১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

‘আর কতদিন এখানে থাকব’, বাড়ি ফিরতে উন্মুখ রোহিঙ্গাদের প্রশ্ন

মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা সমাবেশে এমন আক্ষেপ করেছেন।

‘আর কতদিন এখানে থাকব’, বাড়ি ফিরতে উন্মুখ রোহিঙ্গাদের প্রশ্ন
কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের মাঠে সমাবেশে নিজ দেশে ফেরার দাবি জানান রোহিঙ্গারা।

কক্সবাজার প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 25 Aug 2026, 05:01 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:00 PM

সকাল থেকেই আকাশ মেঘে ঢাকা। শরৎকালের আকাশে বৃষ্টির সম্ভাবনা। কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের এক মাঠে তখন হাজারো মানুষের সমাগম। 

কারও হাতে প্ল্যাকার্ড, কারও চোখে অশ্রু। কেউ আবার মোনাজাতে দুই হাত তুলে ফিরে যেতে চাইছেন ফেলে আসা জন্মভূমিতে।

৫৫ বছর বয়সি সালেহ আহম্মদও কাঁদছিলেন মোনাজাতে। নয় বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া এই রোহিঙ্গা এখনো ভুলতে পারেননি নিজের ঘর, গ্রাম আর মা-বাবার কবরের কথা।

“আর কতদিন এখানে থাকব? আমি নিজের দেশে ফিরতে চাই”, মোনাজাতের ফাঁকে কথাগুলো বলছিলেন তিনি।

২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের পর বাংলাদেশে নতুন করে রোহিঙ্গা ঢল নামে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ওই সময়ের ঘটনাকে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও জাতিগত নিধনের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করে। 

এরপর একে একে কেটে গেছে নয় বছর। কিন্তু কক্সবাজারের ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশের কাছে সেই দিনটি এখনো ফিরে আসে ঘর হারানোর স্মৃতি আর স্বজন হারানোর বেদনা হয়ে।

ঘরে ফেরার দাবিতে সমাবেশ

নবম ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা স্মরণ দিবসে’ মঙ্গলবার সকালে উখিয়ার ক্যাম্প-৪ এক্সটেনশনের ফুটবল মাঠে ‘Nine Years Gone, Ten Minutes for Rohingya’ শিরোনামে সমাবেশ করে নাগরিক সংগঠন ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা-ইউসিআর।

উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে নানা বয়সি বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা এতে অংশ নেন।

সমাবেশে ২০১৭ সালের সহিংসতায় নিহতদের স্মরণ, রোহিঙ্গাদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির দাবি এবং মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানানো হয়।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, নয় বছর পেরিয়ে গেলেও স্বজন হারানোর বেদনা, ঘরবাড়ি হারানোর কষ্ট এবং নিজ দেশে ফিরতে না পারার হতাশা রোহিঙ্গাদের জীবন থেকে মুছে যায়নি।

রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী মোহাম্মদ রফিক বলেন, “আমরা বিশ্বের কাছে দশ মিনিট চাই। নয়টা বছর পার করেছি। এ দেশ আমাদের নয়, আমরা আমাদের দেশে ফিরতে চাই। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”

তার ভাষায়, “আরকান আমাদের, আমরা আরকানের। এর চেয়ে বড় কোনো সত্য নেই। মানবিক বিশ্বকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।”

শুধু ফেরত পাঠানো নয়, অধিকারও চান রোহিঙ্গারা

সমাবেশে ইউসিআরের প্রেসিডেন্সিয়াল প্যানেলের সদস্য মোহাম্মদ সৈয়দ উল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ বছরের পর বছর রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় তারা কৃতজ্ঞ। তবে প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ, এমনটাই তাদের দাবি।

“শুধু সীমান্ত পার করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো নয়, প্রত্যাবাসনের পর নিরাপত্তা, অধিকার, নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা ও জীবিকার নিশ্চয়তাও দিতে হবে,” বলেন তিনি।

সমাবেশে বার্মিজ ভাষায় বক্তব্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান ইউসিআর নেতা মাস্টার শোয়েব।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে এমনভাবে কাজ করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গারা ভয় ও অনিশ্চয়তা ছাড়াই নিজেদের দেশে ফিরতে পারেন।

‘শেষ কথা একটাই, আরকানে ফিরতে চাই’

সমাবেশের এক পর্যায়ে টানা দশ মিনিট ধরে রোহিঙ্গারা নিজেদের ভাষায় স্লোগান দেন।

“শেষ হত এক্কান, ফিরত চাই আরকান”, অর্থাৎ ‘আমাদের শেষ কথা একটাই, আরকানে ফিরতে চাই’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে ক্যাম্পের মাঠ।

নয় বছর আগে যে দেশ থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে এসেছিলেন, সেখানে ফেরার আকাঙ্ক্ষাই যেন ওই দশ মিনিটের স্লোগানে বারবার ফিরে আসে।

রোহিঙ্গাদের জন্য ২৫ অগাস্ট তাই কেবল একটি স্মরণ দিবস নয়; এটি একইসঙ্গে স্বজন হারানো, ফেলে আসা ঘর এবং ফিরে যাওয়ার অপেক্ষার দিন।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয় জানিয়েছে, প্রতি বছরের মত এবারও ক্যাম্পে স্মরণ দিবসের সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা এপিবিএন সদস্যরা তৎপর রয়েছেন।

আর ক্যাম্পের মাঠে সমাবেশ শেষে যখন মানুষজন ফিরছিলেন, তখনও অনেকের মুখে ছিল একই কথা, ফিরতে চাই নিজের দেশে, ফিরে যেতে চাই আরকানে।