২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯ আশ্বিন ১৪৩৩

সাইবার নিরাপত্তার নামে ক্ষমতা কায়েমের আইনি ফাঁদ

আইন তো শাসকের লাঠি হতে পারে না; আইন হলো সাধারণ মানুষের সুরক্ষার ঢাল। সাইবার স্পেস নিরাপদ করার অর্থ মানুষের গলায় ফাঁস দেওয়া নয়।

সাইবার নিরাপত্তার নামে ক্ষমতা কায়েমের আইনি ফাঁদ

নিরাপত্তা মানে সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করা নয়, তাদের মুক্তভাবে কথা বলার অধিকার দেওয়া।

পারভেজ আলম পারভেজ আলম

Published : 24 Sep 2026, 05:50 AM

Updated : 24 Sep 2026, 05:50 AM

আইনের মূল কাজ নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া, শাসকের হাত শক্তিশালী করা নয়। কিন্তু আমাদের দেশে সাইবার আইনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ঠিক বিপরীত আর করুণ এক চিত্রই ফুটে ওঠে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে শুরু করে সাইবার নিরাপত্তা আইন, নাম যতবারই বদলানো হোক না কেন, মানুষকে চুপ করিয়ে রাখার আসল চেহারাটা কিন্তু একই থেকে গেছে। যখনই কেউ মুক্ত মনে চিন্তা করেছে, সরকারের ভুল পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলেছে, তখনই তার মুখে লাগাম টানতে তৈরি করা হয়েছে একেকটা আইনি ফাঁদ।

২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ আর ২০২৬ সালের আইনি সংশোধনীর পর আমাদের মনে একটা আশা জেগেছিল। ভেবেছিলাম, এবার হয়তো মানুষ তার স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ পাবে, মৌলিক অধিকারগুলো অন্তত স্বীকৃতি পাবে। কিন্তু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রস্তাবিত খসড়াটি আমাদের ভীষণভাবে হতাশ করেছে। এই নতুন খসড়া স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ক্ষমতার চেয়ারে থাকা মুখ বদলালেও স্বাধীন মতামতকে ভয় পাওয়ার ওই পুরোনো শাসনতান্ত্রিক মানসিকতা একটুও বদলায়নি। 

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এমন কিছু বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীন চিন্তার পরিপন্থি। ‘ডিজিটাল মানহানি’, ‘অপমান’ বা ‘বুলিং’-এর কথা বলা হয়েছে খুব ধোঁয়াশা আর অস্পষ্টভাবে। এর ফলে সরকারের কোনো অনিয়ম বা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে কথা বললেও তাকে অনায়াসে ‘মানহানি’ বা ‘অপমান’ বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে। কোনো সত্যি খবর প্রকাশ করার পর কেউ যদি মন খারাপ করে বা সামাজিক মর্যাদা কমে যায়, তবে সেটিকেই অপরাধ বানিয়ে দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এটি আসলে কোনো আইন নয়, মুক্তকণ্ঠ স্তব্ধ করার একটি অস্ত্র।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো ‘ভুল তথ্য’ বা ‘গুজব’ ছড়ানোর নাম করে রাখা শাস্তির ধারায়। এর জন্য ১০ বছরের জেল আর ৪০ লাখ টাকা জরিমানের প্রস্তাব করা হয়েছে! ভেবে দেখুন, একটা সামান্য ভুল তথ্যের সাজা বানানো হয়েছে সাইবার সন্ত্রাসবাদের সাজার সমান, এমনকি রাষ্ট্রীয় তথ্য হ্যাক করার চেয়েও বড় অপরাধ! 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আইসিএনএল বলেছে যে, কোনো স্পষ্ট অপরাধমূলক উদ্দেশ্য বা প্রত্যক্ষ ক্ষতি ছাড়া কেবল অনুমানের ওপর ভর করে এত বড় কারাদণ্ড প্রদান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সমআনুপাতিকতার ধারণার পুরোপুরি লঙ্ঘন। স্রেফ সরকারের ‘আশঙ্কা’ বা ‘ধারণা’-এর ওপর ভিত্তি করে কাউকে ১০ বছর জেলে পুরে রাখা কোনো গণতান্ত্রিক দেশে চলতে পারে না। এটি সাংবাদিক আর সচেতন নাগরিকদের মতামত প্রকাশকে স্তব্ধ করে দেওয়ারই নামান্তর।

অনলাইনে কোন লেখা বা তথ্য থাকবে আর কোনটা থাকবে না, তা ঠিক করার যে একচ্ছত্র ক্ষমতা সরকারের হাতে দেওয়া হচ্ছে, তা মুক্তচিন্তার ওপর বড় আঘাত। আগের আইনে অন্তত পুলিশ বিচার বিশ্লেষণ করে বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারত। কিন্তু নতুন খসড়ায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বা যে কোনো সরকারি সংস্থাই সরাসরি যে কোনো অনলাইন কনটেন্ট সরিয়ে ফেলতে পারবে। সবচেয়ে ভয়ের কথা হলো, কোনো অপরাধ না হলেও কেবল সরকারের ‘সন্দেহ’ হলেই যে কোনো পোস্ট বা খবর উধাও করে দেওয়া যাবে। আর কাকে আটকানো হলো বা কোন খবর মুছে দেওয়া হলো, তার কোনো তালিকা প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়নি। অর্থাৎ সরকার গোপনে কাদের মুখ বন্ধ করছে, সাধারণ মানুষ তা টেরও পাবে না।

এই আইনে পুলিশকে দেওয়া গ্রেফতারের ক্ষমতাটা সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ভীতিকর। প্রস্তাবিত ৪৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো বিচারকের পরোয়ানা ছাড়াই পুলিশ কেবল সন্দেহের বশে যে কোনো নাগরিককে গ্রেফতার করতে পারবে। পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার তো আমাদের আর অজানা নয়; বিগত বছরগুলোতে এর অসংখ্য করুণ অভিজ্ঞতা আমরা দেখেছি। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তির যদি মনে হয় একটা ফেইসবুক পোস্ট তার জন্য অপমানজনক, তবেই সঙ্গে সঙ্গে জেল খাটতে হবে। আগাম কোনো বিচারিক নজরদারি ছাড়া পুলিশের হাতে এমন ক্ষমতা তুলে দেওয়ার অর্থ হলো, অন্ধের হাতে বন্ধুক তুলে দেওয়ার সমান।

শুধু ব্যক্তি নাগরিকই নন, নতুন প্রস্তাবনায় স্বাধীন গণমাধ্যম আর সামাজিক সংগঠনগুলোর অস্তিত্বকেও চরম ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে। খসড়ার ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো পত্রিকার একজন সংবাদকর্মীও যদি এই আইনে অভিযুক্ত হন, তবে পুরো প্রতিষ্ঠানের মালিক, সম্পাদক ও পরিচালকদের আসামি করা যাবে। এমনকি আদালত চাইলে ওই পত্রিকার লাইসেন্স বাতিল করে দিতে পারবে! কোনো সাংবাদিক যদি সরকারের কোনো দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন, তার জেরে কি পুরো পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হবে? এটি কি স্বাধীন গণমাধ্যম ব্যবস্থা বা নাগরিক সমাজের ওপর সরাসরি এক আঘাত নয়?

এর ওপর বিচারিক এখতিয়ারকে মোবাইল কোর্ট ও সাইবার ট্রাইব্যুনালের মধ্যে ভাগ করে বিচারিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয়েছে। অপমান, বুলিং বা মানহানিকর কনটেন্টের বিচার মোবাইল কোর্টের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কিন্তু ভুক্তভোগী নারী বা শিশু হলে তা সাইবার ট্রাইব্যুনাল বিচার করবে। অন্যদিকে গুজব, ফেইক নিউজ বা হ্যাকিংয়ের বিচার করবে সাইবার ট্রাইব্যুনাল। আইসিএনএল-এর মতে, একই অপরাধের জন্য যোগাযোগের মাধ্যমভেদে আলাদা সাজা বা বিচারিক প্রক্রিয়ার এই ব্যবহার চরম বৈষম্য তৈরি করবে।

সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, এত বড় একটা আইন সংশোধনের প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষকে পুরোপুরি অন্ধকারে রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী যে কোনো আইন করার আগে দেশের মানুষের মতামত নেওয়ার সুযোগ দিতে হয়। অথচ এত জটিল আর গুরুত্বপূর্ণ একটা আইনের ওপর মতামত দেওয়ার জন্য মাত্র ১০ দিন সময় দেওয়া হলো, তা-ও শুধু লিখিতভাবে! সাধারণ মানুষ কিংবা মাঠপর্যায়ের সংগঠনগুলোর পক্ষে এত কম সময়ে কীভাবে মতামত পাঠানো সম্ভব? এটা স্পষ্টতই এক লোকদেখানো প্রক্রিয়া, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে এড়িয়ে প্রশাসনিক দাপট বজায় রাখা।

আজকের এই প্রযুক্তির যুগে ইন্টারনেটে নানা ধরনের অপরাধ বাড়ছে, এটা সত্যি। অনলাইনে টাকা মেরে দেওয়া, সেক্সটোরশন, পর্নোগ্রাফি বা এআই দিয়ে নারীদের ছবি বিকৃত করে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা প্রতিরোধ করা অত্যন্ত জরুরি। রাষ্ট্র অবশ্যই সাইবার অপরাধীদের ধরে শাস্তি দেবে, মানুষ সেটা চায়। কিন্তু অপরাধী ধরা আর সরকারের সমালোচনা বন্ধ করা তো এক কথা নয়! সরকার যদি সত্যি সাধারণ মানুষকে ব্ল্যাকমেইলিং বা প্রতারণা থেকে বাঁচাতে চায়, তবে হ্যাকারদের পেছনে লাগুক। আইনের নামে সরকার আসলে অপরাধী ধরার বাহানায় নিজের রাজনৈতিক সমালোচনা বন্ধ করার ফাঁদ তৈরি করছে। 

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শালীনতা ফেরাতে আর নারী-যুবসমাজকে রক্ষা করতেই নাকি এই পরিবর্তন। আমরা পরিষ্কার বলতে চাই, সরকারের বেঁধে দেওয়া ‘শালীনতার’ সংজ্ঞায় নাগরিকের মুখ বন্ধ করা যাবে না। সরকারের ভুল নিয়ে কথা বলা কি অশালীনতা? কর্তাব্যক্তিদের দুর্নীতি ফাঁস করা কি ভুল খবর? বাকস্বাধীনতা হলো সংবিধানে স্বীকৃত আমাদের অধিকার, এটা কোনো সরকারের দেওয়া দান বা দয়া নয়।

একজন সাধারণ নাগরিক যখন সরকারের ভুল নীতি নিয়ে লেখেন, একজন অর্থনীতিবিদ যখন প্রবৃদ্ধির সরকারি দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কিংবা একজন সাংবাদিক যখন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, তখন তা ‘গুজব’ বা ‘মানহানি’ হতে পারে না; তা হলো সমাজ ও জনস্বার্থের সেবা। প্রস্তাবিত সংশোধনীটি আসলে ওই সেবা বন্ধের কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। যদি সত্যিই নিরাপদ ডিজিটাল সমাজ গড়তে হয়, তবে আসল অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা হোক। সাইবার নিরাপত্তার নামে মুক্তচিন্তা ও মুক্ত সাংবাদিকতার ওপর চাপানো এই ফাঁস অবিলম্বে পরিবর্তন করা উচিত।  

আইন তো শাসকের লাঠি হতে পারে না; আইন হলো সাধারণ মানুষের সুরক্ষার ঢাল। সাইবার স্পেস নিরাপদ করার অর্থ মানুষের গলায় ফাঁস দেওয়া নয়। ভয়ের রাজ্য বানিয়ে কোনো দেশ কোনো দিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই, যেখানে সাইবার অপরাধীরা আইনকে ভয় পাবে, আর দেশের মুক্তচিন্তার মানুষগুলো কোনো ভয় ছাড়া মাথা উঁচু করে নিজের কথা বলতে পারবে।

পারভেজ আলম: মানবাধিকারকর্মী ও সাইবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষক। ই-মেইল: parvezscse@gmail.com