Published : 24 Jun 2023, 07:58 PM
দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে লিবিয়া হয়ে সমুদ্র পথে ইতালি যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে নরসিংদীর এক যুবক মারা গেছেন- এমন খবর পেয়েছে তার পরিবার।
রায়পুরা উপজেলার উত্তর বাখরনগর ইউনিয়নের বড়চর গ্রামের মৃত হযরত আলীর ছেলে আব্দুল নবীর (২২) মৃত্যুর খবর তার পরিবারে আসার পর জেলার অন্তত সাতটি পরিবারে আহাজারি শুরু হয়েছে। কারণ এসব পরিবারের সদস্যরাও দালালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে দেশ ছেড়েছেন।
যেহেতু তারা অবৈধভাবে বিদেশ গিয়েছেন ফলে এ ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন বা পুলিশের কাছে তাদের ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই। এ নিয়ে থানায় কেউ কোনো অভিযোগ করেনি বা তথ্য জানায়নি।
আব্দুল নবীর মৃত্যুর খবর পেলেও ঠিক কবে দুর্ঘটনা ঘটেছে সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য পায়নি পরিবার।
নবীর বড় ভাই মাহ আলম সাংবাদিকদের বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে এক লিবিয়া প্রবাসী তাদের টেলিফোন করে ভাইয়ের মৃত্যুর খবর জানান। সেখান থেকেই তারা জানতে পারেন যে, আব্দুল নবীর মরদেহ লিবিয়ার একটি হাসপাতালের হিমঘরে রয়েছে।
কয়েক মাস আগে নবী ইতালি যাওয়ার জন্য দেশ ছাড়লেও প্রায় এক মাস ধরে ভাইয়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না বলে জানান মাহ আলম।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একইভাবে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই বেলাব উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের টান লক্ষ্মীপুর ও চর লক্ষ্মীপুর এলাকার বিল্লাল মিয়ার ছেলে সৈকত (২০), রহিম মিয়ার ছেলে আবু তাহের (২৭), রতন মিয়ার ছেলে জহিরুল ইসলাম (১৯), আউয়াল মিয়ার ছেলে উজ্জ্বল মিয়া (১৮), ওবায়দুল্লাহর ছেলে রহমত উল্লাহ (২০), মোক্তার হোসেনের ছেলে জিহাদ (১৯) এবং কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার বড় ছয়সূতি এলাকার বাছেদ মিয়ার ছেলে স্বপনের (২৭)।
এদের মধ্যে অন্তত দুইজনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছেন সাংবাদিকরা। তারা জানিয়েছেন, তাদের সন্তান কয়েক মাস আগে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা খরচ করে ‘দালাল চক্রে’র মাধ্যমে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে দেশ ছেড়েছিলেন।

যে দালালের মাধ্যমে তারা দেশ ছেড়েছিলেন; তিনিও নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি পরিবারের। তবে ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের দাবি, নিখোঁজের সংখ্যা আরও বেশি হবে।
নিহত নবী সম্পর্কে ভাই মাহ আলম সাংবাদিকদের বলেন, তার ভাই আব্দুল নবী পাঁচ বছর সৌদি আরবে ছিলেন। সেখান থেকে দেশে ফিরে চার মাস আগে দালাল চক্রের মাধ্যমে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন তিনি। লিবিয়ায় পৌঁছার পরও ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানান মাহ আলম।
“তখন আব্দুল নবী জানিয়েছিলেন, লিবিয়ার গেমঘর নামক স্থান থেকে ১২-১৩ বাংলাদেশিসহ অন্যদের সঙ্গে ইতালির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন তারা। ভূমধ্যসাগরে ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার অতিক্রম করার পর তাদের বহনকারী নৌকা বা বোটের তলা ফেটে যায়। এতে ভয় পেয়ে তারা আবার লিবিয়ায় ফিরে আসেন।
এই ঘটনা দেশে জানালে দালালের অভিভাবকদের সঙ্গে গ্রাম্যসালিসে বসে নবী হোসেনসহ অন্যদের পরিবারের সদস্যরা। সেখানে টাকাসহ পাসপোর্ট ফেরত চাওয়া হয়। তখন দালালের অভিভাবকরা আশ্বস্ত করেন যে, তাদের আবার ইতালি পাঠানো হবে।
সবশেষ এক মাস আগে লিবিয়া থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করেন আব্দুল নবী। এ সময় তাকেসহ অন্যান্যদের আবারও গেমঘরে নেওয়া হবে জানান তিনি।
এরপর থেকে আর নবীসহ সঙ্গের অন্য কেউ বাংলাদেশে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।
মাহ আলম বলেন, বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে লিবিয়া প্রবাসী এক বাংলাদেশি ফোন করে নবীর মরদেহ উদ্ধারের কথা জানান।
ওই প্রবাসীর ভাষ্যমতে, ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির পর মরদেহ উদ্ধার করে হিমঘরে রাখার পর লিবিয়া পুলিশ পাসপোর্ট দেখে নবীর মরদেহ শনাক্ত করে এবং তা দেশে জানাতে তাকে অনুরোধ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি বাংলাদেশে নবীর পরিবারে খবর দেন।
তবে কবে ওই নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে বা কবে মরদেহ পাওয়া গেছে সে সম্পর্কে কোনো তথ্য ওই প্রবাসী দেননি বলে জানান নবীর ভাই।
জীবিত না মৃত জানে না সৈকত-রহমতের পরিবার
এক মাস ধরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বেলাব উপজেলার চর লক্ষ্মীপুর গ্রামের বিল্লার মিয়ার ছেলে সৈকত এবং রহমত উল্লাহ।
সৈকতের বাবা বিল্লাল মিয়া ও রহমতের মা খালেদা বেগম সাংবাদিকদের জানান, ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে স্থানীয় দালাল টান লক্ষ্মীপুর এলাকার আলম মিয়ার মাধ্যমে তাদের ছেলেসহ আরও ১২-১৩ জন ইতালি উদ্দেশে বাড়ি ছাড়েন। লিবিয়া যাওয়ার পর তাদের সঙ্গে পরিবারের যোগযোগ হয়।

লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার জন্য কয়েকবার চেষ্টাও করেন তারা। কিন্তু নানা কারণে যেতে পারেননি। তখন দালাল আলম মিয়ার পরিবারের কাছে চাপ দিয়ে টাকা ফেরত চাওয়া হয়। কিন্তু তারা টাকা ফেরত না দিয়ে ইতালি পাঠানোর বিষয়ে আবারও আশ্বস্ত করে।
পরিবারের ধারণা, হয়তো আব্দুল নবীর সঙ্গে একই যাত্রায় ছিলেন সৈকত ও রহমত। এক মাস ধরে তাদের কোনো খবর না পেয়ে তারা মৃত না জীবিত তা নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়েছে পরিবারে। পরিবারগুলোয় এখন কেবল আহাজারি চলছে।
দালালের দুয়ারে নিখোঁজদের স্বজনরা
দালাল আলম মিয়া টান লক্ষ্মীপুর এলাকার মনা মিয়ার ছেলে। তার বাড়িতে প্রতিদিন আসছেন নিখোঁজদের স্বজনরা।
তবে আলমের মা রেহেনা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, “এক মাস ধরে আলমের সঙ্গেও পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই। আলম মিয়াও নিখোঁজদের সঙ্গে হয়ত একই নৌকায় ছিলেন।”
ফলে তার পরিবারেও চলছে আহাজারি।
তবে এসব বিষয়ে কোনো তথ্য নেই পুলিশের কাছে।
নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) অনির্বাণ চৌধুরী বলেন, “অভিবাসন প্রত্যাশী নিহত ও নিখোঁজ হওয়ার খবরটি আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছি, সরকারিভাবে কোনো তথ্য নেই।
“এমনকি কোনো পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কেউ অভিযোগও করেনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।”
জেলা প্রশাসক আবু নইম মোহাম্মদ মারুফ খানও বলেন, “লিবিয়া হয়ে ইতালী যাওয়া পথে নিহত বা নিখোঁজের কোনো তথ্য জানা নেই। এ বিষয়ে কেউ কোনো অভিযোগ জানায়নি বা সরকারি কোনো দপ্তর থেকেও এ ধরনের কোনো তথ্যও আসেনি।”