Published : 02 Dec 2025, 01:45 PM
ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞ দল আসছেন বুধবার।
এদিন দুপুরে হাসপাতালের সামনে এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য তুলে ধরেন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এজেডএম জাহিদ হোসেন।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, কাতার, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও ভারত ইতোমধ্যে চিকিৎসা সহায়তার হাত বাড়িয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “খালেদার জন্য দেশের বাইরে নেওয়ার জন্য যে কথাটি আমি পূর্বেও বলেছি, মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা উনাকে দেখেছেন। আজকেও ইউকে থেকে উনাকে দেখার জন্য বিশেষজ্ঞ আসবেন এবং উনারা দেখবেন।
“দেখার পরবর্তীতে উনাকে যদি ট্রান্সফারেবল হয়, আমাদের যদি ট্রান্সফার করার প্রয়োজন পড়ে— মেডিকেল বোর্ড মনে করে, তখনই সেই যথাযথ সময়ে উনাকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে।”
বিএনপি চেয়ারপারসনকে এ মুহূর্তে দেশের বাইরে নেওয়ার সুযোগ নেই বলেও জানান ডা. জাহিদ।
“আমাদের সকল প্রস্তুতি আছে; কিন্তু সর্বোচ্চটা মনে রাখতে হবে যে— রোগীর বর্তমান অবস্থা এবং সর্বোপরি মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শের বাইরে কোনো কিছু করার সুযোগ এই মুহূর্তে আমাদের নেই।”
অধ্যাপক জাহিদ হোসেন বলেন, “আল্লাহর অশেষ মেহেরবাণীতে ডাক্তাররা যে চিকিৎসা দিচ্ছেন, সেই চিকিৎসা উনি (বেগম খালেদা জিয়া) সেটি উনি গ্রহণ করতে পারছেন অথবা আমরা যদি বলি উনি মেনটেইন করছেন।
“আমরা এই সংকটময় মুহূর্তে আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে উনার সুস্থতার জন্য দোয়া চাই। এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যাতে দেশবাসীর দোয়া, সারা পৃথিবীর অনেক মানুষের উনার প্রতি ভালোবাসা এবং দোয়ার কারণে হয়তোবা উনি এই যাত্রায় সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে আমরা আশা করি।”
‘গুজবে কান দেবেন না’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, “আমরা আপনাদের মাধ্যমে সবাইকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং সেই সাথে কোনো ধরনের গুজব ছড়ানো এবং গুজবে কান না দেওয়ার জন্য বিনীতভাবে পরিবারের পক্ষ থেকে, দলের পক্ষ থেকে আপনাদেরকে আমরা অনুরোধ করছি।
“আমাদের দল কীভাবে আপনাদেরকে ইনফরমেশন দেবে, সেটিও আমাদের দলের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত এ চিকিৎসক বলেন, “সম্মানিত সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা আপনারা ধৈর্য ধরুন, দীর্ঘ ছয়বছর যাবৎ আপনারা আমাদেরকে সহযোগিতা করেছেন। ইনশাআল্লাহ আমরা এই যাত্রাতেও আপনাদের ভালোবাসা, আপনাদের সহযোগিতা এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অশেষ মেহেরবানিতে…আমরা আবারো আমাদের প্রাণপ্রিয় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে আজকে দেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতীক, সেটি আজকে প্রমাণিত; সেই লক্ষ্যেই আমরা আপনাদের সহযোগিতা চাই।”
তিনি বলেন, “আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করেছেন যে ধৈর্য ধারণ করার জন্য এবং উনি সার্বক্ষণিকভাবে বিরামহীনভাবে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল টিমের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন।
“আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া চিকিৎসাকার্য সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। কোনো ধরনের গুজবে কান না দেওয়ার জন্য আপনাদেরকে অনুরোধ করছি এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্য সুস্থতার জন্য আপনাদের মাধ্যমে দেশ তথা সকল ধর্মের মানুষের প্রতি আমরা উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।”
ডা. জাহিদ বলেন, “বিভিন্ন ধরনের গুজব, বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য বিভিন্ন জায়গায় দেখার পরিপ্রেক্ষিতে দলের পক্ষ থেকে আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সার্বক্ষণিকভাবে উনার চিকিৎসার তদারকি করছেন।
“চিকিৎসার সমস্ত বিষয়ে উনি দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সাথে আমাদের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছেন।”
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
জাহিদ বলেন, “দলের মহাসচিব এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ সারা দেশের মানুষের ন্যায় প্রধান উপদেষ্টা উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সার্বক্ষণিকভাবে উনার চিকিৎসার ব্যাপারে যথাযথ সহযোগিতা, এই হাসপাতাল হাসপাতালের চিকিৎসক নার্স এবং সকল কর্তৃপক্ষ দিয়ে যাচ্ছেন এবং আমরা সবার প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।
“আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ যারা অর্থাৎ আমেরিকা বলেন, ইউকে বলেন, পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না বলেন, কাতার বলেন, সৌদি আরাবিয়া বলেন, পাকিস্তান বলেন, ইন্ডিয়া বলেন, আমাদের অনেক সরকার এবং রাষ্ট্রপ্রধান এই চিকিৎসার ব্যাপারে তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।”
অধ্যাপক জাহিদ জানান, অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড বেগম জিয়ার চিকিৎসা সেবায় কাজ করছেন। এ মেডিকেল বোর্ড রয়েছেন—অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী, অধ্যাপক নুরুদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক এ কিউ এম মহসিন, অধ্যাপক শামসুল আরেফিন, অধ্যাপক জিয়াউল হক, অধ্যাপক মাসুম কামাল, অধ্যাপক এ জেড এম সালেহ, অবসরপ্রাপ্ত বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সাইফুল ইসলাম ও ডাক্তার জাফর ইকবাল। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে অধ্যাপক হাবিবুর রহমান, অধ্যাপক রফিকউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক জন হ্যামিল্টন, অধ্যাপক হামিদ রব, যুক্তরাজ্য থেকে অধ্যাপক জন প্যাট্রিক, অধ্যাপক জেনিফার ক্রস এবং পুত্রবধূ ডাক্তার জুবাইদা রহমান।
গত ২৩ নভেম্বর রাতে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য খালেদা জিয়াকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বুকে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাকে ভর্তি করে নেওয়া হয়। সোমবার ভোর সাড়ে ৩টার দিকে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে রাখা হয়েছে ‘স্পেশাল কেয়ারে’।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন জানিয়ে বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেছেন, তার জন্য শিগগিরই নতুন বাংলাদেশি পাসপোর্ট ইস্যু হবে বলে তারা আশা করছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ইতোমধ্যে বলেছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফিরতে চাইলে এক দিনের মধ্যেই ট্রাভেল পাস দেবে সরকার।
তবে তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, উপদেষ্টা এককালীন ট্রাভেল পাসের কথা বললেও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েই ফিরতে চান।
জিয়া পরিবার ও বিএনপির তরফে সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তারেক রহমান মঙ্গলবার সকালে ফেইসবুকে লিখেছেন, “দেশবাসীর সম্মিলিত সমর্থনই আমাদের পরিবারের শক্তি ও প্রেরণার উৎস। মমতাময়ী দেশনেত্রীর দ্রুত আরোগ্যের জন্য আমরা সবাই নিরন্তর দোয়া করছি।
“এই কঠিন সময়ে ঐক্য, সহমর্মিতা ও সংহতির জন্য প্রতিটি মানুষের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা রইলো।”
২০০৮ সালে কারামুক্তির পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তারেক রহমান লন্ডনে যান। গত ১৭ বছর ধরে সেখানেই নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে আসছেন তিনি।