১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘হেনস্তার’ বিপরীতে বৈষম্যহীন ক্যাম্পাসের স্বপ্ন আদিবাসী শিক্ষার্থীদের

শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা চান এমন একটি শিক্ষাঙ্গন যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে আলাদা করে দেখা হবে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Aug 2026, 09:24 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:48 PM

সবার জন্য সমান সুযোগ ও অধিকার সম্বলিত স্বপ্নের ক্যাম্পাসের কথা বলেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আদিবাসী শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা নিজেদের ঐতিহ্যের কারণে অন্যদের কাছে হেনস্তার হওয়ার অভিযোগও আনেন। 

বিশ্ব আদিবাসী দিবসে শিক্ষার্থীরা বলছেন, তারা চান এমন একটি শিক্ষাঙ্গন যেখানে ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক বা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে আলাদা করে দেখা হবে না। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকমা ৮২, মারমা ৩৫, ত্রিপুরা ৩১, তঞ্চঙ্গ্যা ১৩, ম্রো ৭, চাক ৪, খেয়াং ৪, রাখাইন ৩, বম ৩, খুমি ২ ও পাংখোয়া জাতিগোষ্ঠীর একজন শিক্ষার্থীসহ মোট ১৮৪ জন অধ্যয়ন করছেন।

পরিচয়ের প্রশ্নে বিতর্ক

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ২০০৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘ইউনাইটেড নেশনস ডিক্লারেশন অন দ্য রাইটস অব ইনডিজেনাস পিপলস’ গৃহীত হয়। ১৪৪টি দেশ এর পক্ষে ভোট দিলেও বাংলাদেশ ভোটদানে বিরত ছিল।

সেই ঘোষণাপত্রে ‘আদিবাসী’ শব্দের নির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ১২টি অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ভূমি ও ভূখণ্ডের অধিকার, সামরিক কার্যক্রম বন্ধের অধিকার, জোরপূর্বক উচ্ছেদ প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পাবার অধিকার, তাদের সম্মতি ছিনিয়ে নেওয়া ভূমি, ভূখণ্ড এবং সম্পদ হয়েছে সেগুলো পুনরুদ্ধার ও ফেরত পাওয়ার অধিকার সংরক্ষিত করা হয়।

এদিকে ২০১১ সালে হওয়া বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে অনুচ্ছেদ ৬(২)-এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসেবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশি বলে পরিচিত হবেন। পাশাপাশি পাহাড়ি ও সমতলের অন্যান্য জাতিসত্তার জন্য সংবিধানের অন্য অনুচ্ছেদে (অনুচ্ছেদ ২৩ ক) উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃগোষ্ঠী শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আদিল হাসান চৌধুরী বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিচয় ও ভূমি-অধিকার প্রশ্নের পেছনে উপনিবেশিক ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ শাসনামলে পাহাড়ি অঞ্চলে সমতলের মত খাজনা ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা হয়নি। সেখান থেকেই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভূমির সঙ্গে ঐতিহ্যগত সম্পর্কের ধারণা আরও দৃঢ় হয়। ব্রিটিশরাই মুলত সমতলের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে পাহাড়ের এই দ্বন্দ্বটা তৈরি করে দিয়ে যায়।”

পরবর্তীতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পরও পাহাড়িদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে বহু পাহাড়ি পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে জনসংখ্যা ও ভূমির ভারসাম্যের প্রশ্ন তুলে সমতল অঞ্চল থেকে জনবসতি স্থানান্তরের নীতি গ্রহণ করা হয়। এটিও তাদের ক্ষোভের কারণ। 

“এ ছাড়া তাদের এই ক্ষোভকে পুঁজি করে আমাদের বাইরের শত্রুরাও এই জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন সময়ে উসকে দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়। যার ফল হিসেবে পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো দেখা যাচ্ছে।”

এই শিক্ষক বলেন, “একদিকে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভাষা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অধিকারের দাবি রয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্র নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়। ফলে বিষয়টি শুধু একটি শব্দের বিতর্ক নয়; এর সঙ্গে ইতিহাস, ভূমি, উন্নয়ন, অধিকার ও রাষ্ট্রনীতির প্রশ্নও জড়িত।”

তিনি বলেন, “এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথমত রাষ্ট্রের স্বদিচ্ছা প্রয়োজন। অনেক সময় রাষ্ট্র জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরানোর জন্যও এইরকম ইস্যুগুলো জিইয়ে রাখে। রাষ্ট্রের উদ্যোগ এবং পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধির মাধ্যমেই কেবল এই সমস্যা সমাধান সম্ভব।”

শিক্ষাঙ্গনের বাস্তবতা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীরা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে অনেক সময় ভাষা, খাদ্যাভ্যাস বা সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে অস্বস্তিকর মন্তব্য শুনতে হয়। কেউ কেউ বলেন, ‘উপজাতি’ শব্দটি অনেক সময় এমন ভঙ্গিতে ব্যবহার করা হয়, যা আত্মমর্যাদায় আঘাত করে।

হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী বিভা চাকমা বলেন, “এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা আদিবাসী তথা সংখ্যালঘুকে কখনও প্রাপ্য সম্মান, অধিকার ও আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি দেয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত একটা প্রতিষ্ঠানেও আদিবাসী শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত নানাভাবে বৈষম্য ও হেনস্তার শিকার হচ্ছে। 

“আমাদের ঐহিত্যের যে খাদ্যাভ্যাস- বিশেষ করে নাপ্পি, সেটা নিয়ে নানাজনের নানান প্রতিক্রিয়া। এই যেমন, এইসব তোমরা কেমনে খাও! কেমন জানি পঁচা গন্ধ! বমি চলে আসলো বুঝি!”

বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শামীন ত্রিপুরা বলেন, “আমাদের বাংলা উচ্চারণ নিয়ে হাসাহাসি এবং ‘চাইনিজ’ বা ‘চেংচুং’ বলে ডাকার ঘটনা প্রায় প্রতিনিয়তই ঘটে। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে বন্ধুসুলভ আচরণও পেয়েছি।”

শুধু পাহাড়ি হওয়ায় আলাদাভাবে দেখা হয় জানিয়ে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ভূমিকা ত্রিপুরা বলেন, “আদিবাসী হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর অনেকবার র‍্যাগিং ও মানসিক হেনস্তার শিকার হয়েছি।”

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে এসব শিক্ষার্থীরা ‘আদিবাসী কোটায়’ ভর্তির সুযোগ পান। তবে পিছিয়ে পড়া এসব শিক্ষার্থীর কোটায় ভর্তির বিষয়টি নিয়েও সমালোচনা এবং বাজে মন্তব্য শুনতে হয় বলেও অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা।

বিভা চাকমা বলেন, “একজন আদিবাসী শিক্ষার্থী হিসেবে ক্যাম্পাসে এসেই কিছু শিক্ষকদের ব্যবহার এমন ছিলো যেন কোটা নিয়ে পড়তে এসেছি তাই আমরা বাকিদের চেয়ে মেধায় অনেক পিছিয়ে। যেন কোটায় নয়, ভিক্ষা নিয়ে পড়তে এসেছি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংবিধান স্বীকৃত অধিকার নিয়ে যেন আমরা পাপ করেছি!”

একই অভিযোগ করেছেন শামীন ত্রিপুরাও। পিসিপির এই নেতা বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর ভিন্ন জাতিসত্তার অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী কোটার মাধ্যমে ভর্তি হওয়ার সু্যোগ পায়। কিন্তু কোটার বিষয়ে সবার সম্যক ধারণা না থাকায় অনেকে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীকে ভিন্নভাবে দেখেন। যার কারণে বিভাগ, হল কিংবা ক্যাম্পাসে আমাদের অনেকে কিছুটা হীনমন্যতায় ভোগেন।”

এ ছাড়া আদিবাসীদের প্রধান সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে ছুটি না পাওয়া নিয়েও ক্ষোভ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

বিভা বলেন, “আমাদের সমতলের বন্ধুরা ঈদ, পূজার ছুটিতে বাড়ি যেতে পারলেও আমাদের সামাজিক উৎসবে আমাদের ক্যাম্পাসেই থাকতে হয়। আমাদের সামাজিক উৎসবে নূন্যতম পাঁচ দিনের ছুটি ঘোষণা, একটি ধর্মীয় উপাসনালয় এবং প্রত্যেকটি হলে একটি করে কক্ষ আমাদের জন্যে উপসনার জন্য বরাদ্দ দেওয়াসহ কোটার সিট বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছি।” 

সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধার চোখে দেখার দাবি

এদিকে পাহাড়ি-বাঙালি মনস্তাত্ত্বিক বিভেদ দূর করা এবং বহুজাতিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে শ্রদ্ধার দাবিও তোলেন তারা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জুম্ম শিক্ষার্থী পরিবারের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল ত্রিপুরা বলেন, “আমাদের বৈচিত্র্যকে বিভাজনের কারণ হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হোক। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও সমঅধিকারের ভিত্তিতে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে উঠুক- আদিবাসী দিবসে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

শামীন ত্রিপুরা বলেন, “অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে হলে ভিন্ন জাতিসত্তার স্বজাতীয় স্বীকৃতি সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করতে, সমর্যাদা ও সমসুযোগের ভিত্তিতে সমাধিকার নিশ্চিত করে বাংলাদেশকে বহু জাতির বহু ভাষার বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশ হিসেবে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে।”

ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী লাল অই পার বম বলেন, “ক্যাম্পাসে কার্যকর বৈষম্যবিরোধী সেল, মেধাভিত্তিক হয়রানিমুক্ত হল সিট এবং শিক্ষক-সহপাঠীদের আরও সংবেদনশীল আচরণ আমরা প্রত্যাশা করি।”