Published : 22 Nov 2025, 09:07 PM
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলায় স্থানীয় একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর আপত্তির মুখে এ বছরও সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে ‘লালন সাধুসঙ্গের’ আয়োজন।
শনিবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপজেলার কাশীপুর ইউনিয়নের মধ্য নরসিংহপুর গ্রামে অবস্থিত মুক্তিধাম আশ্রমে দুই দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা রফিউর রাব্বি।
গত বছর ‘তৌহিদি জনতার’ ব্যানারে একই ধর্মীয় গোষ্ঠীর হুমকি ও বাধার মুখে এ আয়োজন বন্ধ করে দেয় জেলা প্রশাসন। সারাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা লালন ভক্তরা সেবার ফিরে যেতে বাধ্য হন।
মুক্তিধাম আশ্রম ও লালন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ফকির শাহজালাল বলেন, গত বছর বাধা পেয়ে এবার আগে-ভাগেই তিনি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর চিঠি দিয়ে অবহিত করেন।
পরে ২০ নভেম্বর উচ্চস্বরে মাইক না বাজা, মহিলা-পুরুষের আলাদা বসা, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আনে- এমন বক্তব্য পরিহার করে মিলাদ-জিকিরের মাধ্যমে আয়োজন শেষ করাসহ ১৩ শর্তে অনুমতি দেওয়া যেতে পারে বলে জেলা প্রশাসককে চিঠি দেন পুলিশ সুপার।
“কিন্তু শুক্রবার দুপুরে জুমার নামাজের পর ‘তৌহিদি জনতা’ নামে স্থানীয় শতাধিক মানুষ বিক্ষোভ করেন। তারা আমাদের আয়োজন গতবারের মত বন্ধ রাখার দাবি জানান। খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাদের নিবৃত করে”, বলেন শাহজালাল।
পরে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আয়োজন সংক্ষিপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুক্রবার জুমার নামাজের পর গ্রামটির একটি স্কুলমাঠে শতাধিক মানুষ জড়ো হন। এক পর্যায়ে এতে হেফাজতে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীরাও অংশ নেন।
এতে নেতৃত্ব দেন হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সহসভাপতি ও ইমাম ঐক্য পরিষদ কাশীপুর ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুফতি আব্দুল হান্নান।
যোগাযোগ করা হলে মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, “লালন সাধুসঙ্গের আড়ালে তারা অসামাজিক কার্যকলাপ চালায়। এই ধরনের গান-বাজনার আয়োজন ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকেও ঠিক না, তাছাড়া এলাকাবাসীও চান না।
“এ লালন সাধুসঙ্গ বন্ধ করতে আমরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গেও বসেছিলাম, তারা এ আয়োজন বন্ধের আশ্বাস দিয়েছিল, কিন্তু এখন শুনছি কিছুই বন্ধ হয়নি।”
আয়োজন বন্ধ না করায় প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে এ হেফাজত নেতা বলেন, “প্রশাসনে যারা আছে, তারা কোন যুক্তিতে এটা করতে দিয়েছেন জানি না। কিন্তু এটা আমরা অবশ্যই বন্ধ করব। এটা নিয়ে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দায়ী থাকবে প্রশাসন।”
স্থানীয় ধর্মীয় একটি গোষ্ঠীর হুমকিতে আয়োজকরা আতঙ্কিত বলে জানান। শাহজালাল বলেন, “গত বছরও আয়োজন বাতিল করতে হয়। এবারো আমাকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে, প্রশাসনও আয়োজন ছোট করতে বলেছে। সব নিয়ে আতঙ্কে আছি।”
শনিবার দুপুর থেকে সাধুসঙ্গের এ আয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লালনভক্তরা আসতে শুরু করেন। বিকাল ৪টায় আয়োজন শুরু করার কথা থাকলেও জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে আয়োজনে বাধা দেওয়া হয়। পরে গানের শব্দ প্রাঙ্গণের বাইরে না যেন না যায়, এমন শর্তে মৌখিক অনুমতি দেন।
এ সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান নূর এবং ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আনোয়ার হোসেন উপস্থিত ছিলেন। তবে গণমাধ্যমে কোনও বক্তব্য দিতে তারা অস্বীকৃতি জানান।
পরে যোগাযোগ করা হলে মোবাইল ফোনে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাছলিমা শিরিন বলেন, “লালন সাধুসঙ্গের এ আয়োজনে প্রশাসনের কোনও অনুমতি নেই। তারপরও যেহেতু তারা আয়োজন করে ফেলেছেন, সেজন্য স্বল্প পরিসরে করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উচ্চস্বরে কোনো গান-বাজনা বা মেলা হবে না।”
আয়োজনের উদ্বোধক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি বলেন, “এ বছর আয়োজনটি ছিল আরও বড় পরিসরে এবং ব্যাপকভাবে। গত বছর এ আয়োজনটি ঘোষণা করেও তৌহিদি জনতার বাধার কারণে আর করতে পারেনি।
“এবারও যখন তারা আয়োজনটি করতে যাচ্ছে, তখন ওই গোষ্ঠীটিই অনৈসলামিক ও ইসলামবিরোধী কার্যকলাপের কথা বলছে। ফলে আয়োজনটি যে কলেবরে বা যে পরিসরে ছিল সেটি ছোট করতে করতে যে অবস্থায় এসেছে, সেটি না করার মতই।”
প্রশাসনের ভূমিকায় নাখোশ জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রশাসন বলছে, আমরা এর নিরাপত্তার জন্য আছি কিন্তু এটি দ্বৈত ভূমিকা, এটির নিন্দা জানাই। একদিকে সরকার ৬৪ জেলায় লালনের উৎসবের আয়োজন করছে আর অন্যদিকে লালনের অনুসারী বাউল- সন্ন্যাসীদের বিরুদ্ধে থাকা গোষ্ঠীর সঙ্গে আপোষ করছে। শক্ত কোনো অবস্থানে না যাবার কারণে ওই তথাকথিত গোষ্ঠীর কাছে প্রশাসন জিম্মি হয়ে পড়েছে।”
প্রশাসনের এ ধরনের ভূমিকা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “লালনের অনুসারী সাধুরা নির্বিবাদী ও অহিংস মানুষ। তারা সহিংস গোষ্ঠীর সঙ্গে বিবাদে জড়ান না। এর সুবিধা প্রশাসন যেমন নেয়, তেমনি ওই সহিংস গোষ্ঠীটিও নিচ্ছে। এটি আমাদের সংস্কৃতির উপর যেমন আঘাত, তেমনি গণতন্ত্র বা চব্বিশের চিন্তা-চেতনা ধূলিসাৎ করে দেবে, যদি এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়।”
অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি দিনা তাজরিন, সাবেক সভাপতি জিয়াউল কাজল, ভবানী শংকর রায় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা জুয়েল উপস্থিত ছিলেন।
দুপুর থেকে ওই আশ্রমের ভেতরে ও বাইরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থায় দেখা গেছে।