Published : 14 May 2026, 01:43 AM
সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সুন্দরবনের নদী-খালে চলছে অবাধে পারশে মাছের পোনা নিধন। নিষিদ্ধ জাল দিয়ে এ পোনা ধরতে গিয়ে বিপুল হারে উঠে আসছে অন্যান্য জলজ প্রাণ-সম্পদও। এতে সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র্য ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ার কথা বলছেন গবেষকরা।
দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়ি ঘেরগুলো সুস্বাদু এই পারশে মাছের পোনার অন্যতম গন্তব্য। পোনা নিধনের নিষেধাজ্ঞার কারণে ঘের মালিকরা তা কেনার বিষয়ে তথ্য দিতে চান না। তাদের সঙ্গে কথা বলে ধারণা করা যায়, চাহিদামত তারা পোনা পাচ্ছেন এবং চিংড়ির পাশাপাশি ঘেরে তা চাষও করছেন।
এতে সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র্যে কী আঘাত পড়ছে তার একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীন খুলনার পাইকগাছা নোনা পানি গবেষণা কেন্দ্র।
তাদের তথ্য বলছে, একটি পারশে পোনা আহরণের বিপরীতে কমপক্ষে ১১৯ চিংড়ি, ৩১২ প্রাণিকণা ও ৩১টি অন্য প্রজাতির মাছের পোনা ধ্বংস হয়।
সুন্দরবন নিয়ে কাজ করেন এমন সংগঠক-পরিবেশবাদী, বনজীবী ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পারশে মাছের পোনার সংগ্রহের একটি ‘জঙ্গল’ চক্র সারাবছরই সুন্দরবনে সক্রিয় থাকে। এদের সঙ্গে বনের অসৎ নিরাপত্তা কর্মী, বন বিভাগের লোকজনেরও যোগসাজশ থাকার অভিযোগ আছে। এদের মাধ্যমেই এ মাছের পোনা চিংড়ি ঘের পর্যন্ত পৌঁছায়।
সুন্দরবন ঘেঁষা মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের বনজীবী সামাদ শেখ বলেন, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের চিংড়ি ঘেরে প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা পারশে পোনার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ২০-২৫টি দল সুন্দরবনে এ পোনা শিকার করে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুন্দরবনের আলোর কোল, দুবলার চর, বঙ্গবন্ধুর চর, বাটলুরচর, নেরালী, কালার মাথা, মজ্জতের গোড়া, মানিকখালী, নীলবাড়ী, নারিকেলবাড়িয়া, টিয়ের চর, আগুন জ্বলা, মজ্জত এলাকার নদী-খাল থেকে বিপুল পরিমাণ পারশে পোনা শিকার করা হচ্ছে।
সাধারণত টানা বা বেহুন্দী জাল দিয়ে চিংড়ির পোনা ধরেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এসব জাল মশারির মত প্রায় নিশ্ছিদ্র। একই জাল ব্যবহার করা হয় পারশে মাছের পোনা ধরতে। বাংলাদেশ মৎস্য আইনে মাছের পোনা সংরক্ষণে সোয়া চার ইঞ্চির কম ফাঁস জাল ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন সুরক্ষা ও উপকূলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে। কোনো অনৈতিক কাজে বন বিভাগের কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কমছে মাছের ভাণ্ডার
বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের ছয় হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশ অংশে জলভাগের পরিমাণ ১৮৭৪ বর্গকিলোমিটার; যা পুরো সুন্দরবনের আয়তনের ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ। বর্তমানে ১৩টি বড় নদীসহ ৪৫০টির মত খাল রয়েছে সুন্দরবনে।
সুন্দরবনের আয়তনের অর্ধেকের বেশি এলাকা এখন অভয়ারণ্য। এসব এলাকায় জেলেদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ‘পূর্ব’ ও ‘পশ্চিম’ এই দুটি প্রশাসনিক বিভাগে বনের বাংলাদেশ অংশ বিভক্ত। খুলনা ও সাতক্ষীরা অংশ নিয়ে পশ্চিম সুন্দরবন। বাগেরহাট ও খুলনার কিছু অংশ নিয়ে পূর্ব সুন্দরবন।
জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হওয়া সুন্দরবনের জলাধার ভেটকি, রূপচাঁদা, দাঁতনে, চিত্রা, পাঙাশ, লইট্যা, ছুরি, মেদ, পারশে, পোয়া, তপসে, লাক্ষা, কই, মাগুর, কাইন, ইলিশসহ ২১০ প্রজাতির সাদা মাছের আবাস। রয়েছে গলদা, বাগদা, চাকা, চালী, চামীসহ ২৪ প্রজাতির চিংড়ি। শিলাসহ ১৪ প্রজাতির কাঁকড়ার প্রজনন হয় এখানে।
তবে অতিমাত্রায় মাছ আহরণ, জলবায়ু পরিবর্তন, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার ও পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন স্বল্পতার কারণে সামুদ্রিক মাছের মজুদ কমছে বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ও নরওয়ের যৌথ উদ্যোগে ইএএফ-নানসেন সার্ভে-২০২৫ শীর্ষক জরিপে তুলে ধরা হয়েছে।
এতে দেখা যায়, ২০১৮ সালের সর্বশেষ জরিপের পর গত সাত বছরে বঙ্গোপসাগরে মাছের মজুদ কমেছে প্রায় ৭৮ শতাংশ। ২০১৮ সালে ‘স্মল পেলাজিক’ মাছের মজুদ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ১০০ টন, ২০২৫ সালে তা কমে ৩৩ হাজার ৮১১ টনে নেমেছে। সাগরের পানির উপরিস্থ সার্ডিন, ইলিশ, ছুরি, হার্ড টেইল, ম্যাকারেল, পোয়া, আইলাসহ ৬০ প্রজাতির মাছের প্রাচুর্যও কমে গেছে।

মৌসুমী ব্যবসায় ‘সক্রিয় ২৫ চক্র’
পারশে পোনা সংগ্রহ করতে হয় বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়। ডিসেম্বর থেকে মার্চ এ পোনা সংগ্রহ ও বিক্রির উপযুক্ত সময়। এর মধ্যে ডিসেম্বর-জানুয়ারি সুন্দরবনে মাছ ধরার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকে। এর মধ্যেও এ পোনা ধরা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুন্দরবনের ভেতর ট্রলার চলাচল নিষিদ্ধ থাকলেও সাদা মাছ পরিবহনের প্রয়োজনীয়তায় কথা বলে বনবিভাগ থেকে ট্রলারের অনুমতি নেয় ‘জঙ্গল’ ব্যবসায়ী মহাজনরা। এরপর তারা বনের বিভিন্ন নদী-খালে অবাধে পারশে মাছের পোনা শিকার করেন।
অভয়ারণ্যের নদীতে পোনা ধরতে প্রতিটি দ্রুতগামী ট্রলারে আট থেকে ১০ জন জেলে আর ঘন দীর্ঘ মশারি জাল থাকে। কোনো অভিযান পরিচালনার আগেই বনবিভাগের ‘দালালরা’ জেলেদের জানিয়ে দেয়। সংকেত পেয়ে তারা বনের মধ্যে পালিয়ে যান। অভিযান শেষ হলে আবার তারা পোনা ধরতে শুরু করেন।
বনজীবী সামাদের ভাষ্যমতে, একবার জাল টানলে দুই থেকে তিন মণ পারশে পোনা পাওয়া যায়। দুদিন পর পর এসব ট্রলার সাত থেকে আট মণ পোনা নিয়ে শিবসা নদীতে আসে। সেখান থেকে বনবিভাগের নলিয়ান কার্যালয়ের সামনে দিয়েই নিয়ে যাওয়া হয় পাইকগাছা, দাকোপ ও মোংলায় বিভিন্ন মাছের মোকামে।
“খুলনার পাইকগাছা সেতুর নিচে দক্ষিণ পাশে প্রকাশ্যে এ পোনা বেচাকেনা হয়। ঘের মালিকদের কাছে আকার ভেদে প্রতি কেজি পোনা ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয়।”
সামাদের দাবি, শিবসা নদী দিয়ে পোনা আসার সময় বনবিভাগের স্টেশন ও ক্যাম্পকে ‘ম্যানেজ’ করেন জেলেরা।
তবে এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে নলিয়ান স্টেশন কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বলেন, “আমার এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি ও টহল জোরদার আছে। পারশে মাছের পোনা ধরা বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। যোগদানের পর এসব ট্রলার একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছি।”

গন্তব্য চিংড়ি ঘের
মৎস্য অধিদপ্তর খুলনা বিভাগের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, খুলনা বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে এক লাখ ৮৫ হাজার ২০৪টি চিংড়ি ঘের রয়েছে। এসব ঘেরে মৌসুমভিত্তিক পারশে পোনার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তর খুলনা বিভাগের উপ-পরিচালক বিপুল কুমার বসাক বলেন, পারশে মাছ সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের একটি সুস্বাদু মাছ। এ মাছ উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ এবং ক্ষতিকারক চর্বি নেই। উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়ি ঘের মালিকরা চিংড়ির সঙ্গে ঘেরে এ মাছেরও চাষ করেন। এ মাছ চাষে ঝুঁকি কম। দামও মেলে ভালো।
সাধারণত এর ওজন ১৫০-২০০ গ্রাম হয়। ঘেরে পোনা মজুদ করার সাত-আট মাস পর একেকটা মাছের ওজন হয় ১৫০-২০০ গ্রাম। তবে এর ওজন ৪০-৮০ গ্রাম হলেই বাজারজাত করা যায়।
বিপুল বলেন, এখনো এ মাছ চাষে উদ্যোক্তাদের প্রাকৃতিক পোনার উপরই নির্ভর করতে হয়। পারশে মাছ প্রাকৃতিক পরিবেশে ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ শীতকালে প্রজনন করে। এরা সাধারণত অধিক লোনাপানিতে ডিম দেয়। ডিসেম্বরের শেষ দুই সপ্তাহ ও ফেব্রুয়ারির শেষ দুই সপ্তাহে এ মাছ সবচেয়ে বেশি ডিম দেয়। এরা উচ্চ প্রজননকারী। ১৫ মাসের মধ্যে এদের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়।
সুন্দরবন সংলগ্ন বঙ্গপোসাগর এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খালে অবাধে পারশে মাছের পোনা নিধনে বিষয়ে তিনি বলেন, সুন্দরবনে সরাসরি অভিযানের অনুমতি না থাকায় মৎস্য বিভাগ অভিযানে যেতে পারে না।
খুলনার পাইকগাছার সোলা দানার চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, তার আড়াইশ বিঘা চিংড়ি ঘের রয়েছে। যেখানে তিনি প্রতিবছর চিংড়ির সঙ্গে পারশে মাছের পোনাও ছাড়েন।
“সুস্বাদু এই মাছটির সারাদেশেই ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। লাভও ভালো।”
তবে এক মৌসুমে তিনি কী পরিমাণ পারশে পোনা সংগ্রহ করেন সেটি জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, সাধারণত ফড়িয়াদের মাধ্যমে তিনি তা সংগ্রহ করেন।

চক্রে কারা
সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু, দুর্যোগ, সুন্দরবন সুরক্ষা ও শিক্ষা সহায়তা বিষয়ে নিয়ে কাজ করা কয়রা সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি তারিক লিটু বলেন, সুন্দরবন সংলগ্ন জনপদের কিছু প্রভাবশালী ‘জঙ্গল’ ব্যবসায়ী মহাজন বনবিভাগকে ‘ম্যানেজ’ করে পারশে পোনা নিধন করছে।
এ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মনে করেন বাংলাদেশ সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের মিডিয়া সমন্বয়ক ওবায়দুল কবির সম্রাট।
তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে বন কর্মকর্তা-রক্ষীদের উৎকোচ বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে সুন্দরবন। বনবিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-প্রহরীদের যোগসাজশে পশ্চিম সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে খুলনার কয়রা ও দাকোপ এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগরকেন্দ্রিক কয়েকটি ‘জঙ্গল’ ব্যবসায়ী চক্র গড়ে উঠেছে। যেটা কয়রা থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়।”
তিনি বলেন, “আরও কয়েকটি চক্র রয়েছে পূর্ব সুন্দরবনের বাগেরহাটের মোংলা, শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জকেন্দ্রিক। অসাধু কিছু বন কর্মকর্তা-প্রহরী বছরের পর বছর সুন্দরবনের একই এলাকায় দায়িত্ব পালন করায় তারা এসব চক্রের সঙ্গে মিশে রয়েছেন।”
প্রশাসন যা বলছে
পূর্ব সুন্দরবন বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক দ্বীপন চন্দ্র দাস বলেন, সুন্দরবনে সব ধরনের মাছের পোনা ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সম্প্রতি শেওলা ও বলেশ্বর নদী থেকে দুটি করে পারশে পোনার ট্রলার জব্দ করা হয়েছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, জনবল সংকটসহ বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও সুন্দরবনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে সচেষ্ট রয়েছেন বন কর্মকর্তা ও প্রহরীরা। প্রায়ই কীটনাশক, কীটনাশক দিয়ে ধরা মাছ, নিষিদ্ধ ঘন জালসহ সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রবেশ করা জেলেদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।