Published : 16 Jun 2026, 09:46 PM
“জীবনে অনেক বড় ভুল করছি, বাঁচি থাইকলে এই কাজ আর করুম না। আমাগো বাঁচান। অন্যায় হলে সাজা দেন, তাও বাঁচান।”
কুড়িগ্রামে রৌমারী উপজেলা সীমান্ত দিয়ে বিএসএফের ঠেলে দেওয়ার পর বিজিবির বাধায় শূন্যরেখায় আটকে থাকা একজন সাংবাদিকদের কাছে এভাবে আকুতি জানান।
মঙ্গলবার বিকালে উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তে তিন দিন ধরে স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান নিয়ে অবস্থান করা বেলাল হোসেন বলেন, “ছোট পোলাপান লইয়া খুব দুর্ভোগে পইরা আছি। পানি নাই, পায়খানা নাই, বউ ছাওয়াল নিয়া খুব অসুবিধায় আছি। দিনের বেলা প্রচণ্ড গরমে বাচ্চা দুইডা অসুস্থ হয়া রইছে।”
ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে; দ্রুত সমাধানের চেষ্টার কথা বলেছেন জামালপুর-৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান।
রোববার ভোরে উপজেলার গয়টাপাড়া বংশিরচর বটতলা সীমান্ত দিয়ে ছয়জন এবং ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে তিনজনকে ঠেলে দেয় বিএসএফ। এতে বাধা দেয় বিজিবি ও স্থানীয়রা। ঘটনার সময় ধাওয়া- পাল্টা ধাওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তারা। এরপর থেকে তারা শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।
গয়টাপাড়া সীমান্তে ‘পুশ ইনের’ শিকার ছয়জনের মধ্যে দুইজন শিশু, একজন নারী ও দুইজন পুরুষ।
এদিন বিকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ওই ছয়জন খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। তাদের চোখে-মুখে ভয় আর আতঙ্কের ছাপ। ছয় মাসের শিশুসহ ‘পুশ ইনের’ শিকার ছয়জনকে দেখতে সারাদিন ভিড় জমাচ্ছেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা বাসিন্দারা।
‘পুশ ইনের’ শিকার সুমি আক্তার বলেন, “তিন দিন ধইরা আমরা এই গরমের মধ্যে এই জায়গাটায় আছি। কোলে ছয় মাসের শিশু ও চার বছরের এক সন্তান রয়েছে। খাবার নাই, পানি নাই, মাথার উপর ছাদ নাই। বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে, কিছুই খাবার দিতে পারতেছি না। অনেকে বিস্কুট রুটি দিতাছে তাই দিয়ে ক্ষুধা মিটাইতাছি।”
ভারতে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সুমি আক্তার বলেন, ২৭ দিন আগে কাজের সন্ধানে সিলেট সীমান্ত দিয়ে বাবা-মাসহ অবৈধপথে ভারত যান তারা। দেশটির পুলিশ টের পেয়ে তাদের বিএসএফের হাতে তুলে দেয়।
ভুক্তভোগীরা নিজেদের ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামের বাসিন্দা বলে দাবি করেন।
গয়টাপাড়ার বাসিন্দা ছক্কু মিয়া বলেন, তিন দিন হয়ে গেল দুই দেশের কোনো সরকারই তাদেরকে নিচ্ছে না। ভুক্তভোগীরা চরম ঝুঁকির মধ্যে দিন পার করছেন। বিষয়টি নিয়ে সীমান্ত পর্যায়ে আলাপ আলোচনা করে অসহায় বাচ্চা দুটির মুখের দিকে তাকিয়ে দ্রুত সমাধান হওয়া দরকার।
শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের (ইউপি) সদস্য সোনা মিয়া বলেন, “বাচ্চাসহ লোকগুলা খুব কষ্টে খোলা আকাশে দিন পার করছে। গরমে বাচ্চা দুটো কাঁনতেছে। ঠিকমত খাবার নাই, পানি নাই, টয়লেটের ব্যবস্থা নাই, রাতে সাপ-বিচ্ছুর ভয়, মশার কামড়ে তাদের যায় যায় অবস্থা।
“বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিচ্ছে না। সমাধান না হওয়ায় এই বাচ্চাগুলোর বড় একটা বিপদ হয়ে যেতে পারে।”
ঘটনার পর থেকে বিজিবির সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারাও গয়টাপাড়া ও ভন্দুরচরসহ সীমান্তে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
যেকোনো অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদারের কথা জানিয়েছেন বিজিবির গয়টাপাড়া বিওপির ক্যাম্পের হাবিলদার মাসুদ রানা।
তিনি বলেন, ঘটনার দিন গয়টাপাড়া সীমান্ত দিয়ে ছয়জন ও ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে তিনজনকে বাংলাদেশি সন্দেহে ‘পুশ ইন’ করার চেষ্টা করলে বিজিবি ও স্থানীয়রা বাধা দেয়। এরপর থেকে তারা ভারতীয় ভূখণ্ডের প্রায় ৫০ গজের ভেতরে সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।
ওই সকালে বিজিবি ও বিএসএফের পক্ষ থেকে কোম্পানি পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে বিএসএফ ‘পুশ ইনের’ ঘটনাটি অস্বীকার করায় কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়।