১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নওগাঁয় আনন্দ মিছিলে থাকা মা জেনেছিলেন ঢাকায় ছেলে শহীদ হয়েছে

ঢাকায় মিরপুর-২ এর থানার সামনে পুলিশের গুলিতে হতাহত ছাত্র-জনতাকে উদ্ধার করতে গিয়ে শহীদ হন নওগাঁর মাহফুজ আলম শ্রাবণ।

নওগাঁয় আনন্দ মিছিলে থাকা মা জেনেছিলেন ঢাকায় ছেলে শহীদ হয়েছে
ছেলে মাহফুজ আলম শ্রাবণের ছবি হাতে বেবি নাজনিন।

সাদেকুল ইসলাম

নওগাঁ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 05 Aug 2025, 11:42 AM

Updated : 26 Aug 2026, 01:31 PM

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর আর সবার মত আনন্দে মিছিলে সামিল হয়েছিলেন নওগাঁর বেবি নাজনিন। কিন্তু সে সময়ই ছেলেকে হারানোর চরম বিষাদপূর্ণ খবর পান তিনি। 

বেবি নাজনিনের ছেলে মাহফুজ আলম শ্রাবণ (২১) সেদিন ছিলেন ঢাকার মিরপুরে। সেখানে মিরপুর-২ এর থানার সামনে পুলিশের গুলিতে হতাহত ছাত্র-জনতাকে উদ্ধার করতে গিয়ে নিজেই শহীদ হন শ্রাবণ।

সেদিনের স্মৃতিচারণ করে শ্রাবণের মা বেবি নাজনিন বলেন, “গত পাঁচ তারিখ টিভিতে খবর  দেখার সময় জানতে পারি  স্বৈরাচার হাসিনা দেশ থেকে পালিয়েছে। এই খবর শুনে আমি আনন্দ মিছিলে যাই। 

“আনন্দ মিছিল করার সময়ই জানতে পারি শেখ হাসিনার বিদায়ের সাথে সাথে আমার ছেলেরও চিরবিদায় হয়েছে। সে খবরে রাস্তাতেই কান্নায় ভেঙে পড়ি।” 

এক বছর আগের কথা মনে পড়তেই আবারও ছেলে হারানোর বেদনায় অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন এই মা। 

শহীদ শ্রাবণের বাড়ি নওগাঁ শহরতলীর বোয়ালিয়া ইউনিয়নের দোগাছী গ্রামে। গ্রামের মোশারফ হোসেন-বেবি নাজনিন দম্পতির তিন ছেলের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। 

তার বাবা মোশারফ হোসেন একজন মটর মেকানিক। সে সুবাদে শ্রাবণ বাবার সঙ্গে নওগাঁর মহাদেবপুরে থাকতেন। 

মহাদেবপুর সর্বমঙ্গলা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২১ সালে এসএসসি এবং ২০২৪ সালে মহাদেবপুরের রাইগাঁ ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ভালো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার জন্য ঢাকায় যান শ্রাবণ। 

তবে পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় ঢাকায় পড়াশুনার পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পার্টটাইম চাকরি করতেন তিনি।থাকতেন মিরপুর ১ সেকশন ৬ রোডের মিল্কভিটা এলাকায় মেসে।

এরই মধ্যে তিনি জড়িয়ে পড়েন জুলাই আন্দোলনে। নিয়মিত তিনি মিরপুর-১০ নম্বরে অন্যদের সঙ্গে বিক্ষোভ-আন্দোলন যোগ দিতেন। 

শ্রাবণের পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার দিন ৫ অগাস্টও শ্রাবণ প্রথমে মিরপুর ১০ নম্বরে ছিলেন। এর মধ্যেই খবর আসে মিরপুর ২ নম্বরে মডেল থানার বিল্ডিংয়ের ওপর থেকে পুলিশের গুলিতে অনেকে হতাহত হয়েছেন।

তাদের উদ্ধারে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার সঙ্গে সেখানে যান শ্রাবণও। কিন্তু বিকাল পৌনে ৩টায় তিনি নিজেই গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।  

এর মধ্যেই পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। সে খবর দেখে আনন্দে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন তার মা। কিন্তু ছেলে হারানো খবরে তার যে কান্না শুরু হয়েছিল তা আজও থামেনি। 

শহীদ শ্রাবণের মা বেবি নাজনীন বলেন, “আমার ছেলের স্বপ্ন ছিল ভালো ক্রিকেটার হবার। না হলে চাকরি করে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার, বাবা-মাকে হজ্জ্ব করানোর। কিন্ত সে স্বপ্ন এখন স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেল।”

তবে জুলাই আন্দোলনে ছেলের আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরে শ্রাবণসহ দেশের সকল শহীদকে শহীদের মযার্দা ও তাদের হত্যার ন্যায্য বিচার-শাস্তি দাবি করলেন তিনি। 

শ্রাবণের ভাই শফিকুর রহমান বাপ্পী বলেন, “শ্রাবণ হত্যার ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে একটি মামলাসহ পরিবারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাসহ ৪০০ জনকে আসামি করে সিএমএসএস আদালতে আরেকটি মামলা করা হয়েছে।”

এদিকে শহীদ শ্রাবণের স্মরণে নওগাঁ-রাজশাহী সড়কের নওহাটার মোড়ে গোল চত্তরকে ‘শহীদ মাহফুজ চত্তর’ হিসাবে নামকরণ করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নওগাঁর ছাত্র নেতা ফজলে রাব্বী বলেন, শহীদ পরিবারের পুর্নবাসন ও খুনিদের বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। 

শহীদ পরিবারের পুর্নবাসন দাবি করলেন এনসিপি নওগাঁর সদস্য মাহবুব আলম সোহাগও। পাশাপাশি তিনি শহরতলীর ইয়াদালির মোড়ে শহীদ শ্রাবণ চত্তর করার দাবিও জানিয়েছেন। 

ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানে নওগাঁর শ্রাবণসহ ৯ জন শহীদ ও অনেকে আহত হয়েছেন।

তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বনবিভাগ, বিএনপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে শহরের মুক্তির মোড়সহ বিভিন্ন স্থানে ৯টি করে বৃক্ষরোপন করা হয়েছে। 

শহীদ পরিবার ও আহতদের পুর্নবাসনে সহায়তা অব্যহত থাকার কথা জানিয়ে জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ আব্দুল আউয়াল বলেন, এরমধ্যে শহীদ পরিবারের হাতে জুলাই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ৫লাখ টাকা ও ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র তুলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আহতদের স্বাস্থ্য কার্ড দেওয়াসহ অন্যান্য সহায়তা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।