২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫ কার্তিক ১৪৩৩

প্রবাসী বন্ড ও সমন্বিত উন্নয়ন: সিলেটের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ

ঢাকা-সিলেট রেলপথ সংস্কার থেকে শুরু করে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রবাসী মূলধন যুক্ত করার এখনই উপযুক্ত সময়।

প্রবাসী বন্ড ও সমন্বিত উন্নয়ন: সিলেটের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ

রূপসী সিলেটের চা বাগানকে কেবল সৌন্দর্য প্রদর্শনে সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রবাসী বন্ড ও বিনিয়োগের মাধ্যমে রপ্তানিমুখী অর্থনীতির শক্তিতে পরিণত করার সুযোগ রয়েছে।

খালিদুর রহমান খালিদুর রহমান

Published : 20 Oct 2026, 03:46 PM

Updated : 20 Oct 2026, 03:46 PM

সিলেটের সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আত্মীয়তা, আবেগ ও শিকড়ের টানের পাশাপাশি প্রবাসীদের অর্থ সিলেটের আবাসন, জমি, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও ভোগব্যয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে সিলেটের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন প্রশ্ন হলো, এই অর্থের আরও বড় অংশ কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পদ সৃষ্টির পাশাপাশি শিল্প, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করা যায়?

বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রবাসী আয়ের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ৩৫.৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা আগের অর্থবছরের ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৭.৩৫ শতাংশ বেশি। ২০২৬ সালের জুলাইয়েও এসেছে ২.৮৬ বিলিয়ন ডলার। সিলেট বিভাগেও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ উল্লেখযোগ্য। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভাগটিতে প্রায় ২.৬৪ বিলিয়ন ডলার এবং সিলেট জেলায় প্রায় ১.৩৬ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে।

তবে প্রবাসী আয় আর প্রবাসী বিনিয়োগ এক বিষয় নয়। প্রবাসী আয়ের বড় অংশ পরিবার পরিচালনা, ভোগব্যয়, সঞ্চয়, ঋণ পরিশোধ, জমি কেনা ও বাড়ি নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাজার, ব্যবস্থাপনা, শ্রম, প্রযুক্তি, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল, অনুমোদন ও বিপণন নিয়ে তুলনামূলক বেশি অনিশ্চয়তা থাকে। তাই প্রবাসীদের আবাসন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ তৈরি করাই হওয়া উচিত নীতির মূল লক্ষ্য।

সিলেটের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে প্রবাসী মূলধনকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। হাওর, মৎস্যসম্পদ, চা, ফলমূল ও কৃষিপণ্যের ভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে কোল্ড স্টোরেজ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। মাছ, ফল, সবজি, মসলা ও চাকে কেন্দ্র করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে উঠলে কৃষক থেকে উদ্যোক্তা ও শ্রমিক পর্যন্ত বহু স্তরে কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবাতেও সিলেটের সম্ভাবনা রয়েছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দক্ষ তরুণরা বের হচ্ছেন। তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার সঙ্গে প্রবাসীদের আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও বাজারজ্ঞান যুক্ত করা গেলে সফটওয়্যার, ডেটা সেবা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সেবা খাতে নতুন উদ্যোগ গড়ে উঠতে পারে। পর্যটনেও জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, চা-বাগান ও হাওরকে কেন্দ্র করে পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

এই সম্ভাবনাকে পরিকল্পিত কাঠামোর মধ্যে আনার ক্ষেত্রে 'সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৩' গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি দিতে পারে। মহাপরিকল্পনায় ভূমি ব্যবহার, আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা, রেল, সড়ক, নৌ ও বিমান যোগাযোগ, জলাশয়, পরিবেশ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পর্যটন অবকাঠামো বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। ফলে সিলেটের উন্নয়নকে শুধু আবাসন সম্প্রসারণ হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হিসেবে বিবেচনা করা সম্ভব।

এই কাঠামোর অধীনে ‘প্রবাসী বিনিয়োগ অঞ্চল’ গড়ে তোলার ধারণা বিবেচনা করা যেতে পারে। কৃষি ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্যশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল, লজিস্টিকস, রপ্তানিমুখী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটনের জন্য পরিকল্পিত অবকাঠামো সেখানে রাখা যেতে পারে। জমি, বিদ্যুৎ, পানি, ব্যাংকিং, অনুমোদন ও ব্যবসায়িক তথ্যের জন্য একক সেবা থাকলে বিদেশে অবস্থানরত বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমতে পারে। প্রকল্পের জমি, ব্যয়, কর্মসংস্থান, বাজার, অনুমোদন, পরিবেশগত প্রভাব ও অগ্রগতির তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করাও জরুরি।

প্রবাসী বিনিয়োগের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো। বিশেষ করে ঢাকা–সিলেট রেল যোগাযোগের উন্নয়ন সিলেটের কৃষি, মৎস্য, চা, পর্যটন ও শিল্পের সঙ্গে জাতীয় বাজারের সংযোগ আরও শক্তিশালী করতে পারে। আখাউড়া–সিলেট রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ১৬ হাজার ১১০ কোটি টাকা। প্রকল্পে ২৩৯.১৪ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তর, লুপ লাইন নির্মাণ এবং ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতির উপযোগী অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। চীনা অর্থায়নের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় প্রকল্পটি আবার আলোচনায় এসেছে।

তবে বিদেশি ঋণ পাওয়া গেলেই অর্থায়নের কাঠামো চূড়ান্তভাবে যুক্তিসংগত হয়েছে—এমন ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সুদ, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি, পরিশোধের দায় ও ঋণের শর্তের পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় কিলোমিটারপ্রতি প্রায় ৫৬.৭২ কোটি টাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ফলে প্রবাসীদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ যেন অযৌক্তিক ব্যয় কাঠামোয় ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

এই প্রেক্ষাপটে ‘ঢাকা–সিলেট রেল উন্নয়ন প্রবাসী বন্ড’-এর সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। বাংলাদেশে ওয়েজ আর্নার্স ডেভেলপমেন্ট বন্ড, ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড ও ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ডের মতো প্রবাসী বিনিয়োগ উপকরণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো অর্থায়নে নতুন বন্ড কাঠামো বিবেচনা করা সম্ভব।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বন্ডের মাধ্যমে উন্নয়ন অর্থায়নের নজির রয়েছে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী বন্ড ব্যবহার করে পরিবহন, জ্বালানি, পানি ও টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে অর্থ সংগ্রহ করেছে। ভারতও বিভিন্ন সময়ে প্রবাসীদের জন্য বিশেষ বন্ড ইস্যু করে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহ করেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভারত বিভিন্ন ধরনের প্রবাসীভিত্তিক আর্থিক উপকরণের মাধ্যমে ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সংগ্রহ করেছে। ইসরায়েলের ক্ষেত্রে ১৯৫১ সাল থেকে প্রবাসী বন্ডের মাধ্যমে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি সংগ্রহের নজির রয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রবাসীদের দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে সুশৃঙ্খল বিনিয়োগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে অবকাঠামো অর্থায়নের নতুন পথ তৈরি হতে পারে।

তবে বন্ড চালুর আগে আইনি কাঠামো, সুদ বা মুনাফার হার, মেয়াদ, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি, কর সুবিধা, মূলধন ফেরত এবং সরকারের আর্থিক দায় বিশদভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। প্রবাসী বন্ড যে বিদেশি ঋণের তুলনায় সবসময় কম ব্যয়ের হবে, এমন ধারণাও করা ঠিক হবে না। চীনা ঋণ ও সম্ভাব্য প্রবাসী বন্ডের মোট অর্থনৈতিক ব্যয়, ঝুঁকি ও পরিশোধের দায় তুলনা করেই অর্থায়ন কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

প্রবাসী বন্ডের ক্ষেত্রে আস্থাই হবে প্রধান শর্ত। প্রকল্পের ব্যয়, অর্থের ব্যবহার, অগ্রগতি, প্রতি কিলোমিটারের ব্যয় ও সময়সূচি নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। স্বাধীন আর্থিক ও প্রকৌশলগত নিরীক্ষা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং অনলাইন প্রকল্প পর্যবেক্ষণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে পারে।

প্রবাসী সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার অর্থ আবাসন বিনিয়োগ বন্ধ করা নয়। কয়েকজন প্রবাসীর মূলধন একত্র করে বিনিয়োগ তহবিল, শেয়ারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্মও গড়ে তোলা যেতে পারে। স্থানীয় তরুণরা ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিগত দায়িত্ব নিতে পারেন, আর প্রবাসীরা দিতে পারেন মূলধন, আন্তর্জাতিক বাজারের যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা।

শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও সিলেটের পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাহাড়, টিলা, হাওর, নদী ও জলাভূমি রক্ষা করে শিল্পাঞ্চল নির্ধারণ জরুরি। প্রবাসী বিনিয়োগ অঞ্চলকে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, শক্তিসাশ্রয়ী ভবন, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও সবুজ পরিবহনভিত্তিক ‘গ্রিন ইনভেস্টমেন্ট জোন’ হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এখানে সমন্বয়কারী ভূমিকা পালন করতে পারে। সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, ভূমি প্রশাসন, রেলওয়ে, সড়ক ও জনপথ, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবেশ, পর্যটন, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি খাতের সমন্বয় ছাড়া এই উদ্যোগ সফল হবে না। প্রতিটি প্রকল্পের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বাজার, ঝুঁকি ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের জন্য বিশেষজ্ঞভিত্তিক কাঠামোও প্রয়োজন।

সিলেটের উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে তাই প্রবাসী পল্লীর পাশাপাশি প্রবাসী বিনিয়োগ অঞ্চল এবং উৎপাদনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে ভাবা জরুরি। একটি বাড়ি একটি পরিবারের সম্পদ বাড়ায়; একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বহু পরিবারের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে; একটি আধুনিক রেলপথ কৃষক, ব্যবসায়ী, পর্যটক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীকে বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে। প্রবাসী অর্থকে যদি এই তিন ক্ষেত্রের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণভাবে কাজে লাগানো যায়, তবে সিলেটের অর্থনীতি আবাসন ও ভোগনির্ভরতার পাশাপাশি শক্তিশালী উৎপাদন, বাণিজ্য ও যোগাযোগকেন্দ্রে রূপান্তরের সুযোগ পেতে পারে।

খালিদুর রহমান: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক। ই-মেইল: khalid_sust@yahoo.com