কেন এমন অসময়ে চলে গেলেন,তৌফিক?
মৃত্যুর মাত্র দশ দিন আগে দেখা, স্বাস্থ্যের যত্ন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংকলন ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ প্রকাশ—সফেদ শুভ্র সৌম্যকান্তি তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে গভীর আবেগঘন স্মৃতিকথা লিখেছেন সাংবাদিকতার প্রাক্তন শিক্ষক সুব্রতশংকর ধর।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রাণহীন শরীর দেশে ফিরে এলো। ব্যাপারটি বিশ্বাস করতেও আমার কষ্ট হচ্ছে। মৃত্যুর ১০ দিন আগে রাজু আলাউদ্দিনের বাসা থেকে প্রায় জোর করে ধরে নিয়ে গেলেন তার বাসায়। দীর্ঘকাল পর দেখা তৌফিকের সঙ্গে। সফেদ পাঞ্জাবিতে শুভ্র শশ্রুমণ্ডিত, মৃদুভাষী, সৌম্যকান্তি তৌফিককে সেদিন দেখে একবারও কি মনে হওয়ার উপায় ছিল যে ১০ দিন পরে তিনি আর থাকবেন না? না, মনে হয়নি।
সেদিনের সেই হঠাৎ উপস্থিতির প্রায় অস্বাভাবিক নিমন্ত্রণে প্রতিটি খাবার রান্না করা হয়েছিল কম তেলে, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে। আমার খানিকটা সাময়িক অসুস্থতার জন্য আমার জিভে তৌফিক নিজের হাতে ঢেলে দিলেন দু-ফোঁটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধ। আলোচনার একটা বড় অংশ দখল করে রেখেছিল স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন। মূলত তৌফিকই ছিলেন বক্তা। সঙ্গত কারণেই আমার মনে হয়েছিল, এমন মানুষের একটা দীর্ঘ, নিরোগ জীবন হবে। হায়! তিনি চলে গেলেন অকস্মাৎ! সত্যি, বিশ্বাস হচ্ছে না।
তৌফিকের সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের। সম্ভবত যখন তিনি দ্য ডেইলি স্টারে কাজ করতেন, তখন থেকে। স্বল্প পরিচয়ের আলোতেই তাকে আবিষ্কার করেছিলাম একজন নিষ্ঠাবান এবং পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে। তিনি নিষ্ঠাবান সাংবাদিক, আমি সাংবাদিকতার প্রাক্তন শিক্ষক—এই পরিচয়-যৌথতায় একটা দৃশ্যমান, অদৃশ্য পারস্পরিক সমীহের সম্পর্ক ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু সেই অর্থে তার সঙ্গে আমার তেমন ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেনি। গড়ে ওঠার সুযোগও ছিল না ভিনদেশে আমাদের অবস্থানের কারণে।
নতুন করে একটা পরোক্ষ যোগাযোগ গড়ে ওঠে, যখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাণ্ডারি হিসেবে তিনি এসে হাজির হন। সত্যি বলতে কী, তার প্রতি আস্থা থেকেই বিডিনিউজের প্রতি আমার আস্থা গড়ে ওঠে। চোখের সামনেই দেখলাম বিডিনিউজ একটি অনন্য অনলাইন সংবাদপত্র হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল তন্নিষ্ঠ সাংবাদিকতার এক অনুপম উদাহরণ হিসেবে। এতখানিই অনুপ্রাণিত হলাম যে একসময় আমি এতে লিখতেও শুরু করলাম। অবশ্য এই লেখালেখিতে আমার যতখানি না অবদান, তার চেয়ে বেশি অবদান রাজু আলাউদ্দিনের অনিবার্য তাড়নার।
সংবাদপত্র দীর্ঘকাল ধরেই পুঁজির তল্পিবাহক, ক্ষমতার আজ্ঞাবহ। এটি শুধু আমাদের দেশেই নয়, সারা পৃথিবীতেই। এই আরোপিত সীমানার মধ্যেই নিজের একটা দৃশ্যমান চরিত্র দাঁড় করানো সহজ নয়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সেটি করেছিল তৌফিকের যোগ্য নেতৃত্বের কারণেই। ২০২৪-এর আগে-পরে আমরা কিছু প্রভাবশালী পত্রিকাকে দেখেছি রাজনীতিকে কলুষিত করার ভয়ংকর অপপ্রয়াসে লিপ্ত। ঠিক কার এজেন্ডাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়, দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়—তা নিয়ে সেই সব পত্রিকার ব্যাপারে যখন জনমনে ব্যাপক সংশয়, যখন সোশ্যাল মিডিয়া গুজবের ভারে ন্যূব্জ হয়ে পড়েছে, তখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের অনলাইন পোর্টাল হয়ে উঠেছিল দেশে এবং প্রবাসে বাঙালিদের অন্যতম আস্থার জায়গা। তৌফিক দিশারি হয়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে সেই জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আরও অনেক দূর যেতেন তিনি। হায়, সেই সময় তিনি পেলেন না!
বাংলাদেশ এক ভয়ংকর দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে গেছে এবং যাচ্ছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ওপর দিয়েও অনেক ধকল গেছে। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে গেল ছয় বছর ধরে। ধারাবাহিকভাবে আমি সবটুকু নজরে রাখতে পারিনি বলে আমি সেই আলোচনায় যাব না। তবে একটা জিনিস স্পষ্ট—সকল প্রতিকূলতার মধ্যেও তৌফিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের হালটি ধরে রেখেছিলেন দৃঢ় হাতে। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি তার সম্পাদকীয় নীতিতে ছিলেন নিষ্কম্প। হ্যাঁ, কোনো দল নয়; বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আর মুক্তিযুদ্ধে ছিল তার অবিচল আস্থা। এক মুহূর্তের জন্যও তিনি সেখান থেকে সরে যাননি।
২০২৪-এর ৫ অগাস্টের পর যখন স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ চার দিক থেকে আক্রান্ত, যখন মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত স্থাপনা ভেঙে ফেলা হচ্ছে সারা দেশে, বীরশ্রেষ্ঠদের ভাস্কর্যগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতোর মালা পরাচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধী অন্ধকারের শক্তি, আর তাতে মদদ দিচ্ছে বর্বর প্রশাসন, বৈশ্বিক দোসররা আর দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা মিলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, দেশের নাম, সংবিধান, জাতীয় সংগীত সব মুছে দিতে চাচ্ছে; তখন, ঠিক তখন তৌফিক প্রকাশ করছেন মুক্তিযুদ্ধের ওপর তিন ভলিউমের বই ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’। তার মৃত্যুর ১০ দিন আগে, তার বাসায় এই বইগুলো প্রথমবারের মতো দেখলাম। সত্যি বিস্মিত হয়েছিলাম তার সময় নির্বাচনের কথা ভেবে। একবার বইগুলোর দিকে, একবার তার দিকে তাকাচ্ছিলাম। মৃদুভাষী তৌফিকের চোখে-মুখে এক সন্তের নির্লিপ্তি; যেন ও কিছু নয়! কিন্তু আমরা তো জানি, এই দুঃসময়ে এই গ্রন্থের প্রকাশনা কত কঠিন ছিল।
জানি না এই দুঃসময় কবে কাটবে, কিংবা আদৌ কাটবে কি না। এই ঘোর তমিস্রায় আলো হাতে আমাদের সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একজন অকুতোভয় তৌফিক ইমরোজ খালিদীর খুব প্রয়োজন ছিল।
কেন চলে গেলেন, তৌফিক?
সুব্রতশংকর ধর: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক।
