Published : 31 Jul 2026, 01:20 AM
জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে বাংলাদেশ দূতাবাসের তিন দিনের বিশেষ কনস্যুলার ক্যাম্পে পাসপোর্টসহ অন্যান্য সেবা পেতে নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলেছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
গত ২৪ থেকে ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত এ ক্যাম্পে সেবা নিতে এসে ফি নির্ধারণের প্রক্রিয়া এবং পরিবেশ নিয়ে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সেবাগ্রহীতাদের দাবি, সরকারিভাবে নির্ধারিত ফির তুলনায় ফ্রাঙ্কফুর্ট ক্যাম্পে বেশি অর্থ আদায় করা হয়েছে। আবেদনকারীদের তথ্যমতে, ৪৮ পৃষ্ঠার ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্টের জন্য নির্ধারিত ফি ১২৫ মার্কিন ডলার হলেও ফ্রাঙ্কফুর্ট ক্যাম্পে আদায় করা হয়েছে ১৪১ দশমিক ৩০ ইউরো। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, এটি নির্ধারিত ফির চেয়ে প্রায় ৩৭ মার্কিন ডলার বেশি।
একইভাবে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ৫০ মার্কিন ডলার নির্ধারিত ফির বিপরীতে নেওয়া হয়েছে ৫৫ ইউরো, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রামান অনুযায়ী প্রায় ১২ দশমিক ৭ মার্কিন ডলার বেশি।
প্রবাসীদের অভিযোগ, দূতাবাস কর্তৃপক্ষ কনস্যুলার এক্সচেঞ্জ রেট (মুদ্রা বিনিময় হার) এবং ফি নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি জনসমক্ষে প্রকাশ না করায় এই অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। তাদের ব্যক্তিগত হিসাব অনুযায়ী, তিন দিনের এই ক্যাম্পে প্রায় ৫০০ সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে ১৬ হাজার ৭০ মার্কিন ডলার (প্রায় ১৯ লাখ টাকা) অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের বিষয়ে জানতে চাইলে দূতাবাসের কাউন্সেলর (পলিটিক্যাল) তানভীর কবির বলেন, “নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত অংশটি মূলত সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার বা সামাজিক কল্যাণমূলক তহবিল হিসেবে সংগ্রহ করা হচ্ছে।”
তবে এই তহবিলের অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় হয় এবং কেন সাধারণ প্রবাসীদের ওপর এই বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা নিয়ে আবেদনকারীদের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ রয়েছে।
সেবা নিতে আসা এম এ হাসান নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, “পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে উল্লিখিত ফির তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করা সাধারণ শিক্ষার্থী ও নিম্ন আয়ের প্রবাসীদের জন্য কষ্টকর।”
অন্যদিকে, ডরটমুন্ড থেকে আসা শিক্ষার্থী ওমর ফারুক শেখ জানান, তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে আসায় সেবা পেলেও ফি প্রদানের ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করেছেন। তিনি বলেন, “দূতাবাসের ওয়েবসাইটে ফি ইউরোতে দেওয়া থাকলেও সিস্টেমে ডলারে প্রদর্শিত হয়। এই মুদ্রার পার্থক্য ও বিনিময় হার নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।”
ফির বাইরে ক্যাম্পের পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এসেন থেকে আসা মেহেদি উদ্দিন অভিযোগ করেন, “গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে একটি অপ্রশস্ত স্থানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। পর্যাপ্ত জনবল ও শৃঙ্খলার অভাবে সাধারণ প্রবাসীদের ভোগান্তি বেড়েছে।”
প্রবাসীরা মনে করেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের কনস্যুলার ক্যাম্প আয়োজনের ক্ষেত্রে ফি নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনা, মুদ্রার বিনিময় হারের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান এবং ডিজিটাল সিরিয়াল ব্যবস্থাপনাসহ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তারা বিষয়টিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে এ সংবাদ প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাস ইমেইলে সরকারিভাবে নির্ধারিত ফি এর তুলনায় বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, এমন দাবি সঠিক নয় এবং ‘কল্পনাপ্রসূত’।
দূতাবাস বলছে, পাসপোর্ট আবেদনের জন্য পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অনলাইন পোর্টালে শুধু মার্কিন ডলারের নির্ধারিত ফি প্রদর্শিত হয়। কিন্তু দূতাবাসের ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কনস্যুলার সার্ভিস ফি এর সঙ্গে ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার ফান্ডের জন্য সারচার্জ যুক্ত করে ফি আদায় করতে হয়।
“যেহেতু বার্লিনে বাংলাদেশ দূতাবাসে মার্কিন ডলারে ফি পরিশোধের সুযোগ নাই- সেজন্য সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কনস্যুলার সার্ভিস ফি এবং ওয়েলফেয়ার ফান্ডের সারচার্জ একসাথে যুক্ত করে স্থানীয় মুদ্রা ইউরোতে ফি নির্ধারণ করে দূতাবাসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তা গ্রহণ করা হয়। নগদ অর্থ লেনদেনেরও কোনো সুযোগ নেই।"
শুধু বার্লিন নয়, সব বাংলাদেশ দূতাবাস ও কন্স্যুলেট এই সরকারি নির্দেশনা একইভাবে অনুসরণ করে থাকে বলে ইমেইলে বলা হয়।
পাসপোর্ট আবেদনের অনলাইন পোর্টালে মার্কিন ডলারে প্রদর্শিত ফি এর সঙ্গে দূতাবাসের ফি এর পার্থক্য থাকায় আবেদনকারীরা যেন বিভ্রান্ত না হন, সেজন্য সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ওয়েবসাইটে আগে থেকেই প্রকাশিত থাকার কথা বলছে বার্লিন দূতাবাস।
“ফ্রাঙ্কফুর্টে কনস্যুলার সার্ভিস সংক্তান্ত নোটিসে বিস্তারিত তথ্যের ওয়েবলিংক উল্লেখ করা হয়েছে।"
[বার্লিন দূতাবাসের বক্তব্যের পর প্রতিবেদনটি আপডেট করা হয়েছে। ]