Published : 18 Aug 2025, 05:21 PM
রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আমরণ অনশনে অসুস্থ হয়েছে পড়েছেন চার শিক্ষার্থী।
রোববার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের উত্তর ফটকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ১০ শিক্ষার্থী অনশনে বসেন। এরপর আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে আরও কিছু শিক্ষার্থী অনশন শুরু করেন। সন্ধ্যায় এই কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা।
সোমবার দুপুরে চার শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের স্যালাইন দেওয়া হয়৷ তাদের মধ্যে দুজনকে রংপুর মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা, চিফ মেডিকেল অফিসারসহ অনেকেই শিক্ষার্থীদের দেখতে আসেন।
অসুস্থ শিক্ষার্থীরা হলেন- সমাজবিজ্ঞান বিভাগের জাহিদুল ইসলাম জয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগে শিক্ষার্থী মাহিদ ইসলাম, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রুম্মানুল ইসলাম রাজ ও গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আরমান হোসেন।
তাদের মধ্যে জাহিদুল ও মাহিদকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অনশনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭ বছরেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হলেও ছাত্র সংসদের ফি আদায় করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে অন্তর্ভুক্ত করে সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে।
রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর গেটে অনশনে বসা শিক্ষার্থীরা হলেন- ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান আশিক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম জয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা রোগে শিক্ষার্থী মাহিদ ইসলাম, ফাইন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে শিক্ষার্থী, কায়সার, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নয়ন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রাজ, অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী আতিকুর, গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আরমান ও ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিবলি সাদিক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শওকাত আলী বলেন, “আবু সাঈদের সহযোদ্ধাদের দাবি থাকতেই পারে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের এই দাবিকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতির কারণে কাউকে যেন প্রাণ দিতে না হয়, এজন্য শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের পক্ষে আমরাও আছি।”
তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা বেশ উদ্বিগ্ন। এ জন্য কাজটাকে ত্বরান্বিত করার জন্য অনশনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেহেতু আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের জন্য গেজেটের মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তাই আমি রোডম্যাপ দিতে পারি না।
“রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দিলে আমরা নভেম্বরের মধ্যে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে পারবো।”
সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলেছেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৭ বছরেও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর যাত্রা শুরুর পর থেকেই আওয়ামী লীগ শাসনামল হওয়ায় ক্ষমতার জোরে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য দেখা গেছে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে। তাদের হাতে নির্যাতন, হয়রানি ও চাঁদাবাজির শিকার হয়েছে অসংখ্য শিক্ষার্থী।
গত বছরের ১৬ জুলাই বৈষমবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার সঙ্গে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের জড়িত থাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৮তম সিন্ডিকেট সভায় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র-শিক্ষকসহ সব ধরনের রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন।
লেজুড়বৃত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে প্রামাণিত হলে ১১১তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘সর্বোচ্চ শাস্তি আজীবন বহিষ্কার ও ছাত্রত্ব বাতিল’ এবং প্রয়োজনে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তি বিধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তাদের অধিকার আদায়, গণতান্ত্রিক চর্চা, ন্যায্য দাবি, আদায়সহ বিভিন্ন কারণে ছাত্র সংসদের দাবি জানিয়ে আসছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতেও কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিটি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালের ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র সংসদের কোনো বিধান রাখা হয়নি। যার কারণে নির্বাচন করার জন্য ছাত্র সংসদ আইনের খসড়া অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটে পাস করে তা অনুমোদনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। বিধানটি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে সংযুক্ত হলে তারপরেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হবে।
তারা বলছে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আইনের-২০০৯ এ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নীতিমালা যুক্ত করার জন্য কাজ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্র সংসদ নির্বাচনের নিমিত্তে ছাত্র সংসদ-সংক্রান্ত স্বতন্ত্র ব্যাংক হিসাব নম্বরে অর্থ সংরক্ষণ করা, ভোটার তালিকা প্রণয়নসহ যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
নীতিমালা অনুমোদন হলে শিগগিরই ছাত্র সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা হবে।