১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ভাত নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন মা, এল মেয়ের লাশ

সোমবার সকালে পাশের একটি বাড়ির দরজার সামনে মেলে ১৩ বছর বয়সী ওই শিশুর মরদেহ।

বিডিনিউজ২৪

সৌরভ হোসেন সিয়াম. নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 23 Dec 2025, 12:00 AM

Updated : 26 Aug 2026, 05:22 PM

তখনও দুপুরের ভাত চুলায়। রান্না শেষ না হওয়ায় মা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলে প্ল্যাস্টিকের বস্তা দিয়ে পাঠিয়েছিলেন প্রতিবেশীর বাসায়। তারপর গরম ভাত নিয়ে অপেক্ষায় থাকা মা আর পাননি শিশু কন্যার খোঁজ। সোমবার সকালে পাশের একটি বাড়ির দরজার সামনে মেলে ১৩ বছর বয়সী ওই শিশুর মরদেহ।

কন্যার শোকে পাগলপ্রায় মা কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, “আমার নাবালক শিশু। মাইয়াটায় দুপুরে খায় নাই। তারে মাইরা ফেলছে। আমি মাইনষের বাইত থাল-বাসুন ধুইয়া মাইয়ারে পালছি। আমার সেই নাবালক শিশুটারে যে মারছে হের ফাঁসি চাই আমি।”

কথা শেষ করার আগেই মুর্ছা যান তিনি।

পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া শিশুটি রোববার বিকাল আনুমানিক ৪টার দিকে বাড়ির সামনে থেকে নিখোঁজ হয়। সোমবার সকালে তার মরদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। পাশেই পড়া ছিল প্ল্যাস্টিকের বস্তাটিও।

শিশুটি পরিবারের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বন্দর অঞ্চলের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের দড়ি সোনাকান্দা এলাকার বসবাস করত। তার মা গৃহকর্মী এবং বাবা রিকশা চালক। তাদের মূল বাড়ি  মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলায়। তারা অন্তত ১০ বছর ধরে দড়ি সোনাকান্দা এলাকায় ভাড়াবাসায় থাকে। এ দম্পতির আট বছর বয়সী আরেকটি কন্যা সন্তান রয়েছে।

শিশুটির বাবা বলছিলেন, বিকালে গাড়ি গ্যারেজে দিয়ে বাসায় ফেরার পর মেয়ে নিখোঁজ বলে জানতে পারেন। রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করেও সন্তানের সন্ধান পাননি।

স্থানীয় দুটি মসজিদে মাইকিংও করা হয় বলে জানান তিনি।

বন্দর থানার ওসি গোলাম মুক্তার আশরাফ বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে পুলিশ সকালে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়।

“শিশুটির পরিবার যে ভাড়াবাড়িতে থাকে তার পেছনে আরেকটি বাসার দরজার সামনে শিশুটির মরদেহটি পাওয়া যায়। প্রাথমিকভাবে শিশুটির মুখমণ্ডলের আঘাত ও অন্যান্য আলামত দেখে সে মৃত্যুর আগে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে ধারণা করছি।”

এদিকে, শিশুটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর বিকালে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, “শিশুটির গালে ও গলায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এগুলো মানুষের নখের মত বলে ধারণা করছি। এ ছাড়া, শিশুটি ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল কিনা তা জানতে আলামতও সংগ্রহ করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত বলা যাবে।”

সরজমিনে দড়ি সোনাকান্দা এলাকায় গেলে সেখানে প্রতিবেশীরাও শিশুটির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন, তারা শোকাহত বলে জানান। তারা এ হত্যার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক বিচারও দাবি করেন।

যে দরজার সামনে শিশুটির মরদেহ পাওয়া যায় সেই বাড়ির মালিক ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সময়ও মরদেহটি দেখতে পাননি। নামাজ শেষে ফেরার পর তার ঘরের সামনে শিশুটির মরদেহ দেখতে পান।

ওই বাড়ির একজন সদস্য বলছিলেন, “আমার ভাই তখন ডাক-চিৎকার দিলে আমরা বেরিয়ে আসি। তখন শিশুটির পরিবারের লোকজনকেও খবর দেওয়া হয়। এবং তারা এসে লাশ শনাক্ত করেন।”

এ ঘটনার পর বাড়ির মালিককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। 

দুপুরে স্থানীয় অন্তত ১০ জন ব্যক্তির সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এলাকায় মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের অবাধ বিচরণ রয়েছে। তাদের ভাষ্য, মাদকসেবীরা এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর শিউলী নওশাদ বলেন, “এখানে মাদকের ছড়াছড়ি। স্থানীয় পঞ্চায়েতকে নিয়ে এ ব্যাপারে একাধিকবার আমরা বসেছি। কিন্তু আমাদের কেউ মানে না। উল্টো ভয়ভীতি দেখায়। আমরা সন্দেহ করতেছি, মাদকসেবী কেউ এই ঘটনা ঘটিয়েছে। কন্যাশিশুর সঙ্গে এই রকম নির্মম কাজ স্বাভাবিক মানুষ করতে পারে না।”

কিন্তু এলাকাটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত না থাকায় ঘাতকদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।

শিশুটিকে প্রাইভেট পড়াতেন সুলতানা রাজিয়া। তিনি বলছিলেন, চলতি মাসে পঞ্চম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা দিয়েছিল শিশুটি। ৩০ ডিসেম্বর ফলাফল প্রকাশের কথা। ভালো ফলাফলের অপেক্ষায় ছিল শিশুটি। তার এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কাম্য হতে পারে না।

এ ঘটনায় হত্যা মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানান বন্দরের ওসি গোলাম মুক্তার আশরাফ।

আরও পড়ুন:

নারায়ণগঞ্জে বাড়ির পেছনে মিলল নিখোঁজ শিশুর লাশ