Published : 23 Jul 2025, 05:46 PM
ফেনীবাসীকে প্রতিবছর বন্যার হাত থেকে বাঁচাতে টেকসই বাঁধ নির্মাণসহ আট দফা দাবিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড-পাউবো কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার সকালে শহরের ট্রাংক রোড কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে ‘ফেনীর সর্বস্তরের জনগণ’ এর ব্যানারে পদযাত্রাটি শুরু হয়। শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক প্রদক্ষিণ করে মহিপাল পাউবো কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন হাতে পাউবোর অসাধু কর্মকর্তাদের দুর্নীতির প্রতিবাদ জানিয়ে স্লোগান দেয়।
পরে আট দফা দাবি সম্বলিত লিফলেট পাউবো কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেন আয়োজক সাংগঠকরা। পদযাত্রা শেষে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসক ও পাউবোর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর হাতে দাবি সম্মিলিত লিফলেট তুলে দেন সংগঠকরা।
এ সময় জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক (উপসচিব) ও ফেনী পৌর প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইসমাইল হোসেন, পাউবোর কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পদযাত্রা পূর্ববর্তী ফেনীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সংগঠক ওসমাণ গণি রাসেল ও নিশাদ আদনানের যৌথ সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন মুফতি আব্দুল হান্নান, আবু তালেব রিপন, আব্দুর রহিম ফরহাদ, জাহিদুল ইসলাম, আজিজ উল্লাহ আহমদি, নূর নবী হাসান, খন্দকার সুমন।
পদযাত্রার শুরুতেই বিমান বাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে মাইলস্টোনের নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণ ও আহতদের সুস্থতা কামনায় এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে দোয়া-মোনাজাত পরিচালনা করেন মাওলানা আব্দুল ফাত্তাহ।
আয়োজকরা বলেন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করায় প্রতিবছর ভারি বর্ষণ ও উজানের পানির ঢলে সীমান্তবর্তী মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে ফেনীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি নিঃস্ব হয় নদীর বেড়িবাঁধ সংলগ্ন মানুষজন।
তাদের আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- টেকসই ও প্রজন্মভিত্তিক বাঁধ নির্মাণ, বাঁধ নির্মাণের দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে প্রদান, নদী শাসন ও অবৈধ বালু উত্তোলন রোধ, মুসাপুর ক্লোজার ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণ, খাল খনন ও খাল দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা, ফেনী শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ, দুর্যোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং ২০২৪ এর বন্যায় সরকার ঘোষিত পুনর্বাসন প্রকল্পের প্রতিবেদন প্রকাশ ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতকরণ।
পাউবো অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচির সংগঠক নিশাদ আদনান বলেন, পূর্বনির্ধারিত এই পদযাত্রার কর্মসূচিতে ফেনীর বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কয়েকশ সংগঠক ও এলাকাবাসী দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে পানি উন্নয়ন বোর্ডে গিয়ে দাবিগুলো দিয়েছেন।
পদযাত্রায় আয়োজনের অপর সংগঠক ওসমান গণি রাসেল বলেন, “প্রতিবছর বাঁধ ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নদী পাড়ের মানুষজন। পাউবো দায়সারা সংস্কারের নামে অর্থ লোপাট করে। দীর্ঘদিন ধরে এসব সমস্যা সমাধানের দাবিতে বিভিন্ন মহলে দাবি জানানো হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এবার শান্তিপূর্ণ পদযাত্রার মাধ্যমে দাবিগুলোর ব্যাপারে জোরালো জনমত গড়ে তোলা হচ্ছে।”
ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তার হোসেন মজুমদার বলেন বলেন, সীমান্তবর্তী মুহুরী, কহুয়া ও ছিলোনিয়া নদীর উপর টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে সাত হাজর ৩৪০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের নদী শাসনসহ টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের সব কর্মসূচি সম্পাদন হলে প্রতিবছর স্থায়ী বন্যার হাত থেকে ফেনীবাসীর মুক্তি মিলবে।
অতি দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশা করছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ৮ জুলাই সীমান্তবর্তী ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁদের ৪১টি স্থান ভেঙে ফুলগাজী পরশুরাম পুরো ও ফেনী সদর, ছাগলনাইয়া ও দাগনভূঞার আংশিক এলাকা প্লাবিত হয়। সরকারি তথ্যে পাঁচটি উপজেলার ১৩৭টি গ্রামের প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়।
এ সময়ে জেলায় বন্যায় সব দপ্তরের তথ্যে ক্ষতির পরিমাণ ২৩৮ কোটি ৪০ লাখ ৪৬ হাজার ৪৩১ টাকা। বন্যায় জেলার পরশুরামে ২৮টি ও ফুলগাজীতে ২০টি ঘর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত এবং ফুলগাজীতে ১০৩টি, পরশুরামে ৬৯টি ও ছাগলনাইয়ায় ৫০টি ঘর আংশিক ক্ষতি হয়েছে।
২০১৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত সাত বছরে ফেনীর মুহুরী, কহুয়া, সিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁধের ১২২ কিলোমিটার অংশে অন্তত ২০০টি স্থান ভেঙে যায়। যা মেরামতে পাউবো খরচ করেছে ৩০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ।
বিগত ২০২৪ সালে অগাস্ট মাসের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ফেনীর সব উপজেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এতে প্রাণহানি হয় ২৯ জনের। পানিবন্দি ছিলেন ১০ লাখেরও বেশি মানুষ।
ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যানবাহন, ঘরবাড়ি ও ব্যবসা-বাণিজ্যসহ প্রায় সব খাত। সেই বন্যায় প্রায় দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ২০ লাখ ৫০০ টাকার ক্ষতি হয়েছিল বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছিল।