Published : 17 Aug 2024, 04:52 PM
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে ১৪ দলের মধ্যে যেটুকু ‘গোলমাল’ তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে শিগগিরই বৈঠকের কথা জানিয়েছেন জোটের সমন্বয়ক, আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু।
ঈদুল আজহার আগেই সেই বৈঠক হবে জানিয়ে তিনি বলেছেন, “আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, ১৪ দল সাম্প্রদায়িক শক্তি ও আন্তর্জাতিক বলয়ের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি আদর্শিক জোট। এটা কোনো চাওয়া-পাওয়ার জোট নয়। সেই আদর্শের জোট হিসেবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছি।
“গত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিজেদের মধ্যে যেটুকু গোলমাল, তা নিরসন করার জন্য শিগগিরই আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হবে। সেগুলো নিরসন করে ঈদের পর থেকে আমরা ইতিবাচক কর্মসূচি গ্রহণ করব। তার মাধ্যমে এগিয়ে যাব।”
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের টানা চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মত মঙ্গলবার ১৪ দলের নেতাদের নিয়ে বৈঠকে করেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, জোটের সমন্বয়ক আমু।
রাজধানীর ইস্কাটনে নিজ বাসায় ওই বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্যে ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট গঠিত হয়। ২০০৮ সাল থেকেই ১৪ দল ও আওয়ামী লীগ জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করে আসছে।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জোট শরিকদের ১৬টি আসনে ছাড় দিলেও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তা কমিয়ে সাতটি করা হয়। তার আগে আসন বণ্টন নিয়ে ব্যাপক আলোচনাও চলছিল। তবে শেষমেষ সাতটি আসনে ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ তিনটি করে এবং জাতীয় পার্টি-জেপি একটি আসনে আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা নিয়ে নির্বাচন করে।
ওই নির্বাচনে ২২৫টি আসনে জয় পেয়ে টানা চতুর্থবারের মত সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। তবে চৌদ্দ দলের শরিকরা জয় পান কেবল দুটি আসনে। জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশার মত নেতা হেরে যান।
৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে চৌদ্দ দলীয় জোটের ‘কোনো কার্যক্রম চোখে না পড়ায়’ গত ২ মে আওয়ামী লীগ সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক বলেন, “নির্বাচনের পর চৌদ্দ দলীয় জোটের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ছে না । এমন কি অনেকে বলছেন, চৌদ্দ দল থাকবে না…।”
ওই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “চৌদ্দ দল তো অবশ্যই আছে। থাকবে না কেন? তাদের সাথে আমাদের সবসময়ই যোগাযোগ আছে। যোগাযোগ নেই তা তো না।
“এখন দু-চারজন বিক্ষিপ্তভাবে কী বলছে আমি জানি না। আমাদের যিনি সমন্বয় করেন, আমির হোসেন আমু সাহেবের ওপর দায়িত্ব দেওয়া আছে দলের পক্ষ থেকে। তিনি যোগাযোগ রাখেন।”
এর মাসখানেক পর জোটের নেতাদের নিয়ে বসলেন আমির হোসেন আমু।
চৌদ্দ দলীয় জোট কোনো ‘চাওয়া-পাওয়ার জোট নয়’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “জোটের সমস্যা সমাধানে ঈদের আগে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হবে। ১৪ দল ঐক্যবদ্ধ থাকবে এবং ঈদের পর জোটগতভাবে ইতিবাচক কর্মসূচি দেওয়া হবে।”
আমু বলেন, “দেশি ও বিদেশি ষড়যন্ত্র ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করার জন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দল আছে, থাকবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করবে। কারণ, আমরা মনে করি আদর্শিক যে সংঘাত, সেই সংঘাতের শক্তিরা শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে চক্রান্তে লিপ্ত, সেটা মোকাবিলা করা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।
“আপনারা (সাংবাদিক) স্থির থাকতে পারেন, ১৪ দল ছিল, আছে এবং থাকবে। যে শক্তির বিরুদ্ধে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল, সেই শক্তি এখনও তৎপর, ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকা উচিত এবং থাকব।”
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাতীয় পার্টি-জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার, তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেন, বাসদের আহবায়ক রেজাউর রশিদ, গণ আজাদী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট এস কে সিকদার, ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী ফারুক, আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
‘বেনজীরের বিষয়ে আমরা বিব্রত না’
পুলিশের সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আমির হোসেন আমু বলেন, এ বিষয়ে জোটগতভাবে কোনো মন্তব্য করার প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন না।
তিনি বলেন, “তার বিরুদ্ধে সরকার তৎপর। এই ব্যাপারে আমাদের বক্তব্যের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। এটা রাজনৈতিক ব্যাপার না।”
দায়িত্বে থাকাকালীন এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত বড় দুর্নীতির অভিযোগ কীভাবে দেখেন- এমন প্রশ্নে আমু বলেন, “দুর্নীতির অভিযোগ সরকার গঠন করবে, সরকার প্রমাণ করবে। থাকলে প্রমাণ হবে, শাস্তি হবে। জোটগতভাবে আমাদের কোনো মন্তব্য আছে বলে মনে করি না।”
‘আপনারা বিব্রত কিনা’- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমরা বিব্রত না। কারণ মানুষের জীবনে অনেক কিছু ঘটে, দেশের মধ্যে অনেক কিছু ঘটে। ব্যক্তিগতভাবে কেউ দুর্নীতি করে ধরা পড়লে, তার জন্য আমাদের বিব্রত হওয়ার কারণ নেই। যারা দোষী, ধরা পড়বে, শাস্তি পাবে। তার জন্য আমরা বিব্রত হব কেন?”
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, “দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবসময় ১৪ দল অবস্থান নিয়েছে। এবারও যে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান সুস্পষ্ট।
“এই দুর্নীতি রোধ করতে না পারলে সরকারের যে অর্জন রয়েছে, তা ক্ষুণ্ন হবে। সেটা বেনজীর হোক, আজিজ হোক।”
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির নিয়ে আমির হোসেন আমু বলেন, “সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, সিন্ডিকেট আছে। যদি সিন্ডিকেট থেকে থাকে এবং সরকারের জানা থাকে, তাদের বিষয়ে সরকারের সক্রিয় ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। যাতে করে দ্রব্যমূল্য নিয়ে জনগণ যে অসুবিধায় আছে, তার সুরাহা হয়, তার জোর দাবি জানাচ্ছি।”