এসিল্যান্ড সুনন্দা সরকার প্রমা মরিচালি গ্রামে ইয়াসিন শেখের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের খোঁজ-খবর নেন।
Published : 03 Apr 2025, 09:32 PM
রাশিয়ার সেনাবাহিনীর চুক্তিভিত্তিক সদস্য হিসেবে ইউক্রেইনে যুদ্ধ করতে গিয়ে মিসাইলের আঘাতে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার এক যুবক মারা গেছে বলে পরিবার খবর পেয়েছে। বিষয়টি জানতে পেরে স্থানীয় প্রশাসনও গিয়ে পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিয়েছে।
নিহত ইয়াসিন শেখের পরিবার জানিয়েছে, রাশিয়ায় থাকা বন্ধু মেহেদী হাসান তার মৃত্যুর বিষয়টি জানিয়েছে। ২৭ মার্চ ইয়াসিন মারা গেলেও ঈদের পরদিন পরিবার সেটি জানতে পেরেছে।
উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের মরিচালি গ্রামে ইয়াসিনের মা ও ব্যবসায়ী বড় ভাই রুহুল আমিন বসবাস করেন। তার বাবার নাম সত্তর মিয়া। তিনি ২০১৬ সালের ১ মার্চ মারা যান। তার চার সন্তানের মধ্যে দুজন আগেই মারা গেছেন। এখন ইয়াসিনের মৃত্যুর খবরে পরিবারে চলছে শোকের মাতম। তার গ্রামের মানুষও শোকগ্রস্ত। তারা মরদেহ ফিরিয়ে আনতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বিষয়টি জানার পর গৌরীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুনন্দা সরকার প্রমা মরিচালি গ্রামে ইয়াসিন শেখের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের খোঁজ-খবর নেন।
গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাজ্জাদুল হাসান বলেন, “বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। এ ব্যাপারে সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এর আগে দালালের খপ্পরে পড়ে রাশিয়ায় গিয়ে ‘ভাড়াটে সৈনিক’ হিসেবে ইউক্রেইন যুদ্ধে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রাণ হারান নাটোরের সিংড়া উপজেলার হুলহুলিয়া গ্রামের যুবক মো. হুমায়ুন কবির। একই রণাঙ্গনে আটকা রয়েছেন তার ভগ্নিপতি মো. রহমত আলী। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বারবার পরিবারের কাছে আকুতি জানিয়েছেন।
যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়ার সরদারপাড়ার জাফর আলীও অভিযোগ করেছেন, দালালরা তাকে রাশিয়া নিয়ে বিক্রি করে দিয়েছেন। তিনি এখন ইউক্রেইন যুদ্ধের ময়দানে রয়েছেন। তিনিও দেশে ফিরে আসতে চান।
সারাদেশে এরকম আরও কয়েকজনের কথা জানা যাচ্ছে, যারা এখন রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা এরই মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বিষয়টি শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে এনেছেন। ঢাকা থেকে বিষয়টি রাশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রম কল্যাণ উইংয়ে জানানো হয়েছে।
এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি নেপালে পালিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে রাশিয়ায় মানবপাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে ফাবিহা জেরিন তামান্না নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।
এর মধ্যে আরেক বাংলাদেশি যুবক ময়মনসিংহের ইয়াসিন শেখের যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতের খবর জানতে পারল পরিবার।
ইয়াসিনের পরিবারের সদস্যরা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, গত সেপ্টেম্বরে ইয়াসিন একটি কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে রাশিয়ায় যান। তিন মাস পর তিনি দেশটির ভাড়াটে সেনা হিসেবে যোগ দেন।
ইয়াসিনের চাচাতো ভাই রফিকুল ইসলাম রবি বলেন, “রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে রুশ ভাষা শেখে ইয়াসিন। পরে এক বন্ধুর সহায়তার ইয়াসিন রাশিয়ায় একটি কোম্পানিতে ভালো চাকরি পায়। সবই ঠিকটাক মত চলছিল। পরে সে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে সব উলটপালট হয়ে যায়।”
তিনি দাবি করেন, “রাশিয়া সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সময় ইয়াসিনের মা ও বড় ভাইকে গাড়িতে করে ঢাকায় নিয়ে অনাপত্তিপত্রে স্বাক্ষর নেয় তাকে রাশিয়াতে পাঠানো এজেন্সির লোকজন। ২৬ মার্চ মায়ের সঙ্গে ইয়াসিনের শেষবারের মত কথা হয়। কয়েকদিনের মধ্যেই দশ লাখ টাকা পাঠাবে বলে মাকে জানিয়েছিল সে। এখন তো মৃত্যুর খবর এসেছে।
“ইয়াসিনের মরদেহের কী অবস্থা, লাশ দেশে আনা যাবে কি-না তা নিয়ে কোনো তথ্যই পাওয়া যাচ্ছে না। ছেলের ছবি নিয়ে তার মা শুধু কান্নাকাটি করছেন আর বড়ভাই এর কাছে ওর কাছে গিয়ে ধরনা দিচ্ছেন কিছু করা যায় কি-না।”
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত নাটোরের এক যুবক
দালালের খপ্পড়ে পড়ে রাশিয়ায়, রণাঙ্গনে ‘বিক্রি’: এক বাংলাদেশির মৃত্যু, বাঁচার আকুতি দুইজনের
রাশিয়ায় মানব পাচারের অভিযোগে নারী গ্রেপ্তার
ইউক্রেইনে যুদ্ধের ডামাডোলে উৎকণ্ঠায় বাংলাদেশিরাও
দালালের খপ্পরে পড়ে রুশ বাহিনীর হয়ে ইউক্রেইন যুদ্ধে ভারতীয়রা
পরিবারের লোকজন ও বন্ধুরা জানিয়েছেন, ইয়াসিনের খুব ছোটবেলা থেকেই শখ ছিল সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার। দেশে না হোক রাশিয়ায় সেনাবাহিনীতে কাজ করতে পারায় তিনি খুব খুশি ছিলেন।
ইয়াসিন তার রাশিয়ায় বসবাস ও সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে তার ফেইসবুক অ্যাকাউন্টে নিয়মিত ভিডিও দিতেন। তার অ্যাকাউন্ট ঘুরে রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেইন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ছবি ও ভিডিও দেখা যাচ্ছে।
সবশেষ ১ মার্চ ইয়াসিন ফেইসবুকে একটি ভিডিও আপলোড করেন। সেখানে তিনি তার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী, রাশিয়ায় যাওয়া, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া এবং তার স্বপ্নপূরণের বিষয়ে কথা বলেন।
সেই ভিডিওতে ইয়াসিন তার রাশিয়া যাওয়ার বিষয়ে জানান, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়ায় একটি চীনা কোম্পানিতে চাকরির আবেদন করেন। সেপ্টেম্বর মাসে তিনি অফার লেটার পান এবং রাশিয়া চলে যান। মস্কো থেকে প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার দূরে তার কর্মস্থল ছিল।
সেই কোম্পানিতে তিন মাস চাকরি করার পর অনলাইনে আবেদন করে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক সৈনিক হিসেবে যোগ দেন।
ইয়াসিন দেশে থাকতে ছাত্রদলের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন বলে দাবি করেছেন। বিভিন্ন সময়ে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিচারণও করেন।
ভিডিওতে ইয়াসিন এটাও বলেন যে, সরকারিবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি যে সাহস সঞ্চয় করেছেন সেটি তাকে ইউক্রেইন যুদ্ধে যোগ দেওয়ার মনোবল তৈরি করেছে। যুদ্ধে মৃত্যু হলেও তার কোনো আফসোস থাকবে না।
ময়মনসিংহ জেলা যুব ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জহুরুল আমিন রুবেলের গ্রামের বাড়িও ডৌহাখলা ইউনিয়নে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাতে তিনি বলেন, তিনিও বিষয়টি শুনেছেন। এলাকার মানুষজনও ইয়াসিনের মৃত্যুর বিষয়টি অবগত।