Published : 30 Aug 2026, 07:42 PM
সম্পর্কের টানাপোড়েন, উত্থান-পতন বা কিছু মানুষের বৈরি আচরণ সাধারণ বিষয়। তবে অনেকেই সমাজ বা লোকলজ্জার ভয়ে এমন কিছু বিষাক্ত বা ক্ষতিকর মানুষকে বছরের পর বছর সহ্য করে যান, যারা প্রতিনিয়ত জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই ধরনের বিরক্তিকর ও মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী ব্যক্তিদের ‘হ্যাসলার্স’ বা ‘ঝামেলাকারী’ বলা হয়।
সাধারণ মানুষ একে শুধুই পারিবারিক বা সামাজিক সাধারণ সমস্যা ভাবলেও, নিউরোসায়েন্সের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, বিষাক্ত সম্পর্ক মানুষের আয়ু কমিয়ে দেয় এবং শরীরকে বয়সের আগেই বুড়ো করে ফেলে।
জীবনযাপন ও স্বাস্থ্য-বিষয়ক পোর্টাল ‘সেলফ’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিয়ংকিউ লি বলেন, “ক্ষতিকর মানুষের তৈরি করা মানসিক চাপ আমাদের ডিএনএ এবং কোষের স্তরে স্থায়ী ক্ষত ও বার্ধক্যের ছাপ রেখে যায়।”
পিএনএএস সাময়িকীতে প্রকাশিত সমীক্ষা
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘পিএনএএস’-এ প্রকাশিত, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গবেষণায় ১৮ থেকে ১০৪ বছর বয়সি ২,৩৪৫ জন মানুষের ওপর নিবিড় পরীক্ষা চালানো হয়।
গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের লালা বা স্যালাইভা নমুনা সংগ্রহ করে তাদের ডিএনএ-র রাসায়নিক মার্কার এবং ‘বায়োলজিক্যাল এইজ’ বা জৈবিক বয়স পরিমাপ করেন।
তথ্য বিশ্লেষণ করে চিকিৎসকেরা ৩টি বড় মনস্তাত্ত্বিক কারণ সনাক্ত করেছেন।
জৈবিক বয়স ১.৫ শতাং দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া
ডা. বিয়ংকিউ লি বলেন, “জীবনে একজন ক্ষতিকর মানুষ বা ‘হ্যাসলার’ থাকার অর্থ হল, আপনার জৈবিক বার্ধক্যের গতি প্রায় ১.৫ শতাংশ দ্রুত হওয়া। ফলে কোষগুলো মানুষের আসল বা ক্যালেন্ডারের বয়সের চেয়ে প্রায় ৯ মাস বেশি বুড়ো ও জীর্ণ দেখায়।”
সমীক্ষায় দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের কোষ এই ক্ষতিকর সামাজিক সম্পর্কের কারণে ‘মলিকিউলার’ বা ক্ষুদ্র স্তরে বেশি দ্রুত বুড়িয়ে যায়।
কর্টিসল হরমোন ও অভ্যন্তরীণ প্রদাহ
যখন কেউ জীবনে অনবরত এমন কোনো মানুষের মুখোমুখি হন, যিনি সারাক্ষণ খুঁত ধরেন বা অসম্মান করেন, তখন মস্তিস্কের স্নায়ুতন্ত্র এটিকে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ হিসেবে গ্রহণ করে।
ফলে শরীরে অনবরত ‘স্ট্রেস’ হরমোন ‘কোর্টিসল’ নিঃসরণ হতে থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ বা ইনফ্লামেইশন, বিষণ্ণতা, ‘অ্যাংজাইটি’ এবং হৃদরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা সৃষ্টি করে আয়ু কমিয়ে দেয়।
বন্ধুদের ক্ষতিকর প্রভাব ও বৈবাহিক সম্পর্কের ভারসাম্য
গবেষণার চমকপ্রদ তথ্য হল, জীবনসঙ্গীর দেওয়া মানসিক চাপের চেয়ে পরিবার ও বন্ধুদের দেওয়া ঝামেলার ক্ষতিকর প্রভাব কোষের ওপর বেশি পড়ে।
ডা. লি এর কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন যে, “বৈবাহিক সম্পর্কে ঝগড়া বা নেতিবাচক বিষয় থাকলেও সেখানে প্রতিদিনের রুটিন, আদান-প্রদান ও মানসিক ঘনিষ্ঠতার এক ভারসাম্য থাকে, যা এই মেঘ কাটতে সাহায্য করে। তবে বন্ধুমহল বা পরিবারের ক্ষতিকর আচরণ থেকে সহজে পালানো যায় না। আর সেখানে ইতিবাচক ঘনিষ্ঠতার মেলবন্ধনও কম থাকে।”
ক্ষতিকর সম্পর্ক থেকে বাঁচার নিয়ম
মস্তিস্ক ও শরীরকে অকাল বার্ধক্যের হাত থেকে বাঁচাতে বিশেষজ্ঞরা ৩টি নির্দেশনা দেন।
প্রতিক্রিয়া পরিবর্তন ও রিফ্রেইমিং: যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির মনোবিদ ডা. অ্যারন পি. ব্রাইনেন বলেন, “আপনি চারপাশের মানুষকে পরিবর্তন করতে পারবেন না, তবে তাদের আচরণের প্রতি আপনার নিজস্ব প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারেন। কেউ সমালোচনা করলে সেটিকে নিজের গায়ে না মেখে মস্তিস্ক থেকে ‘টিউন আউট’ বা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা শিখতে হবে।
বাউন্ডারি বা সীমানা নির্ধারণের অদৃশ্য বর্ম: নিউ ইয়র্কের এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গন হেলথের মনোবিজ্ঞানী ডা. থিয়া গ্যালাঘের, নিজের চারপাশে একটি অদৃশ্য ‘সুরক্ষামূলক বুদবুদ’ বা বাউন্ডারি তৈরি করার পরামর্শ দেন।
ক্ষতিকর ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রাত্যহিক যোগাযোগ সীমিত করা এবং প্রয়োজনে সম্পূর্ণ শান্তভাবে সম্পর্ক ছিন্ন করা বা ‘কোয়াইট কুইটিং’ করা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
অভ্যন্তরীণ আর্দ্রতা ও গভীর শ্বাস: তীব্র উদ্বেগের মুহূর্তে মগজে অক্সিজেনের প্রবাহ ঠিক রাখতে এবং সারাদিনের হরমোনের ক্ষতিকর ধকল কাটাতে মেডিটেইশন বা গভীর শ্বাস প্রশ্বাসের ব্যাযাম করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
নিজের ভালোলাগাকে সবার আগে অগ্রাধিকার দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। যদি দেখা যায় বিষণ্ণতা বা ‘ক্রনিক অ্যাংজাইটি’ জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ কেড়ে নিচ্ছে, তবে লোকলজ্জার ভয় ভুলে অবিলম্বে একজন নিবন্ধিত মনোবিদের পেশাদার পরামর্শ নেওয়া উপকারী হবে।
আরও পড়ুন
অনিশ্চিত সম্পর্কে আছেন কি-না, বুঝবেন যেভাবে