২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

‘বিরোধী দল কি আমি গড়ে দেব’, প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রীর

প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এক পর্যবেক্ষক বলেন, “বাংলাদেশে (নির্বাচনের বিষয়ে) ওয়াশিংটনের চেয়ে কম প্রশ্ন ছিল।”

‘বিরোধী দল কি আমি গড়ে দেব’, প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রীর

জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেখতে আসা বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে গণভবনে সোমবার মতবিনিময়ের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন হাস্যোজ্জল।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 08 Jan 2024, 10:31 PM

Updated : 08 Jan 2024, 11:08 PM

দেশে কার্যকর বিরোধী শক্তি থাকার বিষয়ে এক প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্টো জানতে চেয়েছেন, বিরোধীদল তিনি গড়ে দেবেন কি-না।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের পরদিন সোমবার গণভবনে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে এ কথা বলেন।

সেই সাংবাদিকদের পাল্টা প্রশ্নে পরে হাসতে হাসতে প্রধানমন্ত্রীও প্রশ্ন রেখে বলেন, "আমাকে বলুন আপনি কী চান? আমি বিরোধী দল গঠন করব? আমি কি সেটা করতে পারি?”

নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভোটে জয়ের পর এ সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা প্রধানমন্ত্রীকে নির্বাচন ও বিএনপির বর্জন নিয়ে নানা প্রশ্ন করেন। সেগুলোর জবাব দেন আওয়ামী লীগ প্রধান।

এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা যে টানা চতুর্থবার জয়ের বন্দরে ভিড়তে যাচ্ছে, তা নিয়ে কোনো সংশয় কারো ছিল না। জল্পনা-কল্পনা ছিল দ্বিতীয় অবস্থান নিয়ে, সেখানে চমক দেখালেন আওয়ামী লীগেরই স্বতন্ত্ররা। 

বিএনপি ও সমমনা এবং বামপন্থি দলের একাংশের বর্জনের এ নির্বাচনে ২২২ আসনে আওয়ামী লীগের জয়ের বিপরীতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬২ আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।

গত দুই সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসা জাতীয় পার্টি শেষ পর্যন্ত ১১ আসনে জয় পেয়েছে।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিকদের মধ্যে জাসদ একটি, ওয়ার্কার্স পার্টি একটি এবং এক সময় বিএনপির জোটে থাকা কল্যাণ পার্টি একটি আসনে জয় পেয়েছে।

একটি কেন্দ্র স্থগিত থাকায় ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনের ফল স্থগিত রেখেছে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়। সেই আসনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী এগিয়ে আছেন।

লাঙ্গলে প্রতীকে জয়ী ১১টি আসন নিয়ে দৃশ্যত আবারও সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে জাতীয় পার্টি। তবে সংখ্যায় তাদের পাঁচগুণ বেশি স্বতন্ত্ররা সম্ভাব্য ওই তকমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

ওই নির্বাচন নিয়ে সোমবার গণভবনের লনে পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে আসেন টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে চলা শেখ হাসিনা।

বিরোধী দল গঠনের কী হবে 

ওই মতবিনিময়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে এক ভারতীয় সাংবাদিক জানতে চান, “আপনি যখন গণতন্ত্রের কথা বলেন, তখন বাংলাদেশে আপনার বিরোধী দল প্রয়োজন। বাংলাদেশের স্বপ্নদর্শী নেতা হিসেবে আপনার দায়িত্ব রয়েছে এমন পরিস্থিতি তৈরি করার, যেখানে বিরোধী শক্তি থাকবে। আপনি এ বিষয়ে কী করবেন বা কী ভাবছেন?”

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “আমাকে বলুন আপনি কী চান? আমি বিরোধী দল গঠন করব? আমি কি সেটা করতে পারি?”

সেই সাংবাদিক আবার প্রশ্ন করেন, “আমি আপনার কাছে জানতে যাচ্ছি, আমার মাথায় যে প্রশ্নটি এসেছে করেছি।”

এরপর দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের বিরোধী দলের থাকার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “বিরোধী দল হতে হলে আপনাকে আপনার নিজের দলকে সংগঠিত করতে হবে। আপনি যদি সেটা করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তার জন্য দায়ী কে?”

পরে তিনি হাসতে হাসতে বলেন, “আপনি আমাকে বিরোধীদলের জন্য একটি রাজনৈতিক দল সংগঠন করতে বলেন, আপনি যদি চান আমি করে দিতে পারি। কিন্তু সেটাতো সত্যিকারের বিরোধী দল হবে না, তাই না?” 

বিরোধী দলের অবর্তমানে প্রাণবন্ত গণতন্ত্র হবে?

বিবিসির সাংবাদিক জানতে চান, “২০১৮ সালের মতো প্রধান বিরোধীদলকে সংলাপে না এনে, তাদের অনুপস্থিতিতে আপনি গতকাল বিজয় অর্জন করেছেন। ৬০ শতাংশ মানুষ ভোট দেয়নি। মানবাধিকার সংস্থাগুলো আপনার সরকার এবং গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার উপর এর ক্র্যাকডাউনের সমালোচনা করছে।

“আপনি কি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশকে প্রাণবন্ত গণতন্ত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারবে, বিশেষ করে যখন কোনো বিরোধী দল অবর্তমানে?” 

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, “দেখুন, প্রত্যেক দলেই নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে। কোনো দল যদি নির্বাচনে অংশ না নেয়, তার মানে এই যে গণতন্ত্র নেই। আপনাকে বিবেচনা করতে হবে, জনগণ অংশ নিয়েছে কি নেয়নি।”

ট্রেনে আগুনে চারজন পুড়ে মরার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এটা কি গণতন্ত্র?”

গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যখন আপনি রাজনৈতিক কারণে সাধারণ মানুষকে হত্যার চেষ্টা করেন, এটা রাজনীতি নয়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। দেশে কারোরই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করা করা উচিত নয়। জনগণ এটা গ্রহণ করে না।”

এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমরা আমাদের ধৈর্য দেখিয়েছি এবং আমরা জনগণের অধিকার নিশ্চিত করেছি।”

বিএনপির বিষয়ে তিনি বলেন, “দলটি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তারা মানুষকে বাধা দিয়েছে, যাতে তারা ভোটকেন্দ্রে না যায়, এটা-সেটা। কিন্তু দেশের মানুষ তাদের কথা শোনেনি। কারণ, এখন আমাদের দেশের জনগণ তার অধিকার সম্পর্কে অনেক সচেতন; ভোটের অধিকার, খাদ্যের অধিকার।”

গণতন্ত্রের ‘এর ভিন্ন কোনো সংজ্ঞা’ আছে কি-না সেটি জানেন না উল্লেখ করে তিনি বলেন, “জনগণ (ভোটে) অংশ নিয়েছে, তারা তাদের সরকারের জন্য ভোট দিয়েছে। সুতরাং জনগণের অংশগ্রহণই মূল বিষয়।

“সুতরাং নির্বাচন হয়েছে, তারা (বিএনপি) থামাতে পারেনি, যেটা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা তারা করেছে। আপনি এটাকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?”

২০১৩ থেকে ১৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি ‘একই রকমের’ কার্যক্রম চালিয়েছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “এখনও মানুষ হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। তাহলে আপনি কি তাদেরকে গণতান্ত্রিক দল হিসাবে সংজ্ঞায়িত করবেন?

“তারা সন্ত্রাসী দল। এটা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। জনগণ তাদেরকে সমর্থন দেয়নি। আমি কি পরিষ্কার করতে পারলাম?”

‘সেটা সমালোচনার স্বাধীনতা’

নির্বাচনের সমালোচনা করে যেসব বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো তুলে ধরে জার্মানির এক পর্যবেক্ষকের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যারা সমালোচনা করতে চায় করতে পারে, এটা তাদের স্বাধীনতা। আমার নিজস্ব বিশ্বাস আছে, এটা সঠিক হোক বা ভুল যাই হোক আমি সেটাতে বিশ্বাস রাখি।

“হ্যাঁ, আমি ঠিক কাজটাই করেছি, আমি মনে করি নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ ছিল।”

আগামী পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের লক্ষ্যের বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমার দেশের মানুষের উন্নতি আমার প্রধান লক্ষ্য। আমরা যে কাজগুলো শুরু করেছি সেগুলো এগিযে নিয়ে যাওয়া।”

বিদেশিদের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে অন্য এক প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রত্যেক দেশের সঙ্গে আমার সম্পর্ক রয়েছে, আমি সেটা অব্যাহত রাখতে চাই। যাতে আমার দেশ দ্রুত উন্নত হয়।”

নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালো হয়েছে কি না?

বিরোধীদের বর্জনে নির্বাচনের কথা তুলে ধরে সরকারের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা এক পর্যবেক্ষক বলেন, “এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রেও এই রকম ভোটার উপস্থিতি পাওয়া যেত। আমি আপনাকে সেজন্য এবং বাংলাদেশের জনগণের উৎসাহের জন্য অভিনন্দন জানাই।”

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ককে ত্বরান্বিত করার জন্য কী করা প্রয়োজন তাও জানতে চান তিনি।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “প্রত্যেক দেশের সঙ্গে আমাদের অসাধারণ সম্পর্ক, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও। আমাদের দিক থেকে কোনো সমস্যা নাই।

“আমাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং এটা আপনাদের বা আপনাদের সরকারের উপর নির্ভর করে। এবং আমি সাধুবাদ জানাচ্ছি, আপনি উল্লেখ করেছেন নির্বাচনটা অনেক অনেক ভালো ছিল। এটা কি আপনার দেশের চেয়েও ভালো নির্বাচন ছিল?”

তখন ওই পর্যবেক্ষক বলেন, “গতকাল নির্বাচনের পরে বাংলাদেশে (নির্বাচন প্রশ্নে) ওয়াশিংটনের চেয়ে কম প্রশ্ন ছিল।”

এরপর প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনি দেখতে পাবেন এখন এটা ভালো। এই অবস্থা চলমান থাকবে। দুশ্চিন্তা করবেন না। আমাদের জনগণ অসাধারণ। এবং আমি কিছু বললে শোনে।”

যে কোনো দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর সম্মান জানানোর গুরুত্বের কথাও তার তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

‘গণমাধ্যম স্বাধীন’

গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “মানুষ কথা বলছে, তারা যে কোনো কিছু বলতে পারে। দেশের অনেক সংবাদপত্র আছে তারা লিখতে পারে। আমি কোথাও হস্তক্ষেপ করি না।”

সমালোচনার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলে, “কেউ যদি আপনার সমালোচনা করে, তাদের থেকে শিখতে পারেন এবং নিজেকে শুধরাতে পারেন।”