Published : 20 May 2026, 02:11 AM
চব্বিশের আন্দোলনের পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ আবার দেশের রাজনীতিতে ‘ফিরে এসেছে’ বলে মনে করছেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। এর বিভিন্ন কারণ তুলে ধরে তিনি দলটির ‘ফিরে আসার’ প্রেক্ষাপটও বর্ণনা করেছেন।
মঙ্গলবার কিছু সময়ের ব্যবধানে তিনি এ নিয়ে দুটো ফেইসবুক পোস্ট দেন। এর প্রথমটিতে তিনি লেখেন, “লীগ রাজনৈতিক দলের আগে একটা ধর্মতত্ত্ব, সে ধর্মতত্ত্বে ইমান আবার ফেরত এসেছে।”
কীভাবে ফিরল, সে ‘গল্পই’ তুলে ধরার কথা বলেন তিনি।
মাহফুজ লেখেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যে দিন থেকে ডানপন্থিদের উত্থানের জন্য অন্তরীণ সরকারের লোকজন কাজ করা শুরু করেসে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন আইনের শাসনের বদলে মবের শাসনে আনন্দ পেয়েছিল গত ১৭ বছরের ‘মজলুমগণ’।“
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া মাহফুজ এমন এক সময় এই স্ট্যাটাস দিলেন, যেদিন ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ইমেইলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা শিগগিরই দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতের দিল্লিতে অবস্থান করা শেখ হাসিনা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারে ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে যুক্ত থাকা মাহফুজ এ সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের ফেরার প্রসঙ্গ নিয়ে দীর্ঘ পোস্ট দেন।
তবে শেখ হাসিনার বিষয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসে মাহফুজ কোনো কথা অবশ্য লেখেননি।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তবর্র্তী সরকারেরও কড়া সমালোচনা করে মাহফুজ বলছেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন অন্তরীণ সরকার পলিটিকাল থেকে আমলাতান্ত্রিক হল এবং আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেট থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া শুরু হল। যে কিচেন ক্যাবিনেটের অধিকাংশ লোকই ছিল জামাত-বিএনপি বা লীগের ছুপা দালাল। যাদের কাছে জুলাই মানে ছিল। নিজেদের পরিবার, প্রজন্ম আর প্রতিষ্ঠানের স্বার্থরক্ষা।”

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অবস্থান করছেন। ২০২৫ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড হয় শেখ হাসিনার। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে দুর্নীতির একাধিক মামলাতে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়। সেই থেকে দলটি কার্যত রাজনীতির মাঠে নেই। বিভিন্ন সময় মিছিল-স্লোগানের চেষ্টা করলে গ্রেপ্তার হচ্ছেন দলটির নেতাকর্মীরা।
ফেইসবুক পোস্টে মাহফুজ লেখেন, “লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন থেকে উগ্রবাদীরা মাজারে হামলা করেছে, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দিয়েছে। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন হিন্দুদের উপর নিপীড়ন নিয়ে 'মজলুমগণ' চুপ ছিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন সেকুলার মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষজন এদেশে সরকার প্রযোজিত ডানপন্থার উত্থানে ভয় পেয়েছিল।
“লীগ সেদিনই ব্যাক করেছে, যেদিন মবস্টারদের এ দেশে হিরো বানানো হয়েছিল। উগ্রবাদীর সেফ স্পেইস দেয়া হইসিল। লীগ সেদিনই ব্যাক করেছিল, যেদিন ব্যবস্থা বিলোপের বদলে ন্যুনতম সংস্কার ও ‘ঐকমত্য কমিশন’ নাম দিয়ে জনগণকে বিচ্ছিন্ন এবং হতাশ করা হল।”
আওয়ামী লীগ সেদিনই ‘ব্যাক’ করেছিল, যে দিন ছাত্ররা বিপ্লবী সংগঠনে রূপ না নিয়ে ‘লুম্পেন চরিত্রের ক্লাব’ আর মবে রূপ নিয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন মাহফুজ।
সব শেষে মাহফুজ লেখেন, “লীগ ফিরত আসবে। কারণ, সব দোষ মাহফুজ আলমের। প্রচারে- নিখিল বাংলাদেশের চিরকাল মজলুম-ডানপন্থী বলয়, অন্তরীণ কিচেনের দালাল-সুবিধাভোগী গুপ্ত বলয়, এবং দিস এন্ড দোস বটফোর্সেস, সিন্ডিকেট আর গং মানে গয়রহ।”
এ দিকে তার এ স্ট্যাটাসের পর ফেসবুকে বিভিন্ন আলোচনা শুরু হলে আরেকটি পাল্টা স্ট্যাটাস দেন তিনি। সেখানে মাহফুজ লেখেন, “যারা আগের পোস্টকে পর্যালোচনা হিসাবে পাঠ করেছেন, তাঁদের জন্য বলছি। আমাদের এখনকার কাজ হল- সকল নিপীড়নের বিরুদ্ধে, নিপীড়িতের পক্ষে থাকা। দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের মানবাধিকারের পক্ষে থাকা।
“হঠকারী, উগ্রবাদী এবং অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতিকে পরাস্ত করা। সংখ্যালঘু ও মাজারপন্থিদের উপর হামলার বিচার করার দাবি অব্যাহত রাখা। জুলাই গণহত্যার বিচারের দাবিকে প্রধান করে তোলা এবং বিচারের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে থাকা। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে বর্তমান সরকারকে বাধ্য করা।
“বাংলার বহু ভাষা-সংস্কৃতিকে যাপন-উদযাপন করা এবং রিগ্রেসিভ-ডিফিটিস্ট কালচারাল লড়াইকে জায়গা না দেয়া। কালচারালি-ইন্টেলেকচুয়ালি যারা বিভিন্ন বর্গ থেকে জুলাইয়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদেরকে ঔন করা। লীগের ফ্যাসিস্টদের লক্ষ্যবস্তু এরাই।”
যে যার জায়গা থেকে সক্ষম, যতবেশি সম্ভব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি। একইসঙ্গে জুলাইয়ের পক্ষের সব শক্তির মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের একটি কমন স্পেইস/ল্যাঙ্গুয়েজ তৈরির আহ্বান করেন তিনি।