মাদক নিরাময়কেন্দ্রে রোগীর মৃত্যু: পরিচালকসহ ৭ জনের নামে হত্যা মামলা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রোগী নিহতের ঘটনার পর আতঙ্কে নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অন্তত ৪০ জন পালিয়ে যান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের একটি মাদক নিরাময়কেন্দ্রে রোগীর মৃত্যু ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালকসহ সাতজনের নামে আদালতে হত্যা মামলা হয়েছে।
সোমবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন নিহতের বাবা আব্দুর রশিদ।
এ সময় সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফনান সুমী নিহতের ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা ও সাধারণ ডায়েরি হয়েছে কিনা যাচাইসহ তদন্ত করে সদর থানার ওসিতে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী এ কে এম আব্দুল হাই।
মামলায় শহরের ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকার একটি তিনতলা ভবনে অবস্থিত ‘প্রয়াস’ মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক মো. ইকরামুল হক ওরফে রুবেলকে (৪৫) প্রধান আসামি করা হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন- মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক নরসিংদীর প্রমোদ কুমার বর্মন (৪৬), সহযোগী জেলা শহরের কান্দিপাড়ার রিয়াদ আহমদ ওরফে রকসি (২৫), সাথি (৩০), আরিফ (৩২), সাকিব (২৫) ও শাহরিয়ার (৩৩)। মামলায় অজ্ঞাত পরিচয় আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
মারা যাওয়া মো. ফোরকান মিয়া (২৪) নবীনগর উপজেলার নাটঘর ইউনিয়নের কুড়িঘর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি কাতারপ্রবাসী ছিলেন। ছয় মাস আগে কাতার থেকে ছুটিতে দেশে আসেন তিনি। দেশে আসার দুই মাস পর মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন ফোরকান।
এর আগে ১৮ অগাস্ট রাতে ওই মাদক নিরাময়কেন্দ্রের পরিচালকদের বিরুদ্ধে সেখানে চিকিৎসাধীন ফোরকানকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরদিন ১৯ অগাস্ট দুপুরে এলাকার লোকজন সেখানে ভাঙচুর চালালে নিরাময় কেন্দ্রে থাকা ৪০ রোগী পালিয়ে যান। পরে মৃত্যুর ঘটনায় সদর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।
মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, ১২ অগাস্ট ফোরকানকে ‘প্রয়াস‘ মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র তিন মাসের জন্য ভর্তি করা হয়। চিকিৎসার ৭০ হাজার টাকার মধ্যে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের মালিক ইকরামুল হক ও পরিচালক প্রমোদ কুমার বর্মনকে ভর্তির সময় ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। বাকি ৫০ হাজার টাকা এক মাসের মধ্যে পরিশোধের বিষয়ে আলোচনা হয়।
ভর্তির পরদিন ফোরকান বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে তার বাবাকে জানান, যে নিরাময় কেন্দ্রের লোকজন তাকে মারাত্মকভাবে মারধর করেন। ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে ফোরকানকে দেখতে ফলমূল নিয়ে ১৪ অগাস্ট মাদক নিরাময়কেন্দ্রে যান ভাগিনা মো. আশ্রাফ। সেই সময় অফিস কক্ষে ফোরকান দৌড়ে এসে চিৎকার দিয়ে মারধরের কথা ভাগিনাকে জানান।
তাকে ভেতরে নিয়ে যেতে আসামিদের নির্দেশ দেন ইকরামুল হক। ভেতরে নিয়ে তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয় বলে মামলায় বলা হয়েছে। ঘটনার সময় ফোরকানের চিৎকার শুনে ইকরামুলের কাছে নির্যাতনের কারণ জানতে চার আশ্রাফ। উত্তরে ইকরামুল শারীরিক নির্যাতন না করলে নেশা দূর হবে না বলে জানান।
পরে বাদী জানতে পারেন ১৮ অগাস্ট রাত ৮টা থেকে ১২টার মধ্যে ফোরকানকে পরিকল্পিতভাবে দফায় দফায় মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে নিরাময় কেন্দ্রের মেঝেতে তাকে চেপে ধরে দুই পা দুই দিকে টেনে পাড়া দিয়ে ধরে রাখা হয়। এক পর্যায়ে মুখ দিয়ে রক্ত বের হলে ফোরকান অচেতন হয়ে পড়েন।
তবে জ্ঞান না ফেরায় নিরাময় কেন্দ্রের লোকজন তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে নিলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তবে নিরাময়কেন্দ্রেই ফোরমান মারা যান বলে মামলা বলা হয়েছে।
নির্যাতনের দৃশ্য দেখে এবং ফোরকানের মৃত্যুর খবর শুনে চিকিৎসাধীন রোগীরা ভয়ে নিরাময় কেন্দ্রের জানালা ভেঙে পালিয়ে যান। ঘটনার পর থেকে আসামিরা পলাতক রয়েছেন। এ ছাড়া মাদক নিরাময় কেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে।
নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদন আসামিদের ইচ্ছা অনুযায়ী তৈরি করা হয় বলে মামলার এজাহারে দাবি করেছেন বাদী।
আরও পড়ুন:
