Published : 24 May 2025, 09:33 PM
রাজনৈতিক অঙ্গনে গত কয়েকদিনে হঠাৎ যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল তা প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকের পর ‘কিছুটা কমেছে’ বলে মনে করছে জামায়াতে ইসলামী।
শনিবার রাতে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক শেষে দলটির আমির শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের প্রশ্নে এমন মন্তব্য করেন।
প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠক শেষে রাত সাড়ে ৯টার দিকে সাংবাদিকদের সামনে আসেন শফিকুর রহমান। বলেন, দুটো রোডম্যাপ হলে বাকি সমস্যারও সমাধান হয়ে যাবে।
দুটো রোডম্যাপ (পথনকশা) বলতে সংস্কার ও নির্বাচনের রোডম্যাপের কথা তুলে ধরেন দলটির আমির।
তবে সংস্কারের আগে নির্বাচন করা হলে তাতে জনগণের আশা পূরণ হবে না বলে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টার এ বৈঠকে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে জামায়াতে ইসলামীর দুই নেতা।
দলটির আমিরের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।
হঠাৎ করে এ বৈঠকের প্রেক্ষাপটের কথা তুলে ধরতে গিয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘‘গত কয়েকদিন ধরে দেশে একটা অস্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে। তারই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা জাতিকে একটা মেসেজ দিতে চেয়েছিলেন। তিনি সেটা দেননি, কিন্তু এই কথাটা খুব দ্রুত সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। সমাজে একটা অনিশ্চিয়তা, আতঙ্ক দেখা দেয়।
‘‘একই সময়ে একজন রাজনৈতিক নেতা তার জনপ্রতিনিধিত্বের দাবি নিয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আরেকটি গ্রুপ অবস্থান নিয়েছিল। এসব কিছু প্রধান উপদেষ্টার জন্য কিছুটা কষ্টের, কিছুটা বিরক্তির ছিল। যার কারণে তিনি তার দায়িত্বের ব্যাপারে পুনর্বিবেচনা করবেন বলে একটা অভিমান প্রকাশ করেছিলেন।”
তিনি বলেন, জনগণের কোনো ভোগান্তি না হয়ে একটি সুবিধাজনক সময়ে নির্বাচন হতে হবে। নির্বাচনের আগে বিচার ও সংস্কারের দৃশমান বিষয় জনগণের সামনে আসতে হবে।
তিনি বলেন, ‘‘আমরা বলেছি, দুইটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার, একটি হল নির্বাচন কখন হবে আর আরেকটি হল নির্বাচনের আগে অবশ্যই সংস্কার এবং বিচারের কিছু প্রক্রিয়া জনগণের সামনে আসতে হবে।
‘‘ সংস্কার শেষ করে নির্বাচন না হলে জনগণ তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না বলে আমরা মনে করি। আবার সব সংস্কার এখন করা সম্ভব না। মাত্র পাঁচটা সুনির্দিষ্ট বিষয়ে তারা হাত দিয়েছেন। এতটুকু নিষ্পত্তি করা দরকার সন্তোষজনকভাবে।”
তাদের পক্ষ থেকে নির্বাচনের সময় বেঁধে না দেওয়ার কথা তুলে ধরে শফিকুর বলেন, নির্বাচন ফেব্রুয়ারির মধ্যে হতে পারে বলে তারা মনে করেন। এরপর রোজা। তখন ভোট করার পরিবেশ থাকবে না। এরপর সময় টেনে লম্বা করার দরকার নেই।
জামায়াত আমির বলেন, তারা কারও পদত্যাগও চাননি।
হঠাৎ পাল্টে যাওয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার অংশ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন মুহাম্মদ ইউনূস।
এর আগের বিএনপির নেতাদের সঙ্গে পৌনে এক ঘণ্টার বেশি সময় কথা বলেন মুহাম্মদ ইউনূস।
ওই বৈঠক শেষ হতে না হতেই রাত সাড়ে ৮টার দিকে জামায়াতের দুই নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান, যা শেষ হয় রাত সাড়ে ৯টার দিকে।
বৈঠকে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ উপস্থিত ছিলেন।
জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক শেষে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে বসেন প্রধান উপদেষ্টা।
বৈঠক শেষে জামায়াত আমির বলেন, ‘‘এই সরকার আমাদের সবার। আমাদেরকে এই সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। দেশ আমাদের সবার, দেশ ভালো থাকলে আমরা ভালো থাকব। এখন যারা সরকারে আছেন, তাদের পরিচয় হচ্ছে তারা কোনো দলের প্রতিনিধিত্ব করবেন না। এখানে কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটেছে।
‘‘ এটা মাঝেমধ্যে সমাজকে উদ্বিগ্ন করে।”
এ বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে জামায়াতের নায়েবে আমির তাহের সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘দেশের সার্বিক বিষয়াদি নিয়ে আলাপ করতে আমরা প্রধান উপদেষ্টার সাথে দেখা করতে এসেছি।’’
এর আগে রাত পৌনে ৮টায় খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের বিএনপির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা।
জামায়াতের পর রাতেই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে বসেন প্রধান উপদেষ্টা।
ডিসেম্বরের মধ্যে সংসদ নির্বাচন নিয়ে সেনাপ্রধানের বক্তব্য, বিভিন্ন বিষয়ে তার সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের মতভিন্নতা; সেই সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার ‘পদত্যাগের ভাবনা’– সব কিছু মিলিয়ে রাজনীতিতে তৈরি হওয়া অস্থিরতার মধ্যে এসব বৈঠক করছেন অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান।
এ দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ধারাবাহিকতায় রোববারও কয়েকটি দলের সঙ্গে বসবেন তিনি।
জাতীয় নির্বাচন, রাষ্ট্র সংস্কার ও জুলাই ঘোষণা, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করাসহ বেশ কিছু বিষয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে অভ্যুত্থানের পক্ষের দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য চলছিল।
তার আগে ‘মব’ সৃষ্টি করে বাড়িঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ডাকাতির মত ঘটনাতেও সরকার সমালোচিত হয়েছে।
দাবি আদায়ের মিছিলগুলো দিনে দিনে যমুনায় সরকারপ্রধানের বাসভবনের দরজায় কড়া নাড়ছিল। যমুনার সীমানা দেয়ালের কাছাকাছি স্থানে সভা-সমাবেশের নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ চলেছে দিনরাত।
এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার ইউনূসের ‘পদত্যাগের ভাবনা’ সামনে এলে রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিরোধ আরও প্রকট হয়ে ওঠে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ তোলেন, দেশে আরেকটি এক-এগারোর পাঁয়তারা চলছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে ইশরাক হোসনেকে শপথ পড়ানোর দাবিকে ঘিরে আন্দোলনের মধ্যে সরকারের তিন উপদেষ্টা- ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, সালেহউদ্দিন আহমেদ ও আসিফ নজরুলের পদত্যাগের দাবি তোলে এনসিপি।
অন্যদিকে দুই উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলমের পাশাপাশি ইউনূসের নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি তোলে বিএনপি।
জুলাই আন্দোলনের ‘প্রধান শরিকদের’ এমন বিরোধের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে ডাকলেন প্রধান উপদেষ্টা।
আরও পড়ুন
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বিএনপি
সর্বদলীয় বৈঠক ডাকতে প্রধান উপদেষ্টাকে আহ্বান জামায়াতের
আরেকটা এক-এগারোর 'পাঁয়তারা চলছে': নাহিদ
রাতে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে বসছেন প্রধান উপদেষ্টা
ইউনূসের পদত্যাগের গুঞ্জন: কী ছিল তৈয়্যবের ফেইসবুক
পোস্টে
পদত্যাগের কথা 'ভাবছেন' ইউনূস: নাহিদ
গুজবে বিভ্রান্ত না হতে সেনাবাহিনীর আহ্বান
গুঞ্জনের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে নাহিদের আধা ঘণ্টার
সাক্ষাৎ