০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ ও আমার স্মৃতি

মুক্তিযুদ্ধের নির্মোহ ইতিহাস সংকলনে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সুদৃঢ় সম্পাদকীয় অবদানের কথা তুলে ধরেছেন শাহেদ কায়েস।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ ও আমার স্মৃতি

ইতিহাসের নির্মোহ দলিল ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ সংকলনের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান; বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা।

শাহেদ কায়েস শাহেদ কায়েস

Published : 03 Oct 2026, 04:51 PM

Updated : 03 Oct 2026, 05:04 PM

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুর খবর শুনে প্রথমেই মনে পড়ল ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’-এর কথা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম থেকে প্রকাশিত তিন খণ্ডের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস (তিন খণ্ড মিলিয়ে পৃষ্ঠাসংখ্যা প্রায় ১,৫০০) সংকলনের কাজে বারোজনের টিমে আমিও যুক্ত ছিলাম। তার কথা ভাবতে গিয়ে সেই কাজের স্মৃতিই বারবার ফিরে আসছে। একজন সম্পাদকের সঙ্গে একজন লেখকের সম্পর্ক অনেক সময় প্রকাশিত লেখার মধ্যেই সীমিত থাকে; কিন্তু আমার কাছে তার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন একটি সংকলন, যার বিষয় বাংলাদেশের জন্ম, মানুষের আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম।

আজ মনে হচ্ছে, কাজের সূত্রে তৈরি হওয়া সম্পর্কেরও গভীরতা থাকে। সেখানে প্রতিদিন দেখা হওয়া লাগে না, দীর্ঘ ব্যক্তিগত আলাপও প্রয়োজন হয় না। একটি কাজের উদ্দেশ্যকে গুরুত্ব দেওয়া, তার প্রতি দায়িত্ব অনুভব করা এবং সেই কাজের অংশ হতে পারার অভিজ্ঞতা মানুষকে কাছাকাছি আনে। ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার স্মৃতিতে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর জন্য তেমন একটি জায়গা থাকবে। তার মৃত্যুর খবর সেই স্মৃতিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সংকলনটির কথা ভাবলে এখন তার সম্পাদকীয় দায়িত্ব নেওয়ার কথাও একসঙ্গে মনে পড়বে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কাজ করার সময় তথ্যের প্রতি সতর্ক থাকা জরুরি। মানুষের আবেগের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি ঘটনার বিবরণ পাঠকের কাছে পৌঁছায় গভীর প্রত্যাশা নিয়ে। সেখানে অসতর্ক শব্দ, অসম্পূর্ণ তথ্য, একপেশে বর্ণনা পাঠের অভিজ্ঞতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আবার আবেগকে পুরোপুরি সরিয়ে রাখলেও মানুষের জীবন, ভয়, শোক ও সাহসের অনেকখানি হারিয়ে যায়। তথ্যনিষ্ঠ থেকে সেই অভিজ্ঞতা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কঠিন দায়িত্ব সম্পাদককে নিতে হয়। ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ প্রকাশের উদ্যোগে তৌফিক ইমরোজ খালিদী সেই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তিন খণ্ডের একটি ইতিহাস সংকলন প্রকাশের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দীর্ঘ কাজের দায় জড়িয়ে থাকে। লেখা একত্র করা থেকে পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মনোযোগ প্রয়োজন। এমন কাজে সম্পাদকের নিষ্ঠা সম্পর্কে ভাবতে গিয়ে আমি তার দায়িত্ববোধের কথাই অনুভব করি। মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে মানুষের স্মৃতি ও ইতিহাস পাঠের আগ্রহের জন্য জায়গা তৈরি করার গুরুত্ব তিনি অনুভব করেছিলেন। সেই উদ্যোগের অংশ হতে পেরে আমার কৃতজ্ঞতা আছে। আজ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে কৃতজ্ঞতার কথাটিও স্পষ্টভাবে বলতে চাই।

‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’-এর কথা ভাবলে আমার মনে পড়ে, কোন সময়ে তৌফিক ইমরোজ খালিদী এই সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। একটি গোষ্ঠী তখন প্রকাশ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অস্বীকার করছিল; একাত্তরের ঘটনাপ্রবাহ আড়াল করে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সমতুল্য করে উপস্থাপনের মধ্য দিয়েও মুক্তিযুদ্ধের স্বতন্ত্র চরিত্র ও গুরুত্ব মুছে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল। তখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলতেও অনেকে দ্বিধায় পড়ছিলেন। এমন অস্বস্তিকর এবং বিপর্যস্ত সময়ে মানুষ অনেক কথা নিজের মধ্যে রেখে দেয়। ইতিহাস নিয়ে আলোচনা সংকুচিত হয়, পরিচিত ঘটনা উচ্চারণেও সতর্কতা বাড়ে। সেই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের তথ্যনিষ্ঠ সংকলন প্রকাশে তার আগ্রহ ও সম্পাদকীয় দায়িত্ববোধের গুরুত্ব গভীরভাবে অনুভব করি। পাঠক যেন ঘটনার বিবরণ পড়ে নিজের চিন্তা গড়ে নিতে পারেন, সেই সুযোগ ধরে রাখা দরকার। ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার সেই দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

ইতিহাসের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কও থাকে। কারও পরিবারে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আছে, কেউ পরিবারের বড়দের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা ও তাদের অভিজ্ঞতার কথা শুনে বড় হয়েছেন। পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই বই পড়ে বাংলাদেশের জন্মের ঘটনাগুলো জানেন। তাদের হাতে কী তুলে দেওয়া হচ্ছে, সেই ভাবনা লেখক ও সম্পাদককে সতর্ক রাখে। একটি সংকলন তাই প্রকাশের পরও কাজ করতে থাকে। পাঠকের ঘরে, পড়ার টেবিলে, আলোচনায় তার সঙ্গে নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়। সেই পাঠের সম্ভাবনার সঙ্গে নিজের সামান্য কাজ যুক্ত আছে ভাবলে আমি আনন্দ পাই; আজ সেই আনন্দের সঙ্গে শোক মিশে আছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আমার আরেকটি সম্পর্ক মতামত পাতায় কলাম লেখা। নিজের ভাবনা পাঠকের সামনে রাখার জন্য এই পাতায় লিখি। আমার খুব কাছের একজন বন্ধুও সেখানে সাংবাদিকতা করেন। নিজের লেখালেখি এবং তার সঙ্গে আলাপের সুবাদে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সম্পাদকীয় অবস্থান সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়েছে। তাকে নিয়ে আমার মূল্যায়ন সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এসেছে। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অতিরঞ্জিত বর্ণনা দেওয়ার চেয়ে যতটুকু জেনেছি, যতটুকু অনুভব করেছি, তা বলাই আমার কাছে যথাযথ মনে হয়।

সাংবাদিকতা সম্পর্কে তার অবস্থান ছিল স্পষ্ট। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব খবর প্রকাশ করা, ক্ষমতায় থাকা মানুষকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা। কথাটি উচ্চারণ করা সহজ, কিন্তু প্রতিদিনের কাজে ধরে রাখা কঠিন। একটি সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে নানা মানুষের স্বার্থ, অসন্তোষ ও চাপ জড়িয়ে যেতে পারে। সম্পাদককে তখন খবরের তথ্য, পাঠকের প্রয়োজন এবং সাংবাদিকের কাজের প্রতি মনোযোগ রাখতে হয়। নিজের সুবিধার হিসাব সামনে চলে এলে সংবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার সম্পাদকীয় অবস্থান সম্পর্কে যতটুকু জেনেছি, সেখানে সংবাদকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাই আমার মনে এসেছে। সম্পাদকের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে সংবাদকে স্থান দেওয়ার বিষয়টি আমার কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদে যার প্রসঙ্গ এসেছে, তিনি পরিচিত মানুষ হতে পারেন; তার সঙ্গে সম্পাদকের দীর্ঘ সম্পর্কও থাকতে পারে। কিন্তু পাঠক খবর পড়তে বসে সেই সম্পর্কের হিসাব জানতে চান না, তিনি ঘটনার নির্ভরযোগ্য বিবরণ চান। ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার কারণে তথ্য আড়ালে থাকলে পাঠকের প্রতি দায়িত্ব অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর কাজের যে দিকগুলো শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে থাকবে, সংবাদকে এভাবে গুরুত্ব দেওয়ার অবস্থান তার মধ্যে আছে।

বার্তাকক্ষের স্বাধীনতার প্রতি তার গুরুত্ব দেওয়ার কথাও মনে পড়ছে। একজন সাংবাদিকের কাজের সঙ্গে অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট মানুষের বক্তব্য নেওয়া এবং সম্পাদনার দীর্ঘ প্রক্রিয়া যুক্ত থাকে। এই কাজ করতে গিয়ে তার পাশে সম্পাদককে পাওয়া দরকার। তথ্য সম্পর্কে কঠিন প্রশ্ন করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি যথাযথভাবে তৈরি সংবাদ প্রকাশের দায়িত্ব নেওয়াও প্রয়োজন। সম্পাদক ও সাংবাদিকের মধ্যে কাজের এই আস্থা সংবাদমাধ্যমের জন্য মূল্যবান। আমার বন্ধুর সঙ্গে আলাপের সূত্রে তার সম্পাদকীয় অবস্থান সম্পর্কে যে ধারণা পেয়েছি, সেখানে এই দিকটি গুরুত্ব পেয়েছে। মতামত পাতায় লিখতে গিয়ে আমিও সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়ে ভাবি। একজন লেখকের বক্তব্য পাঠকের কাছে পৌঁছানোর আগে তার যুক্তি, তথ্য ও শব্দের ব্যবহার নিয়ে সতর্কতা প্রয়োজন। লেখকের নিজের মত থাকে, পাঠকের কাছে সেই মত স্পষ্টভাবে তুলে ধরার দায়ও থাকে; সম্পাদক সেই যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত লেখা তাই শুধু নিজের লেখা প্রকাশের আনন্দের মধ্যে আটকে থাকে না, সেই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকীয় চর্চা সম্পর্কে আগ্রহ জন্মায়। বিডিনিউজের মতামত পাতায় লেখার অভিজ্ঞতা থেকেও তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রতি আমার শ্রদ্ধা গভীর হয়েছে।

তার মৃত্যুর পর এসব কথা লিখতে গিয়ে বুঝতে পারছি, মানুষকে মনে রাখার জন্য বড় ব্যক্তিগত ঘটনার প্রয়োজন সব সময় হয় না। একটি প্রকাশনা, একটি সম্পাদকীয় অবস্থান, কাজ সম্পর্কে কিছু নির্ভরযোগ্য আলাপ স্মৃতিতে থেকে যায়। পরে সেই মানুষটির অনুপস্থিতিতে স্মৃতিগুলো আলাদা ওজন পায়। আমার কাছে ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ এখন তেমন একটি স্মৃতি। বইটির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা মনে পড়লে তার কথা আসবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেওয়া সম্পাদককে সেই কাজের মধ্য দিয়েই মনে রাখব। তার পরিবার, সহকর্মী ও আপনজনদের শোকের গভীরতা বাইরে থেকে পুরোপুরি অনুভব করা কঠিন। প্রতিদিনের পরিচিত মানুষটির অনুপস্থিতি তাদের জীবনে অনেক ছোট ছোট মুহূর্তেও ফিরে আসবে। প্রতিদিনের কথাবার্তা, একসঙ্গে কাটানো সময় আর অভ্যাসের মধ্যে তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই বারবার তার অভাব অনুভব করবেন। তাদের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুতে গভীর শোক জানাই।

তৌফিক ভাই, ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার স্মৃতি আমার কাছে থাকবে। সেই স্মৃতিতে আপনার সম্পাদকীয় দায়িত্ববোধের জন্য কৃতজ্ঞতা থাকবে, সংবাদকে গুরুত্ব দেওয়ার অবস্থানের জন্য শ্রদ্ধা থাকবে। আপনার কথা মনে হলে এই কাজটির কথাও মনে পড়বে।

শাহেদ কায়েস: কবি ও মানবাধিকার কর্মী। ই-মেইল: shahedkayes@gmail.com