Published : 29 Jan 2026, 09:46 AM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরগরম ময়মনসিংহের রাজনীতির মাঠ। গল্প-আড্ডায় চলছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। প্রার্থীরা কাক ডাকা ভোর থেকে ছুটে চলেছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। বিরামহীন প্রচারের কাজ চলছে রাত অবধি।
তবে জেলার ১১টি আসনের নয়টিতে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী থাকায় চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। প্রচারের সমান সুযোগ চেয়ে হামলা-মামলার আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা।
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া)
ভারতের মেঘালয় সীমান্তবর্তী এই আসনে দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স ধানের শীষ প্রতীক পেলেও তার পথ মোটেও ‘মসৃণ’ নয়। উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সালমান ওমর রুবেল ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচনি মাঠে সরব প্রচারে রয়েছেন।
এর মধ্যে ১৬ জানুয়ারি ধোবাউড়া উপজেলার ঘোষগাঁও ইউনিয়নের এরশাদ বাজারে নির্বাচনি প্রচারকে কেন্দ্র করে বিএনপি প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নজরুল ইসলাম নামে এক কর্মী নিহত হয়েছেন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থক ছিলেন।
এ নিয়ে এমরান সালেহ প্রিন্স ও সালমান ওমর রুবেল পাল্টাপাল্টি সমাবেশ করে যাচ্ছেন। এতে হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ার নির্বাচনি পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠেছে।
সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “যাদের অবস্থান বিএনপির বিরুদ্ধে তারা দলের সঙ্গে বেইমানি করছে তাদের প্রতিবাদ জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে দেবে।
“আমার আসনে বিএনপির একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। তিনি আমাকে বেকায়দায় ফেলতে নানা ফন্দি আঁটছেন। কিন্তু এতে সফল হতে পারছেন না। দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটাররা আমার সঙ্গে রয়েছেন।”
স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেল বলেন, “মাঠে ঠিকে থাকতে পারলে বিজয় আমাদের হবে। আমার কর্মী-সমর্থকরা কিছুটা ভয়-ভীতির মধ্যে আছে।”
ধোবাউড়া উপজেলা শহরের ব্যবসায়ি খাদেমুল ইসলাম বলেন, “এই আসনে নির্বাচন হাড্ডাহাড্ডি হবে।”
ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা)
এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার। কিন্তু তার সঙ্গে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে আছেন সাবেক সংসদ সদস্য শাহ শহীদ সারোয়ার। ফলে ধানের শীষ এখানে কিছুটা বেকায়দায় রয়েছে।
মোতাহার হোসেন তালুকদার বলেন, “তাকে (সারোয়ার) মানুষ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিএনপির দুঃসময়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করে নির্বাচন করেছেন। এই স্বৈরাচারকে মানুষ ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনবে না।”
বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শাহ শহীদ সারোয়ার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের একটি হত্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। তার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন পরিবারের সদস্য ও কর্মী-সমর্থকরা।
তার ভাই শাহ তারিক ইস্কান্দার বলেন, “ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় আমার বড় ভাইকে জেলে পাঠানো হয়েছে। জনগণ আমাদের পক্ষে থাকায় বড় ভাই প্রার্থী হয়েছেন। তবে আমাদের কর্মী-সমর্থকদের মামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি, দ্রুত ভাইয়ের জামিন হবে।”
ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর)
প্রকৌশলী এম ইকবাল হোসাইনকে বিএনপি মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকেই গৌরীপুর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দল থেকে বহিষ্কৃত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আহাম্মদ তায়েবুর রহমান হিরণ ঘোড়া প্রতীক পেয়ে মাঠে থাকায় তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী এখন মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন।
হিরণের অনুসারীরা মনে করেন, তৃণমূলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী ও সাধারণ জনগণের প্রথম পছন্দ হওয়া সত্ত্বেও ‘ভোট ব্যাংক’ এবং ‘ত্যাগের’ মূল্যায়ন করা হয়নি।
প্রকৌশলী এম ইকবাল হোসাইন বলেন, গৌরীপুরের ইতিহাসে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে রেকর্ড তৈরি করবেন।
হিরণের বক্তব্য, দলের এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিয়েছে। তবে প্রতীক বরাদ্দের পরে এখন সবাই নির্বাচনমুখী। নির্বাচনে তার সর্বোচ্চ জনপ্রিয়তা আছে বলে মনে করেন তিনি।
ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়ীয়া)
এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আখতারুল আলম। কিন্তু বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য শামছ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী আখতার সুলতানা ধানের শীষের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে অবস্থা নিয়েছেন। তার প্রতীক ফুটবল। সম্পর্কে তারা চাচি-ভাতিজা।
আখতার সুলতানা বলেন, নারী ক্ষমতায়ন বৃদ্ধির লক্ষ্যে পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
তবে এ আসনে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী আছে জামায়াতে ইসলামীরও। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাবেক জেলা আমির অধ্যাপক জসিম উদ্দিনের প্রার্থী হয়েছেন। এতে উত্তপ্ত স্থানীয় রাজনীতির মাঠ।
এই ‘বিদ্রোহের’ জেরে জসিম উদ্দিনের সব সাংগঠনিক পদ স্থগিত করেছে দল। দলীয় পদ স্থগিত হওয়ার পরও তিনি দমে যাননি। প্রার্থী হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন কৌশলে তার কর্মী-সমর্থকরা নিয়মিত এলাকায় প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি ঘোড়া প্রতীকে লড়ছেন।
ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল)
সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল খালেক সরকারের ছেলে মুহাম্মদ আনোয়ার সাদত ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী হওয়ায় ধানের শীষ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ডা. মাহাবুবুর রহমান লিটন। ত্রিশালের নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, সাদতের পারিবারিক ‘ভোট ব্যাংক’ ধানের শীষের জন্য বড় হুমকি।
অনেকে মনে করছেন, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আনোয়ার সাদত নির্বাচনে একটি বড় ভূমিকা নিতে পারেন।
এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান সোহেল।
মাহাবুবুর রহমান লিটন মনে করেন, বিএনপিতে ধানের শীষ ছাড়া নেতাকর্মীরা অন্য কারোর নির্বাচন করবে না। জয়ের ব্যাপারে তিনি শতভাগ আশাবাদী।
আনোয়ার সাদত বলেন, ভোটের পরিবেশ তার অনুকূলে রয়েছে। ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমে তার জয় নিশ্চিত করবে।
ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ)
ধানের শীষের মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শাহ নুরুল কবির শাহীন দল থেকে পদত্যাগ করেন। পরে তিনি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা নিয়ে ভোটের মাঠে নামেন।
এখানে বিএনপির প্রার্থী প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। তিনি বলেন, “মানুষ প্রতীকের বাইরে ভোট দেবে না। এখানে ধানের শীষ প্রতীক একটি বড় ফ্যাক্টর।”
শাহ নুরুল কবির শাহীন বলেন, “কর্মী-সমর্থকদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে একটি মহল প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। নির্বাচন কমিশনকে আরও তৎপর হতে হবে।”
ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল)
এই আসনে বিএনপির প্রার্থী ইয়াসের খান চৌধুরী। তিনি ও তার সমর্থকরা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
তবে তার সামনে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা খান চৌধুরী। তার মনোনয়ন বৈধ হওয়ায় নির্বাচনি লড়াইয়ে বিএনপির বিপুল সংখ্যক ভোট বিদ্রোহীদের দিকে যাওয়ার ‘প্রবল সম্ভাবনা’ দেখছেন তার সমর্থকরা।
যদিও ইয়াসের খান চৌধুরী মনে করেন, এই আসনটি তিনি তারেক রহমানকে উপহার দিতে পারবেন।
ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও)
অনেক জল্পনা-কল্পনার পর এ আসনে বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করা হয় আক্তারুজ্জামান বাচ্চুকে। তাকে মনোনয়ন দেওয়ার পর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে পড়ে গফরগাঁওয়ের রাজনীতি।
এই আসনে বিএনপির একাধিক প্রার্থীর কর্মীরা মিলে রেললাইনে নাশকতা তৈরি করলে সারাদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। পরে সমঝোতার মাধ্যমে বিএনপির সব ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী সরে যান।
কিন্তু ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন প্রভাবশালী নেতা আবু বকর সিদ্দিকুর।
এ আসনে জামায়াত জোটের দুর্বল অবস্থান থাকায় লড়াই হবে ধানের শীষের আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর সঙ্গে জেলা বিএনপির যুগ্ন আহ্বায়ক ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিকুর রহমানের।
এখানকার ভোটার আমিরুল ইসলাম বলেন, “প্রতীক পেয়ে নেতা-কর্মীদের নিয়ে বাচ্চু শহরে ঢুকতে পারেননি সিদ্দিকুর রহমানের প্রতিরোধের মধ্যে। এতে বোঝা যায়, এখানে সিদ্দিকুরের হাঁস প্রতীকের দাপট বেশি।”
ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা)
ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর বিএনপির মনোনয়ন পাওয়াকে কেন্দ্র করে ‘বিদ্রোহের’ আগুন জ্বলছে ময়মনসিংহের শিল্পাঞ্চল বলে খ্যাত ভালুকায়। সদ্য সাবেক উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মুহাম্মদ মোর্শেদুল আলম ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় ভোটাররা দ্বিধাবিভক্ত।
তবে ধানের শীষের প্রার্থী ফখর উদ্দিন বলেন, “এখন প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে। সবাই ধানের শীষের পক্ষে রয়েছেন। বিএনপির বিজয় সুনিশ্চিত জেনেই ‘বিদ্রোহীরা’ নানা বিভ্রান্তি ছড়াতে ব্যস্ত।”