রাজশাহীর ইফতারের ঐতিহ্য ‘শাহি ফিরনি’ ও ‘বাটার মোড়ের জিলাপি’
১৯৫০ সাল থেকে বিক্রি শুরু হওয়া এ খাবারগুলির মূল কারিগররা না থাকলেও তাদের উত্তরসূরিরা ধরে রেখেছেন ঐতিহ্যকে।
সাত দশকের বেশি সময় রাজশাহীর ইফতার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে শাহি ফিরনি ও বাটার মোড়ের জিলাপি। আধুনিক ইফতারসামগ্রীর ভিড়ে এখনও নিজস্ব বৈশিষ্ট ও স্বাদে রোজাদারদের পছন্দের তালিকায় অবস্থান ধরে রেখেছে খাবারগুলো।
১৯৫০ সাল থেকে রাজশাহী নগরীতে বিক্রি শুরু হওয়া এ খাবারগুলির মূল কারিগররা এখন আর জীবিত না থাকলেও তাদের উত্তরসূরিরা ধরে রেখেছেন ঐতিহ্যকে।
এর মধ্যে গণকপাড়া মোড়ের রহমানিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্তোরাঁয় শাহি ফিরনি তৈরি ও বিক্রি শুরু করেছিলেন আনিছুর রহমান খান। আর এখন ব্যবসার হাল ধরেছেন তার নাতি রিয়াজ আহাম্মেদ খান।
রহমানিয়া হোটেলের বর্তমান মালিক রিয়াজ বলেন, দাদার পর তার বাবা ব্যবসার হাল ধরেন, এখন তিনিই সেই ঐতিহ্য বহন করছেন।
রিয়াজ বলেন, “শুরুতে এক বাটি ফিরনি চার আনায় বিক্রি হতো, এখন তা ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়। ফিরনির প্রধান উপাদান হলো খাঁটি গরুর দুধ, সঙ্গে থাকে চালের গুঁড়া, চিনি ও কিছু ফল।”
ছোট ছোট মাটির পাত্রে সাজিয়ে রাখা ফিরনি দেখিয়ে তিনি বলেন, “রমজানের প্রথম দিন থেকেই ৪০০ বাটি ফিরনি তৈরি ও বিক্রি করা হচ্ছে, যা আরও বাড়বে। গত বছর প্রতিদিন এক হাজার বাটি পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল।”
শাহী ফিরনি কিনতে আসা নগরীর কাদিরগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা আলী হাসান বলেন, “ইফতারের জন্য আরও অনেক কিছু কেনা হলেও ফিরনি আমাদের মতো বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়। এ জন্য এখনও ইফতারিতে রাখার চেষ্টা করি রহমানিয়ার শাহি ফিরনি।”
অন্যদিকে নগরের বাটার মোড়ে অবস্থিত জিলাপি দোকানটির নেই কোনো নাম বা সাইনবোর্ড, তবে এখানে যে মচমচে জিলাপি বিক্রি হয়, তা ‘বাটার মোড়ের জিলাপি’ নামেই পরিচিত।
সারা বছরই এখানে জিলাপি বিক্রি হলেও রমজানে এর চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। প্রতিদিনই ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়।
এখন প্রতি কেজি জিলাপি বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়।
রাজারহাতা এলাকার বাসিন্দা ফজলুর রহমান বলেন, “বাপ-দাদারাও ইফতারিতে বাটার মোড়ের জিলাপি রাখতো। আমরাও সেই ধারাবাহিকতা রেখেছি। এখানকার জিলাপির স্বাদই আলাদা। তাই ইফতারিতে এই জিলাপি থাকা চাই।”
৪২ বছর ধরে এ দোকানে জিলাপি তৈরি করা কারিগর মো. সাফাত বলেন, “সঠিক উপকরণ ও পরিমাণ মেনে তৈরি করলেই জিলাপি মচমচে ও সুস্বাদু হয়।”
তিনি বলেন, ১৯৫০ সালে সোয়েব উদ্দিন এখানে জিলাপি বানানো শুরু করেন। প্রথম কারিগর ছিলেন জামিলী সাহা, পরবর্তীতে তার ছেলে কালীপদ সাহা জিলাপী ভাজার হাতা ধরেন।
পরে ২০১৭ সালে তিনি মারা গেলে তার শিষ্য মো. সাফাত এখন জিলাপি বানানোর মূল কারিগর।
বর্তমানে দোকানটি চালাচ্ছেন সোয়েব উদ্দিনের চার ছেলে। তাদের একজন হাসিম উদ্দীন জানান, “সততা ও ভালো মানের উপকরণের কারণেই এত বছর ধরে আস্থার সঙ্গে টিকে আছে এই দোকান।”
