Published : 05 Jan 2026, 10:53 AM
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গাজীপুর-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী ও তার স্ত্রী স্বতন্ত্র প্রার্থী উভয়েই নির্বাচনি হলফনামায় সম্পদের বিবরণী দিয়েছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, তারা যে সম্পদের পরিমাণ বর্ণনা করেছেন; তার চেয়ে তিন গুণের বেশি তাদের ব্যাংক ঋণ রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম মঞ্জুরুল করিম রনি এবং তার স্ত্রী স্বতন্ত্র প্রার্থী তাপসী তন্ময় চৌধুরীর মোট ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪০ কোটি টাকা। তবে একই সঙ্গে তাদের নামে রয়েছে প্রায় ১৪০ কোটি টাকার বেশি ঋণ।
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে এসব হলফনামা সোমবার রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হয়।
হলফনামা অনুযায়ী, এম মঞ্জুরুল করিম রনির মোট সম্পদের পরিমাণ ৩৮ কোটি ২৯ লাখ ৭৯ হাজার ৬০৬ টাকা। তার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে নয় লাখ ৪১ হাজার ২৭৫ টাকা।
অন্যদিকে, তাপসী তন্ময় চৌধুরীর ঘোষিত সম্পদ এক কোটি ৯৬ লাখ আট হাজার ৭৮৪ টাকা এবং তার বার্ষিক আয় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
হলফনামায় বলা হয়েছে, এম মঞ্জুরুল করিম রনি তার মালিকানাধীন এভালন এভিয়েশন লিমিটেড ও ফস্টার ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে মোট প্রায় ১৪০ কোটি ২৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এই ঋণ গত ১০ ডিসেম্বর পুনঃতফসিল করা হয়েছে।
তবে তাপসী তন্ময় চৌধুরীর নামে কোনো ঋণের তথ্য হলফনামায় উল্লেখ নেই।
হলফনামা অনুযায়ী, মঞ্জুরুল করিম রনির কাছে নগদ রয়েছে ২৩ কোটি ৪৯ লাখ ১০ হাজার ৫০৮ টাকা, অথচ ব্যাংকে জমা রয়েছে মাত্র ৮০ হাজার ৬৬১ টাকা।
এ ছাড়া তার সাতটি কোম্পানিতে মোট পাঁচ লাখ ৫০০টি শেয়ার রয়েছে, যার মূল্য দেখানো হয়েছে পাঁচ কোটি ৫০ হাজার টাকা। আসবাবপত্রের মূল্য দেখানো হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ইলেকট্রনিক পণ্যের মূল্য ৫০ হাজার টাকা। ৩০ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের একটি গাড়ি রয়েছে।
হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, তার স্ত্রীর কাছে নগদ রয়েছে ২৫ লাখ ৪০ হাজার ৬২১ টাকা এবং ব্যাংকে জমা আছে আট হাজার ১৬৩ টাকা। তার স্ত্রীর নামে পাঁচটি কোম্পানিতে মোট এক লাখ ৩৩ হাজারটি শেয়ার রয়েছে। এসবের মূল্য দেখানো হয়েছে মোট এক কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
স্বর্ণালংকার আছে এক লাখ টাকার। এ ছাড়া আসবাবপত্র আছে এক লাখ টাকার এবং ৩১ লাখ টাকা মূল্যের একটি গাড়ি রয়েছে।
হলফনামায় দেখা যায়, মঞ্জুরুল করিম রনির কোনো কৃষিজমি নেই। তবে গাজীপুরের সালনা এলাকায় তার ৪৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ অকৃষিজমি রয়েছে, যার বাজারমূল্য দেখানো হয়েছে ৬৬ কোটি ৬২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, তার স্ত্রীর নামে রয়েছে ৩০ দশমিক ৩৭৫ শতাংশ কৃষিজমি, যার মূল্য দেখানো হয়েছে চার লাখ ৬০ হাজার টাকা।
হলফনামা অনুযায়ী, মঞ্জুরুল করিম রনির বিরুদ্ধে বর্তমানে নয়টি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে দুটি চেক ডিজঅনারকে (চেক প্রত্যাখ্যান) কেন্দ্র করে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট (এনআই) অ্যাক্টের অধীনে এবং একটি অর্থ ঋণ আইনের মামলা।
এ ছাড়া অতীতে তার বিরুদ্ধে আরও ১২টি মামলা ছিল। সেগুলো ২০২৫ সালে নিষ্পত্তি হয়েছে।
তার স্ত্রী তাপসী তন্ময় চৌধুরীর বিরুদ্ধে বর্তমানে পাঁচটি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে দুটি এনআই অ্যাক্ট, দুটি অর্থ ঋণ আইন এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০৮ ধারার একটি মামলা আপিল বিভাগে বিচারাধীন। ২০২৫ সালে তার বিরুদ্ধে আরও দুটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে মঞ্জুরুল করিম রনি ৭৭ হাজার ৪০০ টাকা এবং তার স্ত্রী ১০ হাজার টাকা আয়কর দিয়েছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ রয়েছে।
দুজনের পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ থাকলেও ব্যবসা থেকে কোনো আয় দেখানো হয়নি।
রনির আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে বাড়ি বা সম্পত্তি ভাড়া। এতে বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে নয় লাখ ৪০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ব্যাংক সুদ থেকে আয় দেখানো হয়েছে এক হাজার ২৭৫ টাকা।
তার স্ত্রীর আয়ের উৎস দেখানো হয়েছে শুধু ব্যাংক সুদ থেকে পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
অন্যান্য খাত থেকে তাদের আর কোনো আয় দেখানো হয়নি।
মঞ্জুরুল করিম রনি তার শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য উল্লেখ করেননি। তবে তাপসী তন্ময় চৌধুরীর শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে বিকম পাশ উল্লেখ করা হয়েছে।
৪১ বছর বয়সী রনি এবং ৪৫ বছর বয়সী তাপসী তন্ময় এই প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
তাদের স্থায়ী ঠিকানা গাজীপুর সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ সালনা এলাকায় হলেও বর্তমান ঠিকানা হিসেবে বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১১ নম্বর রোডের ৮১/ক নম্বর বাড়ির ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামার তথ্য যাচাই করা হবে। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই হলফনামাগুলো ভোটারদের সামনে প্রার্থীদের আর্থিক ও আইনগত অবস্থান স্পষ্ট করে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই আসনে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র অধ্যাপক আব্দুল মান্নানের ছেলে এম মঞ্জুরুল করিম রনি ও স্ত্রী তাপসী তন্ময় চৌধুরীসহ মোট ১৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।
সোমবার যাচাই-বাছাই শেষে তাপসীসহ আটজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। বর্তমানে রনিসহ এ আসনে বৈধপ্রার্থী সংখ্যা দশ।
বর্তমানে এ আসনে বৈধ প্রার্থী হিসেবে টিকে আছেন বিএনপি এম মঞ্জুরুল করিম রনি, জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ হোসেন আলী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হানিফ সরকার, সিপিবির মো. জিয়াউল কবির, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) মাসুদ রেজা, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের সরকার তাসলিমা আফরোজ, জাতীয় পার্টির মো. মাহবুব আলম, এবি পার্টির আব্বাস ইসলাম খান, এনসিপির আলী নাছের খান ও বাসদের মো. আব্দুল কাইয়ুম।
গাজীপুর-২ সংসদীয় আসনটি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ১৯ থেকে ৩৯ নম্বর এবং ৪৩ থেকে ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। মোট ৩৬টি ওয়ার্ডের পাশাপাশি এ আসনের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট এলাকা।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৮ লাখ ৪ হাজার ৩৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৪ লাখ ৪০১ জন, নারী ভোটার ৪ লাখ ৯১৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১৩ জন।
গাজীপুর-২ আসনে মোট ভোটকেন্দ্র রয়েছে ২৭২টি। ভোটকক্ষের সংখ্যা ১ হাজার ৪৮৯টি, যার মধ্যে ১ হাজার ৩৯৯টি স্থায়ী এবং ৯০টি অস্থায়ী ভোটকক্ষ।
আরও পড়ুন: