০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

সিঙ্গাপুরে কাজ হারানো সেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের নতুন চাকরির সুযোগ

দুই প্রতিষ্ঠানের ২৩০ জনের বেশি অভিবাসী শ্রমিকের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সিঙ্গাপুরে কাজ হারানো সেই বাংলাদেশি শ্রমিকদের নতুন চাকরির সুযোগ

২৩০ জনেরও বেশি অভিবাসী শ্রমিককে সম্ভাব্য নিয়োগকারীদের সঙ্গে  সংযুক্ত করা হয়েছে এবং অস্থায়ী আবাসন দেওয়া হয়েছে, ছবি: দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।

মশিউর রহমান, সিঙ্গাপুর থেকে

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Nov 2026, 12:47 AM

Updated : 08 Nov 2026, 12:47 AM

সিঙ্গাপুরে বেতন না পেয়ে কাজ হারানো দুই প্রতিষ্ঠানের ২৩০ জনের বেশি অভিবাসী শ্রমিকের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশের নাগরিক। এরই মধ্যে কয়েকজন শ্রমিক তাদের বকেয়া বেতনও পেয়েছেন।

শুক্রবার সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের (এমওএম) অনবোর্ডিং সেন্টারে আয়োজিত এক কর্মসংস্থান মেলায় শ্রমিকদের সঙ্গে নির্মাণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তাদের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয়।

শনিবার দেশটির সংবাদমাধ্যম ‘দ্য স্ট্রেইটস টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বকেয়া বেতনের দাবিতে গত অক্টোবরে অভিযোগ করা ২৩০ জনের বেশি শ্রমিককে সম্ভাব্য নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি সাময়িক আবাসনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশের নাগরিক।

এই শ্রমিকেরা ‘প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনস’ এবং ‘জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’ নামের দুটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। বেতন পরিশোধ না করার অভিযোগে প্রতিষ্ঠান দুটির বিরুদ্ধে তদন্ত করছে সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয়।

বাংলাদেশের রাজশাহী থেকে গত এপ্রিলে সিঙ্গাপুরে আসা ২১ বছর বয়সি বাংলাদেশি শ্রমিক রব্বানি মো. গোলাম তাদের একজন। দুই মাসের বেতন বকেয়া থাকায় তার হাতে ১০ সিঙ্গাপুরি ডলারেরও কম অর্থ অবশিষ্ট ছিল। তবে ৬ নভেম্বর একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রস্তাব পাওয়ার পর নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন তিনি।

দ্য স্ট্রেইটস টাইমসকে রব্বানি বলেন, “এখন আর অতটা দুশ্চিন্তা হচ্ছে না। আবার বেতন আয় করতে পারব। গত এক মাস ধরে বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করে চলতে হয়েছে।”

একই প্রতিষ্ঠানের আরেক শ্রমিক মো. সাব্বির আলম নভেম্বরের শুরুতে তার বকেয়া বেতন পেয়েছেন। ২৩ বছর বয়সি এই শ্রমিক জানান, বেতন পাওয়ায় তিনি স্বস্তি পেয়েছেন। বাংলাদেশে চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। বেতন পাওয়ার পাশাপাশি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পাওয়ায় পরিবারের কাছে আবার টাকা পাঠাতে পারবেন বলে আশা করছেন।

তবে সবার অনিশ্চয়তা কাটেনি। ‘জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’-এ কাজ করা ২১ বছর বয়সি সায়মন ইসলাম এখনও নতুন নিয়োগকর্তার কাছ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। গত অক্টোবরে তার ওয়ার্ক পারমিট বাতিল হওয়ায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তার তিন মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে।

সিঙ্গাপুরে আসার জন্য নেওয়া ৬ হাজার ডলারের ঋণ এখনও পরিশোধ করতে হচ্ছে জানিয়ে সায়মন জানান, বকেয়া বেতন ফেরত না পেলেও তাকে আবার কাজে ফিরতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রসেস মেইনটেন্যান্স সলিউশনস’-এর প্রায় ১২০ জন ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকের মধ্যে প্রায় সবাই তাদের বকেয়া বেতন পেয়েছেন বলে ওই প্রতিষ্ঠানের পাঁচজন শ্রমিক জানিয়েছেন। তবে ‘জুরং টেকনিক্যাল অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন’-এর তিনজন শ্রমিক জানিয়েছেন, তারা এখনও বেতন পাননি।

গত ২৯ অক্টোবর দ্য স্ট্রেইটস টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রতিষ্ঠান দুটির শ্রমিকেরা গত অগাস্ট থেকে বেতন পাচ্ছিলেন না। সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে কয়েক দফায় তাদের ওয়ার্ক পারমিটও বাতিল করা হয়।

নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের শুধু প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতেই সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। নির্মাণ খাতেও কাজের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। শ্রমিকদের অনেকে এই খাতে যেতে আগ্রহী, কারণ সেখানে তুলনামূলক বেশি আয় করা যায়।

সিঙ্গাপুরের অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা ‘ট্রানজিয়েন্ট ওয়ার্কার্স কাউন্ট টু’ (টিডব্লিউসি২) গত অগাস্টে প্রকাশিত এক জরিপে জানায়, নির্মাণ খাতে শ্রমিকদের গড় মাসিক আয় ৮৬৮ সিঙ্গাপুরি ডলার। অন্যদিকে প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে এ আয় ৭৭১ ডলার। উভয় হিসাবেই ভাতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তবে অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক বা ওভারটাইম ধরা হয়নি।

সিঙ্গাপুরের অভিবাসী শ্রমিক কেন্দ্র (এমডব্লিউসি) এবং জনশক্তি মন্ত্রণালয় শ্রমিকদের বকেয়া বেতনের দাবি নিষ্পত্তির পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান, খাবার ও আবাসনের ব্যবস্থা করতে সহায়তা করছে। এমডব্লিউসির তথ্য অনুযায়ী, ৩ নভেম্বরের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের এমওএমের অনবোর্ডিং সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়েছে। সংস্থাটির সহায়তা পাওয়া ২৩০ জন শ্রমিকের ৯০ শতাংশের বেশি বকেয়া বেতনের দাবিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছেন।

এমডব্লিউসির পরিচালক মাইকেল লিম জানান, যারা নিজেরাই নতুন চাকরি খুঁজে পেয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের আবেদন করতে সহায়তা করা হচ্ছে। বকেয়া বেতনের দাবি নিষ্পত্তি এবং পরবর্তী করণীয় নিয়েও শ্রমিকদের পাশে থাকবে সংস্থাটি।

জনশক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ না করার বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তদন্তে কর্মসংস্থান আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে চলমান তদন্তের কারণে প্রতিষ্ঠান দুটি এবং তাদের মধ্যকার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হয়নি মন্ত্রণালয়।

দ্য স্ট্রেইটস টাইমসের আগের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠান দুটির পরিচালকরা এর আগে এমন দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, যেগুলো জুলাইয়ে কর্মসংস্থানসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া এক ব্যক্তির মালিকানায় ছিল। ওই ঘটনায় একটি অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করছে সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয়।

এদিকে, প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন বাংলাদেশি ব্যক্তি শ্রমিকদের নিয়োগ ও বিভিন্ন কর্মস্থলে পাঠানোর কাজ করতেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। বিষয়টি নিয়ে তারা বাংলাদেশ হাই কমিশনের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন।

গত ২৬ অক্টোবর হাই কমিশন জানায়, তারা ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত এবং তদন্ত ও শ্রমিকদের সহায়তায় সিঙ্গাপুরের কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

এ ঘটনায় আগের সংবাদ-

সিঙ্গাপুরে কাজ হারিয়ে অনিশ্চয়তায় দুই প্রতিষ্ঠানের শতাধিক বাংলাদেশি