Published : 02 Dec 2025, 08:33 AM
কেন্দ্রীয়ভাবে মনোনয়ন ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মাঠ ছাড়ছেন না কুমিল্লার বিএনপির মনোনয়ন না পাওয়া নেতারা। নিজেদের উপস্থিতি ও ‘প্রভাব’ টিকিয়ে রাখতে প্রায় প্রতিদিনই শোভাযাত্রা, মিছিল ও সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করছেন তাদের সমর্থকেরা।
এতে স্থানীয় রাজনীতির মাঠে চাপা উত্তেজনা যেমন আছে, তেমনি বিভক্ত হয়ে পড়ছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।
জানা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপির ৩১ দফা বাস্তবায়নের প্রচার, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা এবং ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তোলার ব্যানারে এসব কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন নেতাকর্মীরা।
তবে স্থানীয়ভাবে এসব কর্মসূচি দলীয় ‘হাইকমান্ডের’ কাছে মনোনয়ন না পাওয়া নেতাদের ‘আধিপত্য’ ও ‘জনপ্রিয়তা প্রমাণের’ চেষ্টা বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
৩ নভেম্বর বিএনপি ২৩৭টি (পরে একটি আসনে মনোনয়ন স্থগিত করা হয়) আসনের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করার পর কুমিল্লা-৫, ৬, ৯ ও ১০ আসনে মনোনয়ন না পাওয়া মিজানুর রহমান, আবদুল্লাহ আল মামুন, আমিন উর রশিদ ইয়াছিন, সামিরা আজিম দোলা ও মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়ার সমর্থকরা মনোনয়নের দাবিতে নিয়ে রাস্তায় নামেন।
পরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ইয়াছিন ও দোলা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলেও মাঠ ছাড়েননি ইয়াছিন। এখনও কেন্দ্রের ‘সুদৃষ্টির প্রত্যাশায়’ নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া বলছেন, “যে মনোনয়ন ঘোষণা করা হয়েছে, তার পক্ষেই সবাই কাজ করছে। পরিবর্তন হবে কি-না তা নিয়ে কোনো নির্দেশনা আমাদের কাছে আসেনি।
“তবে বঞ্চিত যারা মাঠে রয়েছেন, তাদের পর্যবেক্ষণ করছে হাইকমান্ড।”
এদিকে কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) এবং কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনে এখনও প্রার্থী ঘোষণা করেনি বিএনপি।
কুমিল্লা-৬: আন্দোলন স্থগিত, কর্মসূচি অব্যাহত
কুমিল্লা মহানগর, সদর ও সদর দক্ষিণ উপজেলা নিয়ে কুমিল্লা-৬ আসনে বিএনপির মনোনয়ন ঘিরে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় ছিলেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য আমিন উর রশিদ ইয়াছিন এবং চেয়ারপারসনের আরেক উপদেষ্টা সাবেক সংসদ সদস্য ও হুইপ মনিরুল হক চৌধুরী।
বিএনপির ‘প্রাথমিক মনোনয়নের তালিকায়’ জায়গা পান মনিরুল হক চৌধুরী।
এরপর ৩ নভেম্বর রাত থেকেই ইয়াছিনের সমর্থকরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ, নগরজুড়ে সড়ক অবরোধ, মশাল মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি শুরু করেন।
পরে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ফোনালাপের পর নেতাকর্মীদের আন্দোলন-সংগ্রাম স্থগিতের ঘোষণা দেন ইয়াছিন। তবে কুমিল্লা-৬ আসনে তার দৈনন্দিন কর্মসূচি এখনও চলছে। একই সময় এলাকায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মনিরুল হক চৌধুরীর ধানের শীষের পক্ষে প্রচার ও সভা-সমাবেশও অব্যাহত রয়েছে।
ইয়াছিনের সমর্থকদের পাল্টায় মনিরুল হক চৌধুরীর অনুসারীদের কর্মসূচিতে নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। জেলা, উপজেলা ও মহানগরের বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের বহু নেতাকর্মীরাও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন।
গেল ২০ নভেম্বর কুমিল্লা নগরীর টাউন হল মাঠে ইয়াছিন ও মনিরুল পক্ষ প্রায় এক সময়েই কর্মসূচি ঘোষণা করে। এক দিন আগে থেকেই মাঠ দখলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা দেখা দেয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কায় প্রশাসন উভয় পক্ষকে মাঠ ছাড়ার চিঠি পাঠায় এবং সেখানে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
কর্মসূচির দিন উভয় দলই উত্তেজনার মধ্যে কান্দিরপাড়ে কর্মসূচি পালন করে। পূবালী চত্বরে আয়োজিত সমাবেশে ধানের শীষে ভোট চেয়ে বক্তব্য রাখেন প্রার্থী মনিরুল হক। কর্মসূচিতে সবাই ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান এবং দলের ৩১ দফা বাস্তবায়নের প্রচার করেন।
আর লিবার্টি মোড়ে জেলা ও মহানগর বিএনপির কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করেন ইয়াছিন।
মনোনয়ন নিয়ে দলের সিদ্ধান্তের বিষয়ে ইয়াছিন বলেন, “আমি অপেক্ষা করছি। আশা করছি, হাই কমান্ড আবারও কুমিল্লা-৬ আসনের বিষয়টি বিবেচনা করবেন। বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল, তাই আমি আশা করি দল অধিকাংশ মানুষের পছন্দকেই প্রাধান্য দেবে।”
বিএনপির মানোনয়ন পাওয়া নিয়ে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির বিষয়ে দলের চেয়ারপারসনের এই উপদেষ্টা বলেন, “যারা আমার মনোনয়নের দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে, তারা শুধু আমার নেতাকর্মী নয়, তারা আমার সমর্থক। পাশাপাশি সাধারণ ভোটাররাও রাজপথে নেমেছে।
“আমার সমর্থকরা দলের হাই কমান্ড বা শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সবার কাছে গিয়ে গিয়ে হয়ত আমার কথা জানান দিতে পারবে না। তাই তারা প্রতিদিনই কর্মসূচি পালন করছে। তারা তারেক রহমানের ৩১ দফা প্রচার ও আমার কুমিল্লা নিয়ে ভাবনাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।”
অন্যদিকে কুমিল্লা-৬ সদর আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দলের চেয়ারপাসনের আরেক উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধুরী বলছেন, “এখানে যারা আন্দোলন-সংগ্রাম করছেন; তাদেরও একসময় শুভবুদ্ধির উদয় হবে। আমরা এক সঙ্গে মিলেমিশে বিএনপি করব।”
দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত জানিয়ে তিনি বলেন, “দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। দলের সব স্তরের নেতা-কর্মীরা আমার সঙ্গে, ধানের শীষের পক্ষে আছেন।”
কুমিল্লা-৫: ‘মনোনয়ন জয়ের’ প্রত্যাশা
বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া নিয়ে কুমিল্লা-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব জসিম উদ্দিন। তবে মনোনয়নপ্রত্যাশী বুড়িচং উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. মিজানুর রহমানের সমর্থকরা তার মনোনয়নের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি করেছেন। সমর্থকদের টানা কর্মসূচিতে মিজানুর রহমানও উপস্থিত থাকছেন।
এ ছাড়া আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুনের পক্ষের নেতাকর্মীরা মহাসড়কে কর্মসূচি পালন করেছেন।
কুমিল্লা-৫ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জসিম উদ্দিন বলেন, “আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা মোতাবেক মনোনয়ন পাওয়ার পর বঞ্চিত সব নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি; দেখা করেছি। তাদের অনেকে বলেছেন, ‘এটা প্রাথমিক মনোনয়ন’।
“আমি বলেছি, প্রাথমিক হলেও এটাই তো এখনও পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আসেন একসঙ্গে মিলেমিশে দলের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে কাজ করি। পরবর্তীতে দল যদি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে তখন দেখা যাবে।”
তিনি বলেন, “দুই উপজেলার বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকরা আমার সঙ্গে আছেন। আমরা একসঙ্গে নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছি।”
মনোনয়ন না পাওয়া মিজানুর রহমান বলেন, “দীর্ঘ সময় ধরে দলের দায়িত্ব পালন করেছি, দলের জন্য কাজ করি। দলীয় মনোনয়নে দুইবার উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলাম। এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী।
“দল প্রাথমিকভাবে একটা তালিকা প্রকাশ করেছে; এটা চূড়ান্ত নয়। আমার মতো অন্য যারা প্রত্যাশী আছেন দল তাদের সঙ্গে বসবে। সেখান থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। আমি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।”
কুমিল্লা-৯: মধ্যস্থতার পরও কর্মসূচি
লাকসাম ও মনোহরগঞ্জ নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-৯ আসনে বিএনপি মনোনয়ন পেয়েছেন দলের শিল্প বিষয়ক সম্পাদক মো. আবুল কালাম।
ওই আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী, সাবেক এমপি আনোয়ারুল আজিমের মেয়ে সামিরা আজিম দোলা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছিল, যা এক পর্যায়ে দ্বন্দ্বে রূপ নেয়।
পরে দলীয় ‘হাই কমান্ডের’ নির্দেশে দলের ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্যা বুলু ও জেলা বিএনপি সভাপতি জাকারিয়া তাহের সুমন ও সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান ওয়াসিমের মধ্যস্থতায় সামিরা আজিম দোলা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার ঘোষণা দেন।
তবে সর্বশেষ ২৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় সামিরা আজিম দোলা বলেন, “আমরা অনেকগুলো শর্ত দিয়ে একসাথে কাজ করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমার নেতাকর্মীদের সেভাবে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে না। তাই আমি আবারও সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তফসিল পর্যন্ত মনোনয়নের জন্য মাঠে থাকার।”
ওই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন ডাকসুর সাবেক সদস্য রশিদ আহমেদ হোসাইনী। তিনি এখনও কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
কুমিল্লা-১০: দ্বন্দ্ব ও অপেক্ষা
লালমাই ও নাঙ্গলকেট উপজেলা নিয়ে পুনর্বিন্যস্ত কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল গফুর ভুঁইয়া। তবে মনোনয়নপ্রত্যাশী মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়া তার মনোনয়নের দাবিতে কুমিল্লা-নোয়াখালী মহাসড়ক এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়েছেন।
মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়া বলেন, “আমরা দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। যদি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হয়, ধানের শীষের পক্ষে আছি। দলের বাইরে কেউ নেই।”
এ নিয়ে গফুর ভূঁইয়ার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাকি কুমিল্লা-২, কুমিল্লা-৭
এদিকে কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস) আসন নিয়ে বিএনপি এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানা গেছে। ওই আসন থেকে বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের নেতা সেলিম ভুঁইয়াসহ অন্তত ছয়জন মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন।
অন্যদের মধ্যে আছে উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আক্তারুজ্জামান সরকার, খালেদা জিয়ার সাবেক এপিএস আবদুল মতিন খান, হোমনা উপজেলা চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান। এই আসনটি বিএনপি তাদের শরিক কোনো দলকে ছাড় দেওয়ার গুঞ্জনও রয়েছে।
একই অবস্থা কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আসনেও। স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, এ আসন থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ নির্বাচন করবেন। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক এই দলকে আসনটি ছাড় দিলে বিএনপি এখানে প্রার্থী নাও দিতে পারে।
এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন দলের উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আতিকুল আলম শাওন।
দুটি আসনে বিএনপির সিদ্ধান্তের বিষয়ে সেলিম ভুঁইয়া বলেন, “মনোনয়ন দেওয়া দলীয় হাই কমান্ডের বিষয়। এ বিষয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই। তবে আমি আমার নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছি।”