১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ঢাবিতে পিটিয়ে হত্যা: ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিল, দাবি স্বজনদের

তোফাজ্জলের ভাবী বলেন, একটি নম্বর থেকে ফোনে বলা হয়, ‘আপনি যদি তাকে বাঁচাতে চান তবে এখনই আমাদের বিকাশ নম্বরে ২ লাখ টাকা পাঠান। তা না হলে আমরা মেরে ফেলব’।”

বরগুনা প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 20 Sep 2024, 12:06 AM

Updated : 26 Aug 2026, 10:30 AM

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার আগে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছিল বলে দাবি তার স্বজনদের। 

নিহত তোফাজ্জলের (৩০) বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের তালুকের চরদুয়ানি গ্রামে। 

তোফাজ্জলের ভাবী শরিফা বেগম বলেন, “বুধবার রাতে তোফাজ্জল প্রথম একটি নম্বর থেকে কল করে বলে, ‘ভাবী আমাকে মোবাইল চোর সন্দেহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আটকে মারধর করা হয়েছে’।  

“তোফাজ্জলের সঙ্গে কথা বলার কিছুক্ষণ পর আবার নতুন একটি নম্বর দিয়ে আমাকে কল করে জানানো হয়, ‘আপনি যদি তাকে বাঁচাতে চান তবে এখনই আমাদের বিকাশ নম্বরে দুই লাখ টাকা পাঠান। তা না হলে আমরা মেরে ফেলব।’ এরপর আমি ভয়ে মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখি।” 

শরিফা বেগম বলেন, “সকালে জানতে পারি, আমার দেবরকে হত্যা করা হয়েছে। আমি হত্যাকাণ্ডে যারা সম্পৃক্ত তাদের বিচার দাবি করছি।” 

পাথরঘাটা থানার ওসি আল মামুন বলেন, “তোফাজ্জল মানসিক ভারসাম্যহীন, এটা আমি জানি। তার সঙ্গে যেটা হয়েছে তা অমানবিক। যেসব নম্বর থেকে টাকা চাওয়া হয়েছে, সেসব নম্বর বর্তমানে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।”  

বুধবার সন্ধ্যায় চোর সন্দেহে তোফাজ্জলকে আটক করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের শিক্ষার্থীরা। 

কয়েক দফায় মারধর করার পর রাত ১২টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। 

হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুধবার সন্ধ্যায় হলে ক্রিকেট টুর্নামেন্ট চলছিল। তখন যুবক তোফাজ্জল হলে প্রবেশ করলে শিক্ষার্থীরা দুপুরে ছয়টি মোবাইল চুরির ঘটনায় চোর সন্দেহে তাকে ভবনের অতিথি কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে মারধরের পাশাপাশি জেরা করা হয়। 

একপর্যায়ে, তাকে নিয়ে হল ক্যান্টিনে খাওয়ানো হয়। এরপর এক্সটেনশন ভবনের অতিথি কক্ষে নিয়ে দ্বিতীয় দফায় ব্যাপক মারধর করেন একদল শিক্ষার্থী।  

মারধরের ফলে ওই যুককের পা থেকে রক্ত বের হতে থাকে। এরপর রাত পৌনে ১০টার দিকে ফের মূল ভবনের অতিথি কক্ষে নিয়ে মারধর করা হয়। 

এরপর ১০টার দিকে প্রক্টোরিয়াল মোবাইল টিমের সদস্যরা এলে মারধরকারীরা তোফাজ্জলকে ওই টিমের হাতে তুলে দিতে অস্বীকৃতি জানান। 

পরে কিছু শিক্ষার্থী ও কয়েকজন হাউস টিউটরের সহায়তায় তোফাজ্জলকে প্রথমে শাহবাগ থানায় এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তোফাজ্জলের স্বজনরা জানায়, দুই ভাই আর বাবা-মা মিলে ছিল তোফাজ্জলদের সুখী পরিবার। আট বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তোফাজ্জলের বাবা মারা যান। পাঁচ বছর আগে মারা যান তার মা।

মা মারা যাওয়ার পর থেকে তোফাজ্জলের আচরণে সমস্যা দেখা দেয়। তখন তার বড় ভাই পুলিশের এসআই নাসির হোসেন তোফাজ্জলকে দেখেশুনে রাখতেন, মানসিক রোগের চিকিৎসা করাতেন। সেই ভাইও গত বছর রোজায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এরপর থেকেই তাকে দেখার আর কেউ ছিল না। পথে পথে একেবারে উন্মাদ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তিনি।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তোফাজ্জলের মরদেহ নিতে এসেছিলেন তার মামাত বোন আসমা আক্তার তানিয়া।

তিনিও সাংবাদিকদের কাছে মুক্তিপণ দাবির বিষয়টি জানিয়ে বলছিলেন, “বুধবার রাত ১১টার দিকে আমার বাবাকে ফোন দিয়ে বলছে আপনি কী তোফাজ্জলের মামা? তখন আমার আব্বা বলছে, ‘হ্যাঁ’।

“তখন তারা বলছে ‘ওকে আমরা হলে আটকাইছি। ও মোবাইল চুরি করছে। ছাড়াতে হলে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া লাগবে। টাকা দিয়ে ছাড়ায় নেন, না হলে আমরা আরও মারব।’ তখন আব্বা বলছে, ‘আমি তো গ্রামে থাকি, ক্যামনে কী করব?’।”

আরও পড়ুন:

'ও পাগল', ফোনে মামাত বোনের আকুতি শুনেও তোফাজ্জলকে পিটিয়ে হত্যা

ঢাবিতে চোর সন্দেহে 'গণপিটুনি', যুবকের মৃত্যু

ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যু: ৫ দফা মারধরের পর দেওয়া হয় পুলিশে