তিনি বলেন, “নির্বাচন নিয়ে কেউ যাতে কোনো অভিযোগ আনতে না পারে। শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন করবেন। কারণ নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ থাকতে হবে।”
Published : 21 Dec 2023, 05:57 PM
নির্বাচনে সংঘাত-মারামারি বন্ধ করে জনগণের ভোটাধিকার নির্বিঘ্ন রাখতে দলীয় প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এর ব্যত্যয় হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, “এখানে (ভোটে) কিন্তু সংঘাত-মারামারি কোনো কিছু আমি দেখতে চাই না। আমার দলের যদি কেউ করে, তার কিন্তু রেহাই নেই। সাথে সাথে ব্যবস্থা নেব।
“আমরা চাই, জনগণ তার ভোটাধিকার নির্বিঘ্নে প্রয়োগ করবে। যাকে খুশি তাকে ভোট দেবে, সে জয়ী হয়ে আসবে। গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করতে হবে। এর যদি ব্যত্যয় ঘটে, বাংলাদেশ কিন্তু শেষ হয়ে যাবে।”
বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনি কার্যালয় থেকে ভার্চুয়ালি পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, নাটোর, পাবনা ও খাগড়াছড়ির জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নির্বাচন নিয়ে কেউ যাতে কোনো অভিযোগ আনতে না পারে। শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন করবেন। কারণ নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ থাকতে হবে।”
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় হওয়া ঠেকাতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিকল্প প্রার্থী রাখার নির্দেশনা আসার পর এবারের ভোটে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার হিড়িক পড়ে। দলটির দেড়শ জনেরও বেশি নেতা নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ভোটের মাঠে লড়াই করছে। এমনকি নৌকা না পেয়ে ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরাও আছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে।
দল মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তাকে বিদ্রোহী হিসেবে তকমা দেওয়া হয়, সেই সঙ্গে বহিষ্কারের মত বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার নজির আছে। তবে এবার দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপি নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক দেখাতে চাইছে ক্ষমতাসীনরা।
সে কারণে স্বতন্ত্রদের ‘বিদ্রোহী’ তকমা দেওয়া হয়নি যেমন, তেমনই তাদের বিরুদ্ধে দল যে কোনো ব্যবস্থা নেবে না তাও জানিয়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে দলটির মনোনীত প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনা ঘটছে।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, “প্রার্থীরা স্বাধীনভাবে প্রচারণা চালাবে। জনগণকে সুযোগ দিতে হবে। তারা পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দেবে। তাতেই আমাদের গণতন্ত্র আরো শক্তিশালী হবে।”
‘ওরা ভোটের কী বোঝে?’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নির্বাচনে ভোটারের অংশগ্রহণ থাকতে হবে, কোনো দল আসলো না আসলো- তাতে কিছু যায় আসে না। বিএনপি আসেনি একটা কারণে যে, এখানে ভোট চুরির সুযোগ নাই। ২০০৮ এ পারে নাই। এরপর থেকেই তারা নির্বাচন বর্জন করতে চায়। আমরা নির্বাচন আর জনগণের ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করি।”
সন্ত্রাস ঠেকাতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “দুইবার যারা ভোটের চুরির অপবাদে বিদায় নিয়েছিল, তারা আবার ভোটের কথা বলে। ভোটের অধিকার আওয়ামী লীগ দিয়েছে, সেটা অব্যাহত থাকবে।
“আপনাদের সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে জনগণের ক্ষতি করতে না পারে। ৭ জানুয়ারি নির্বাচনে জনগণ ভোট দেবে। এটা তাদের সাংবিধানিক অধিকার। প্রত্যেকে জনগণের কাছে যাবে; জনগণ যাকে ভোট দেবে, সে নির্বাচিত হবে। কেউ কারও অধিকারে হস্তক্ষেপ করবেন না।”
আওয়ামী লীগ মানুষের কল্যাণে কাজ করে দাবি করে দলটির প্রধান বলেন, “বিএনপির কাজ জ্বালাপোড়া-অগ্নিসন্ত্রাস করা, এটাই তারা ভালো বোঝে। নির্বাচনের তারা আসবে না। আসবে কীভাবে বলেন তো? ২০০৮ সালের নির্বাচনে কথা চিন্তা করেন।
“সেই নির্বাচন নিয়ে তো কারো কোনো অভিযোগ নেই। ওই নির্বাচনে ফলাফল কী ছিল? সেই নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট পেয়েছিল মাত্র ৩০টি আসন। আর আওয়ামী লীগ এককভাবে পেয়েছিল ২৩৩টি আসন। এই কথাটি সবার মনে রাখতে হবে। এখন তারা বড় বড় কথা বলে। ভোটের কথা বলে। ওরা ভোটের কী বোঝে?”
বাসে-রেলে আগুনে ‘বিএনপির দায়’
বিএনপির জন্ম অবৈধভাবে হয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সংবিধান লঙ্ঘন করে; সেনা আইন লঙ্ঘনকারী, সেনা রুলস লঙ্ঘনকারী এক জেনারেলের পকেট থেকে। জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছে, হ্যাঁ/না ভোট; জনগণের ভোট চুরি করেছে।
“ক্ষমতায় বসে থেকেই একসাথে সেনা প্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান, আবার নির্বাচনও করেছে। আর সেই অবৈধ ক্ষমতায় দখলকারীর পকেট থেকে বেরোল বিএনপি। কাজেই তাদের কাজের সবকিছুই অবৈধ। তারা মানুষকে মানুষ হিসেবে মনে করে না। তা না হলে রেলে আগুন দিয়ে কীভাবে মানুষ পোড়াল?”
শেখ হাসিনা বলেন, “একটা মা তার ছোট বাচ্চাকে বাঁচানোর জন্য বুকে ধরে রেখেছে। সেই অবস্থায় মরে কাঠ হয়ে গেছে। বাসের ভেতরে হেলপার ঘুমিয়ে আছে, আগুন দিয়েছে- হেলপার পুড়ে শেষ। ২০১৩-১৪ সালে একই ঘটনা তারা ঘটিয়েছে।
“ছেলেকে বসিয়ে রেখে বাবা গেছে পানি আনতে, আগুনে ঝলসে গেছে ছেলে। এইভাবে সারাদেশে তারা তাণ্ডব করেছে, ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। এখন আবার অগ্নিসন্ত্রাস শুরু করেছে। বাসে-রেলে আগুন দিচ্ছে।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নতুন কোচ আমরা কিনেছি। মানুষ শান্তিতে চলাফেরা করবে। মানুষকে শান্তিতে দেখলে ওদের মনে অশান্তি জাগে। আর একটা কুলাঙ্গার আছে ২০০১ সালে হাওয়া ভবন খুলে দুর্নীতি করত। হাওয়া ভবনের খাওয়া শেষ না করা পর্যন্ত তার শান্তি ছিল না। খেতে খেতে সবই খেয়ে ফেলেছে।
“মানি লন্ডারিং, ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাকারবারি, দুর্নীতি...এফবিআইয়ের লোক এসে সাক্ষী দিয়ে গেছে। আর রাজনীতি করবে না বলে মুচলেকা দিয়ে গেছিল। এখন সেখানে বসে হুকুম দিয়ে নির্বাচন বানচাল করার… তারা নাকি গণতন্ত্র আর ভোট দেবে।”
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, “যাদের জন্মই অবৈধ, গণতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে হয়নি, ভোটের মধ্য দিয়ে হয়নি, তারা গণতন্ত্র আর ভোট দেবে কীভাবে? গণতন্ত্র বানান করতে পারবে? সন্ত্রাসী আর জঙ্গিবাদী সংগঠন হচ্ছে বিএনপি।”
‘উন্নয়নের ছোঁয়া সব এলাকায়’
তার সরকারের আমলের উন্নয়নের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “ভোট ও ভাতের অধিকার রক্ষার আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার নিশ্চিত করেছি। মানুষ আজকে ভোট দিতে পারে। আর্থসামাজিকভাবে উন্নত করেছি।
“এমন কোনো এলাকা নেই যেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। ১৫ বছরে বদলে গেছে বাংলাদেশ। এখন উত্তরাঞ্চলে মন্দা দেখা দেয় না। পার্বত্য অঞ্চলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে।”
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় তার সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে তিনি বলেন, “১০ কোটির মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে উপকৃত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রকার ভাতার মাধ্যমে মানুষকে ভালো রেখেছি। আরো ৪ কোটি বেশি মানুষ কাজের বিনিময়ে ভাতা পাচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি।
“শিক্ষা খাতে উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই দিচ্ছি। আমি মনে করি, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ছাড়া একটি দেশ উন্নতি করতে পারে না।”
এখন স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যের কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “আগামী প্রজন্ম হবে প্রযুক্তিনির্ভর। তাদের সেভাবে গড়ে তুলতে কাজ করছে সরকার।”
দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিগগিরই লড়াইয়ের ঘোষণা দেবেন জানিয়ে তিনি বলেন, “দুর্নীতি সব নষ্ট করে. কিছু লোক আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়। আর সৎভাবে যারা জীবনযাপন করে, তাদের কষ্ট হয়।
“দুর্নীতির বিরুদ্ধেও জিরো টলারেন্স আমরা ঘোষণা দেব। সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা, মানুষের জীবন উন্নত করা লক্ষ্য।”
পাঁচ জেলার জনসভায় ঢাকা প্রান্তে ছিলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাছান মাহমুদ।