন নিয়ে উঠতে হয় কুমিল্লা-নোয়াখালী মহাসড়কে।
কিন্তু এখানকার অপরিহার্য ইউলুপ নির্মাণ কাজ দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্ন দিয়ে চলাচল করছে যানবাহন।
তাদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় থাকা সত্ত্বেও পদুয়া বাজারে অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।
তবে ইউলুপ নির্মাণ কাজ ৪০ শতাংশ শেষ হয়েছে জানিয়ে কুমিল্লা সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলছেন, “জমি অধিগ্রহণের জটিলতা শেষ হলে নির্মাণ সম্পন্ন হয়ে যান চলাচল নিরাপদ হবে।”
কুমিল্লা রিজিয়নের হাইওয়ে পুলিশ বলছে, দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগে পদুয়ার বাজার এলাকায় ইউলুপের প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেটসহ সারা দেশ থেকে আসা বিভিন্ন যানবাহন এ স্থান দিয়ে নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও ফেনী জেলায় প্রবেশ করে।
এখান থেকে ইউটার্ন করে বা রাস্তা পারাপার করে গন্তব্যে যেতে হলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এ কারণে ওই এলাকার ইউলুপ নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
সড়ক ও জনপদ বিভাগ কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী- পদুয়ার বাজারের রেলওয়ে ওভারপাস থেকে শুরু করে পল্লিবিদ্যুৎ সমিতি পর্যন্ত এ ইউলুপের দৈর্ঘ্য হবে ২ হাজার ১৪২ দশমিক ৭০ মিটার; প্রস্থ ৭ দশমিক ৩০ মিটার। এর মধ্যে ঢাকা প্রান্তে ১ হাজার ৪৩২ মিটার ও চট্টগ্রাম প্রান্তে ৭০৯ মিটার পড়েছে।
পদুয়ার বাজারের আন্ডারপাসটি হবে ৭৫ দশমিক ৫৪ মিটার দীর্ঘ এবং ৫ মিটার প্রশস্ত; যা ‘পুশ বক্স প্রযুক্তিতে’ নির্মাণ হবে; শুধুমাত্র পথচারী পারাপারের জন্য। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৮৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
২০২২ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া পদুয়ার বাজার ইউলুপ নির্মাণ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের জুনে। যা এখন মেয়াদ ফুরিয়ে চলছে আরও দুমাস। কিন্তু পুরো ইউলুপের কাজ হয়েছে মাত্র ৪০ ভাগ।
মহাসড়কের উত্তর পাশে ইউলুপ নির্মাণের জন্য এখনো ভূমি অধিগ্রহণ শুরু করতে পারেনি জেলা প্রশাসন। কেবল উত্তর পাশেই জমির মালিকদের পক্ষ থেকে ৫৭টি আপত্তি জমা পড়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র একটি। জমির মালিকরা মূলত ক্ষতিপূরণের অংককে কেন্দ্র করেই আপত্তি জানিয়েছেন।
পদুয়ার বাজারে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সংযোগস্থলে ইউলুপ নির্মাণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে কুমিল্লায় সদর দক্ষিণ উপজেলায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজারে লরির নিচে প্রাইভেট কার চাপা পড়ে একই পরিবারের চারজন নিহত হওয়ার পর।
ওই দুর্ঘটনার পর থেকে পদুয়ার বাজার পল্লী বিদ্যুতের সামনে ইউটার্নটি বন্ধ করে দিয়ে দয়াপুর ইউটার্ন দিয়ে সাময়িকভাবে যান চলাচলের নির্দেশ দেয় জেলা প্রশাসন।
ডিবিসি নিউজ টিভি চ্যানেলের কুমিল্লা প্রতিনিধি নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “বৃহৎ স্বার্থে পদুয়ার বাজার ইউলুপ নির্মাণের জটিলতা দ্রুত নিরসন করা উচিত। ভূমি অধিগ্রহণ নিয়ে কোনো জটিলতা থাকলে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে দ্রুত অধিগ্রহণের কাজ শেষ করা উচিত।
“না হলে এসব দুর্ঘটনার জন্য দায় সড়ক ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে নিতে হবে। কারণ সরকার এখানে জনগণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ইউলুপ নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছে।”
পদুয়া বাজারের স্থানীয় বাসিন্দা ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্মআহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান মজুমদার বলেন, “প্রকল্পের এক পাশের ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও অপর পাশে এক বিন্দু পরিমাণ কাজও শুরু হয়নি। উন্নয়ন প্রকল্পে ধীর গতি মানে, তার আশেপাশে থাকা মানুষের জন্যও ভোগান্তি।
“যদি সময়মত ভূমি অধিগ্রহণ কাজ সম্পন্ন হয়ে যেত তাহলে ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যেত। হয়তো আর ৩-৪ মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ কাজ শেষও করা যেত। প্রশাসনের উচিত, নতুন কোনো ইউটার্ন নির্মাণের পাশাপাশি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই ইউলুপ নির্মাণের কাজ শেষ করা।”
কুমিল্লা সড়ক ও জনপদ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলছেন, “ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনের পাশে ইউলুপের কাজ ৪০ শতাংশ শেষ হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামমুখী লেনের পাশে ভূমি অধিগ্রহণ এখনও সম্ভব হয়নি।
“আমাদের ঠিকাদার ঢাকামুখী লেনের পাশে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ করে দিলে আমরা এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করব।”
হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মো. খাইরুল বলেন, অতীতে সঠিক নিয়মে ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনায় মহাসড়কের স্থাপনাগুলো নির্মাণ না করায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে জটিলতা। সড়ক ও জনপদ বিভাগকে এই বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে।
“পদুয়ার বাজার এলাকায় যেসব অপরিকল্পিত ইউটার্ন রয়েছে সেগুলোকে বন্ধ করে দিতে হবে এবং খুব দ্রুত ইউলুপ নির্মাণ করতে হবে। তাহলে এই জায়গাটিতে যান চলাচল নিরাপদ হবে।”
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আমিরুল কায়সার বলছেন, “পদুয়ার বাজারে দুর্ঘটনা রোধে সাময়িক সমাধান হিসেবে পুরোনো ইউটার্নটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ইউলুপ নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণে যে ৫৭টি আপত্তি এসেছে, তা আগামী তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করা হবে।”
তিনি বলেন, “পদুয়ার বাজারে দুর্ঘটনা প্রবণ ইউটার্নটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে কিছুটা দূরে পূর্ব দিকে নতুন একটি প্রশস্ত ইউটার্ন নির্মাণ করে সাময়িকভাবে চলাচল শুরু করা হবে। আমরা কোথাও উল্টোপথে যান চলাচল করতে দিব না।”