Published : 17 Jun 2026, 07:20 PM
‘সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না’ বলে যারা হুমকি দিচ্ছে, তারা নিজেদের স্বার্থে কথা বলছে তুলে ধরে জনগণকে তাদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার বিকালে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, বিএনপি আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করবে, জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে বিএনপি তার দেওয়া, জনগণকে দেওয়া সকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে কাজ করবে।
“তাহলে আমরা প্রশ্ন, জনগণের রায়ের বিরুদ্ধে যারা কথা বলে…জনগণ বিএনপিকে টাইম দিয়েছে পাঁচ বছর। যারা বলে বিএনপিকে সময় দেওয়া যাবে না। তাদের বিরুদ্ধে তাহলে কী করা উচিত? তাদের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে।”

তিনি বলেন, “মনে আছে তো, এখানে অনেক মুরুব্বী আছেন। মনে আছে তো একাত্তরে কী করেছিল? মনে আছে তো ৮৬ তে কী করেছিল? মনে আছে তো, এর মধ্যে এক যুগ যে আন্দোলন চলেছিল, সেই আন্দোলনের তাদেরকে কোথাও আমরা কিন্তু দেখি নাই।”
চার দিন শনিবার চট্টগ্রামে এক সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান রাষ্ট্র সংস্কারে গণভোটের রায় কার্যকর করার দাবি তোলেন।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ওই সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেছিলেন, “দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে আপনারা অপমান অগ্রাহ্য করছেন। জনগণ বসে বসে আঙ্গুল চুষবে না। রায় দিয়েছে জনগণ, মানতে হবে সরকারকে। যে সরকার জনরায় মানে না, সে সরকার জনগণের সরকার হতে পারে না।”
জনরায় উপেক্ষা করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না বলেও হুঁশিয়ার করেন তিনি।
দেশ এবং জনগণের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা চাই না একটার পর একটা গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশ এবং জনগণের ক্ষতি আপনারা করুন। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, আমরা দীর্ঘকাল বসে বসে আপনাদেরকে এই সুযোগ দেব না। সুযোগের সময় খুবই সীমিত। সময় ফুরিয়ে আসছে।
“এই সময়ের ভিতরে যদি পরিবর্তন হয়ে যান আপনাদেরকে অভিনন্দন জানাব। যদি পরিবর্তন না হন, তাহলে আপনাদেরকে আপনাদের পরিণতি গোনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”
মৌলভীবাজারের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতার এই হুঁশিয়ারির বিষয়টি তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “অতীতে যেমন আমরা দেখেছি, বলেছিল বিএনপিকে এক মুহূর্ত শান্তিতে থাকতে দেওয়া যাবে না, আজকে আবার দেখছি বিএনপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে যারা একত্রিত হয়ে আন্দোলন আন্দোলন খেলা খেলেছিল, বিএনপির বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে যারা আন্দোলন আন্দোলন ষড়যন্ত্র করেছিল গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, মানুষের ভোটের অধিকারের বিরুদ্ধে, সেই তারা এখন আবার বলছে সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না।”
বর্তমান সরকার চার কোটি পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড, প্রায় ৩ কোটি কৃষকের কাছে কৃষক কার্ড, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীর কাছে পোশাক, ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি তুলে ধরেন সরকারপ্রধান।
বাজেট উপস্থাপনের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাজেটে ৬০ পণ্যের ওপর থেকে কর বলতে গেলে তুলে নিয়েছে, যাতে জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যারা বলে সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না, তারা কী জনগণের পক্ষে কথা বলে, না বিপক্ষে কথা বলে? বিপক্ষে কথা বলে।

“যারা বলে সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না, তারা কী জনগণের স্বার্থে কথা বলে, নাকি নিজেদের স্বার্থে কথা বলছে। তারা নিজেদের স্বার্থে কথা বলছে।”
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “আজকে যদি শহীদদের তালিকা বের করা হয়, দেখা যাবে যে ছাত্রটি মারা গিয়েছে ছাত্রদলের কর্মী, যে ছাত্রটি গুম হয়েছে ছাত্রদলের কর্মী, যে যুবকটি মারা গিয়েছে যুবদলের কর্মী, যে যুবকটি গুম হয়েছে যুবদলের কর্মী। যেই মানুষটি বিনা কারণে জেলে খেটেছে, খুঁজলে দেখা যাবে সে বিএনপির কর্মী। যে মানুষ মিথ্যা মামলা মাথায় করে বয়ে বেড়িয়েছে বছরের পর বছর, খোঁজ করলে দেখা যাবে শহীদ জিয়া, খালেদা জিয়ার কর্মী।”
১২ ফেব্রুয়ারি এয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রতি জনগণের রায়ের কথা তুলে ধরে দলে চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, “মানুষ বিএনপিকে বলেছে, তোমরা দেশকে গড়ে তোলো, মানুষ বিএনপিকে বলে দিয়েছে, আগামী পাঁচ বছর তোমাদেরকে সময় দিলাম, দেশকে ঠিক করো তোমরা। স্বৈরাচার দেশকে খালি করে রেখে চলে গিয়েছিল।”
প্রশ্নের জবাব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যারা বিএনপিকে সময় দিতে চায় না, তারা বলে ফ্যামিলি কার্ড কোত্থেকে করবা? টাকা পাবা কই? পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই, বিগত এক যুগ আমরা দেখেছি, সারা পৃথিবী দেখেছে, সারা পৃথিবী সাক্ষ্য দিয়েছে কীভাবে এদেশের অর্থ পাচার হয়ে গিয়েছিল। এখন থেকে বাংলাদেশের মানুষকে সাথে নিয়ে সেই পাচার আমরা রুখে দেব।
“এই দেশের মানুষের অর্থ, এই দেশের মানুষের সম্পদ দেশেই থাকবে…কোথাও যেতে পারবে না। এদেশের মানুষের অর্থ এই দেশের মানুষের সম্পদ, এদেশের মানুষের ভালোর জন্য ব্যবহার হবে। যারা বলে টাকা কোথা পাবা, তাদের কাছে এই হচ্ছে আমার জবাব। তাদের উদ্দেশে একটাই কথা বলতে চাই, মানুষকে নিয়ে চিন্তা করুন, মানুষকে নিয়ে কাজ করার চিন্তা করুন, দেখবেন উপায় বের হবে।”

‘সামনে সময় কাজ করার’
সরকারপ্রধান বলেন, “সামনের সময় হচ্ছে কাজ করার, সামনে সময় হচ্ছে দেশ গড়ার,সামনের সময় হচ্ছে দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন করার।
“আজকে দেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত…এই ৪০ কোটি হাত যদি অবশ হয়ে পড়ে থাকে, অলস হয়ে পড়ে থাকে তাহলে দেশের ভাগ্যের পরিবর্তন করা যাবে না।”
জনগণই দেশ স্বাধীন করছিল, এ কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “এদেশকে যদি সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, এদেশকে যদি গড়ে তুলতে হয় তাহলে সকলে আমাদেরকে হাতে হাত মিলে এক সাথে কাজ করতে হবে।”
দেশ গঠন ও দেশের মানুষকে ঘিরে যাতে আগামী দিনের রাজনীতি, প্রত্যাশা ও কর্ম পরিকল্পনা হবে, বলেন তিনি।
মৌলভীবাজারে সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত এম সাইফুর রহমান উন্নয়নের কর্মকান্ডের কথা স্মরণ করে গত এক যুগেরও বেশি সময় এই জেলায় উন্নয়ন না হওয়ার কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী।
সমাজ কল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারহানা শারমিন, জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউস, মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান। কেরাণীগঞ্জ থেকে অনলাইনে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
মৌলভীবাজারের অনুষ্ঠান শেষ করে সাড়ে ৫টার দিকে সিলেটের উদ্দেশ্যে সড়ক পথে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী।
আর আগে প্রধানমন্ত্রী বিকাল ৩টার দিকে শ্রীমঙ্গল থেকে মৌলভীবাজার পৌঁছান।

অনুষ্ঠানে তিনি কম্পিউটারে বাটন চেপে মৌলভীবাজারের ১৯ ওয়ার্ড এবং আরও ২১ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় তৃতীয় পর্যায়ে নারীদের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের কর্মসূচি একযোগে উদ্বোধন করেন।
সরকারপ্রধান সেখানে ১০ নারীর নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিয়ে মৌলভীবাজার জেলার প্রান্তিক নারীদের মধ্যে এই কার্ড বিতরণ কর্মসূচির সূচনা করেন।
ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের আগে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে একটি আম ও নিম গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে চা-শ্রমিকের আবাসন এবং তাদের সন্তানদের বৃত্তি প্রদানসহ দুঃস্থ-অসহায়, প্রতিবন্ধি, প্রন্তিক মানুষের মধ্যে এককালীন আর্থিক অনুদানের চেক প্রদান করেন তারেক রহমান।
এর আগে শ্রীমঙ্গলে ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শ্রীমঙ্গল উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১৫৫টি পরিবারের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন তিনি। বিদ্যালয়ের মাঠে তিনি জাম ও কৃষচূড়া গাছের চারা রোপণ করেন।