৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

সিঙ্গাপুরে ২৪০ শ্রমিকের বেতন বকেয়া, ওয়ার্ক পারমিট বাতিল, অধিকাংশই বাংলাদেশি

দেশটির দুই প্রতিষ্ঠানের এসব শ্রমিক বলেছেন, গত অগাস্ট থেকে তাদের বেতন দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

সিঙ্গাপুরে ২৪০ শ্রমিকের বেতন বকেয়া, ওয়ার্ক পারমিট বাতিল, অধিকাংশই বাংলাদেশি

সিঙ্গাপুরের মাইগ্র্যান্ট ওয়ার্কার্স সেন্টার রিক্রিয়েশন ক্লাবে গত ২৩ অক্টোবর প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনস নামে কোম্পানির অভিবাসী শ্রমিকরা বকেয়া বেতন নিয়ে প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের সঙ্গে বৈঠক করেন। ছবি: দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 30 Oct 2026, 12:15 AM

Updated : 30 Oct 2026, 12:15 AM

সিঙ্গাপুরের প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের দুটি প্রতিষ্ঠানে তিন মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না অন্তত ২৪০ অভিবাসী শ্রমিক। একইসঙ্গে আকস্মিকভাবে তাদের ওয়ার্ক পারমিটও বাতিল করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটি।

সিঙ্গাপুরের সংবাদমাধ্যম দ্য স্ট্রেইটস টাইমসে বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, বেতন না পাওয়া এসব শ্রমিকের অধিকাংশই বাংলাদেশি। খবরে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিকের বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে।

খবরে বলা হয়, সিঙ্গাপুরের মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় (এমওএম) গত ২৪ অক্টোবর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা বর্তমানে ‘প্রসেস মেইনটেনেন্স সলিউশনস’ ও ‘জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’ নামে ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে। এ দুটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অধিকাংশ বাংলাদেশি শ্রমিকদের ‘ট্রাইপার্টাইট অ্যালায়েন্স ফর ডিসপুট ম্যানেজমেন্ট (টিএডিএম) এ দায়ের করা বকেয়া বেতনের দাবির বিষয়ে সার্বিক সহায়তা দিচ্ছে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স সেন্টার (এমডব্লিউসি)।

এর মধ্যে ‘প্রসেস মেইনটেনেন্স সলিউশনস’ প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১৫ শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলেছে দ্য স্ট্রেইটস টাইমস। তাদের মধ্যে ৫ জন বলেছেন, তারা অক্টোবর মাসে বকেয়া বেতন পেয়েছেন। তবে জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের ৪ জন শ্রমিক ২৪ অক্টোবর বলেছেন, তারা এখনও বকেয়া বেতন পাননি।

স্ট্রেইটস টাইমসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই দুটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মধ্যে গভীর ‘যোগসাজশ’ রয়েছে এবং তাদের কর্মীদের শিল্প পরিকল্পনা অঞ্চল তুয়াসের একই ডরমিটরিতে রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠান দুটির বর্তমান পরিচালকরা এমন এক ব্যক্তির কাছ থেকে মালিকানা গ্রহণ করেছেন, যিনি গত জুলাই মাসে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত অপরাধ ও একটি অপরাধী চক্রে জড়িত থাকার সন্দেহে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

Image

সিঙ্গাপুরের শিল্প পরিকল্পনা অঞ্চল তুয়াসে নিজেদের ডরমিটরির বাইরে ‘প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনস’ ও ‘জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’ নামে দুটি কোম্পানির বাংলাদেশি শ্রমিকরা। ছবি: দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।

বকেয়া বেতন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা

উভয় প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরাই বলেছেন, গত অগাস্ট থেকে তাদের বেতন দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে দলে দলে তাদের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করা শুরু হয়। এই পরিস্থিতির ফলে সিঙ্গাপুরে নিজেদের ভবিষ্যৎ এবং দেশে থাকা পরিবারের জীবনযাত্রা নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

স্ট্রেইটস টাইমস বলছে, তারা যেসব শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের প্রত্যেকেই অন্তত দুই বছর ধরে সিঙ্গাপুরে আছেন।

খবরে প্রসেস মেইনটেনেন্স সলিউশনের শ্রমিক হোসাইন মিদুলের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। মিদুল বলছেন, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সিঙ্গাপুরে আসার পর থেকে ওভারটাইমসহ তার ৬০০ মার্কিন ডলার বেতনের প্রায় পুরোটাই তিনি দেশে পাবনায় পাঠাতেন।

কিন্তু বেতন না পাওয়ায় গত দুই মাস তিনি পরিবারকে এক টাকাও পাঠাতে পারেননি। এর মধ্যেই অক্টোবরের শুরুতে নিয়োগকর্তা কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তার ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে দিয়েছেন। অথচ তার ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত থাকার কথা ছিল।

মিদুল বলেন, সিঙ্গাপুরে আসার জন্য ৯ হাজার ডলার ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। ফলে তার বেতনের প্রায় অর্ধেক চলে যেত এজেন্ট ফি বাবদ সেই ব্যাংক ঋণ পরিশোধে। আর বেতনের বাকি অর্ধেক দিয়ে পাবনায় থাকা তার ছয় সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ চলত।

“আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই করুণ। তাই তাদের সাহায্যের জন্যই আমি দেশ ছেড়েছিলাম। কিন্তু এখন আমার কাজও নেই, বেতনও নেই। তাদের যে কতটা কষ্ট করতে হবে তা ভেবে আমি আতঙ্কিত।”

প্রসেস মেইনটেনেন্স সলিউশনসের কাছে এখনো ১৮শ’ ডলার বকেয়া পাওনা আছে জানিয়ে মিদুল বলেন, “সিঙ্গাপুরে আসার জন্য আমাদের অনেকের পরিবার জমি ও গরু বিক্রি করেছে। আবার অনেকেই চড়া সুদে ঋণ নিয়েছে। কিছু মানুষ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও টাকা ধার করেছে।”

জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের শ্রমিক সাইমন ইসলাম বলেন, তারও অন্তত ১৮০০ ডলার বেতন বকেয়া। শেষ পর্যন্ত এই অর্থের কেবল একটি অংশই পাবেন বলে মনকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।

স্ট্রেইটস টাইমস বলছে, পৃথকভাবে একাধিক শ্রমিক তাদের বলেছেন সিঙ্গাপুরের প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে চাকরি পেতে তারা বাংলাদেশে থাকা এজেন্টদের ১২ হাজার ডলারেরও বেশি (প্রায় ১৫ লক্ষাধিক টাকা) দিয়েছিলেন। তাদের বলা হয়েছিল, এক বছর কাজ করার পর নিয়োগকর্তা নিজ খরচে তাদের সিঙ্গাপুরের নির্মাণ সনদ পাওয়ার একটি কোর্সে ভর্তি করাবেন।

কিন্তু ১৫ জনের মধ্যে মাত্র একজন শ্রমিক স্ট্রেইটস টাইমসকে নিশ্চিত করেছেন, তাকে বিল্ডিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন অথরিটি (বিসিএ)-এর কোর্সে পাঠানো হয়েছিল।

গত আগস্টে সিঙ্গাপুরের ‘ট্রানজিয়েন্ট ওয়ার্কার্স কাউন্ট টু' বা টিডব্লিউসি২ প্রকাশিত এক জরিপ অনুযায়ী, দেশটির নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা ভাতাসহ (ওভারটাইম ছাড়া) গড়ে মাসে ৮৬৮ ডলার আয় করেন। অন্যদিকে প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের শ্রমিকরা গড়ে প্রায় ৭৭১ ডলার পেয়ে থাকেন।

কোনো নিয়োগকর্তা সময়মত বেতন দিতে না পারলে মালয়েশীয় না এমন ওয়ার্ক পারমিটধারীদের জন্য বাধ্যতামূলক কেনা ৫ হাজার ‘সিকিউরিটি বন্ড’ বাজেয়াপ্ত হতে পারে।

খবরে বলা হয়, গত ২৩ অক্টোবর প্রসেস মেইনটেনেন্স সলিউশনসের প্রায় ৭০ জন শ্রমিক সুন লি রোডের এমডব্লিউসি রিক্রিয়েশন ক্লাবে কোম্পানির বর্তমান ডিরেক্টর রুজাইদি মাসুনিক এবং এমওএমের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে রুজাইদিকে সেসব শ্রমিকদের কাজের দিন ও ওভারটাইম ঘণ্টার নথি হস্তান্তর করতে দেখা যায়।

২৩ অক্টোবরের বৈঠকের এক সপ্তাহ আগে বকেয়া বেতন পাওয়া রাজীব হোসেন বলেন, “কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বলেছে, প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে নতুন নিয়োগকর্তা খুঁজে নেওয়ার সুবিধার্থে তাদের ছাড়পত্র বা অনুমোদনপত্র দেওয়া হবে। তারা আমাদের বলেছে, বাংলাদেশেই এজেন্টদের অর্থ পরিশোধ করায় বিসিএ সনদ পাওয়ার বিষয়ে এমওএম আমাদের সাহায্য করতে পারবে না। তবে নতুন কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার পর আমরা নতুন মালিকদের কাছে এই কোর্সে পাঠানোর অনুরোধ জানাতে পারি।”

কোম্পানির পক্ষ থেকে কোর্সে পাঠানোর কথা বলে এজেন্টদের টাকা নেওয়ার বিষয়টি এমওএম জানে কি না এবং তারা কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা জানতে চেয়ে স্ট্রেইটস টাইমস যোগাযোগ করেছে। পরবর্তীতে ২৩ অক্টোবর এমডব্লিউসি এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা তাদের সহযোগী এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের উপযুক্ত কর্মসংস্থান এবং স্থানান্তরের সহায়তায় কাজ করছে। অর্থ সহায়তার পাশাপাশি এমডব্লিউসি প্রায় ৯০ জন শ্রমিককে খাবার সরবরাহ করছে।