Published : 30 May 2026, 06:33 PM
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের সামরিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায়। স্বাধীন বাংলাদেশের মাত্র এক দশকের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর জিয়াউর রহমান ছিলেন দ্বিতীয় রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি সেনাবাহিনীর একদল সদস্যের হাতে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। শুধু তাই নয়, এই হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি কথিত বিপ্লবী পরিষদের ঘোষণা দিয়েছিলেন মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর। দখল করা হয়েছিল চট্টগ্রামে বিটিভির উপ-সম্প্রচার কেন্দ্র, বেতার কেন্দ্র ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ।
অবাক করা বিষয় হলো, এই বিপ্লবী পরিষদ কে বা কারা, কখন গঠন করেছেন—সে বিষয়টি জিওসি এম এ মঞ্জুর নিজেও খোলাসা করেননি। মঞ্জুর নিজেকে কথিত এই বিপ্লবী পরিষদের মুখপাত্র বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। পরের দিকে এক অলীক আকাঙ্ক্ষায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডকে ‘বিপ্লব’ উল্লেখ করে ঢাকার সরকারকে চট্টগ্রামের কাছে আত্মসমর্পণের হুমকিও দিয়েছিলেন তিনি।
এসব ঘটনাপ্রবাহের একটি শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা পাওয়া যায় সেই সময়ে চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনার জিয়াউদ্দীন চৌধুরীর বয়ান ও তখনকার সংবাদপত্রে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর ৩১ মে সকালে একজন সাদা পোশাকের সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে জিওসি এম এ মঞ্জুরের অফিসে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন ডেপুটি কমিশনার জিয়াউদ্দীন চৌধুরী ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার সাইফুদ্দিন আহমেদ। সেখানেই তারা কথিত বিপ্লবী পরিষদের কথা শুনেছিলেন; যা পরে সংবাদমাধ্যমেও চলে আসে (পৃষ্ঠা: ৬০, অ্যাসাসিনেশন অব জিয়াউর রহমান: অ্যান্ড দ্য আফটারমাথ)।
কথিত এই বিপ্লবী পরিষদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সময় ছিল অত্যন্ত আলোচিত একটি বিষয়। যে কারণে ৩১ মে ১৯৮১ বাংলাদেশের প্রায় সব সংবাদপত্রে ঘটনা সম্পর্কে প্রকাশিত প্রেসনোটে এই কথিত বিপ্লবী পরিষদের উল্লেখ ছিল। দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ১৯৮১ সালের ৩১ মে প্রকাশিত ‘ঘটনা সম্পর্কে প্রেসনোট’ শিরোনামের খবরে বলা হয়, ‘…ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট এবং সেনাবাহিনী প্রধান চট্টগ্রামের দুষ্কৃতীকারী, যাহারা নিজেদেরকে বিপ্লবী পরিষদ হিসাবে উল্লেখ করিয়াছে, তাহাদের প্রতি অবিলম্বে সরকারের নিকট আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়াছেন।…’ (আজাদ, ৩১ মে ১৯৮১)।
চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা এবং গুটিকয়েক সেনা কর্মকর্তার বিদ্রোহ টিকে ছিল মাত্র ৪৮ ঘণ্টা—৩০ মে শনিবার দিবাগত ভোররাত থেকে সোমবার দিবাগত ভোররাত পর্যন্ত। এই বিদ্রোহের অবসানের পর এম এ মঞ্জুরের কথিত বিপ্লবী পরিষদের কিছু বৃত্তান্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়।
এমএ মঞ্জুরের এই কথিত বিপ্লবী পরিষদ নিয়ে ১৯৮১ সালের ৫ জুন বিস্তারিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘দ্য বাংলাদেশ অবজারভার’। সে সংবাদটির শিরোনাম ছিল ‘Biplabi Parishad unveiled’. চট্টগ্রাম থেকে সৈয়দ মুরতাজা আলীর (Syed Murtaza Ali) পাঠানো ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় এই বিপ্লবী পরিষদ গঠিত হয়েছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পরপরই। চট্টগ্রামে সেনানিবাসে গঠিত এই বিপ্লবী পরিষদের সদস্য ছিলেন সাত জন। প্রতিবেদনটিতে বিস্তারিত বলা হয় ‘The names of the members of so-called Revolutionary Council (Biplabi Parishad) of misguided army group of Chittagong were revealed today. The 'Revolutionary Council' consisted of seven members with Major General M. A. Manzoor as its chief. According to reliable sources "Council" members are: Major General M. A. Manzoor General Officer Commanding of 24th Infantry Division, Brig Mohsenuddin Ahmed Brigade Commander of 69 Infantry Division, Col Noazisuddin Com mander of 305 Brigade, Col Abdur Rashid Brigade Commander of 65 Infantry Brigade, Lt. Col. Mehbubur Rahman Commanding Officer of 21 East Bengal Regiment, Lt. Col. Matiar Rahman Staff Officer of Divisional Headquarter and Lt. Col. Fazle Hossain Commanding Officer of six East Bengal Regiment. ’ (5th June, 1981, The Bangladesh Observer)
৫ জুন ১৯৮১ সংবাদপত্রটির প্রথম পাতায় দুই কলামে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটিতে পরের দিকে উল্লেখ করা হয়, কথিত এই বিপ্লবী পরিষদের তিন জন মেজর জেনারেল মঞ্জুর, লে.ক. মেহবুবুর রহমান ও মতিউর রহমান এরই মধ্যে নিহত হয়েছেন। আর বাকি চারজন রয়েছেন সেনা হেফাজতে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এই পরিষদটি গঠিত হয়েছিল শনিবার ভোর ছয়টার দিকে। এর আগেই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মিশন সম্পন্ন করেছিল বিদ্রোহী সেনারা। এই সংবাদের আরও বলা হয়, 'The 'Revolutionary Council' was formed at about 6 a.m. on Saturday after the assassination of President Ziaur Rahman. But the members of the "Council" made a careful attempt to conceal their names from the public. Even Major General M. A. Manzoor while holding a meeting with the heads of the department of different local government offices and journalists at Chittagong Court Building on Sunday declared that he was nobody of Biplabi Parishad. He addressed them as G.O.C. and a spokesman spokesman of Revolutionary Council.’ (5th June, 1981, The Bangladesh Observer)
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর চট্টগ্রামের বেসামরিক প্রশানের কর্তৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেন জিওসি মঞ্জুর। যার লক্ষ্যে তিনি এই কথিত বিপ্লবী পরিষদকে ব্যবহারের চেষ্টা করেন। শুধু তাই নয় এই পরিষদের তরফ থেকে চট্টগ্রাম রেডিও থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে টেলিভিশন রিলে স্টেশনে স্লাইড প্রদর্শনের চেষ্টা করা হলেও ঢাকার মূল সম্প্রচার ব্যাহত করা যায়নি। লিখিত ঘোষণা ছবি আকারে সম্প্রচারিত হয় বাংলাদেশ টেলিভিশন চট্টগ্রাম স্টেশনের পর্দায়। যদিও তাদের কোনো চেষ্টা সফল হয়নি। বিদ্রোহ অবসানে ঢাকা থেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার ও সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদের কড়া হুঁশিয়ারির পর বিপ্লবী পরিষদের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নিয়ন্ত্রণ ও সেনানিবাসে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা কার্যত ব্যর্থ হয়ে যায়। দলে দলে সেনারা সেনানিবাস ত্যাগ করতে থাকেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার যে কারণ উল্লেখ করে জিওসি মঞ্জুর সেনা সদস্যদের সমর্থন পেতে চেয়েছিলেন তা সাধারণ সেনারা বিশ্বাস করেননি। যার ধারাবাহিকতায় সোমবার ভোরে রণভঙ্গ নিয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাস ত্যাগ করেন জেনারেল মঞ্জুর ও তার সহযোগীরা।
এখানে ‘দ্য বাংলাদেশ অবজারভার’ পত্রিকার আরেক সংবাদের কথা না উল্লেখ করলেই নয়। ৪ জুন ১৯৮১ সংবাদপত্রটি প্রকাশ করেছিল 'Last scenes of Manzoor’s drama’ শিরোনামের একটি সংবাদ। যেখানে মঞ্জুরের ৪৮ ঘণ্টার ব্যর্থ বিদ্রোহের শেষ মুহূর্তের বর্ণনা রয়েছে। এই প্রতিবেদনটি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহের বিশেষ একটি প্রতিবেদন বলেই প্রতীয়মান হয়। একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, সংবাদপত্রের প্রকাশিত সব তথ্য ও বিশ্লেষণ একেবারে সঠিক ও প্রভাবহীন তা বলার সুযোগ নেই। আজকের আলোচনায় উল্লেখিত প্রতিবেদনটিতে কিছু ভুলত্রুটি ও প্রভাবযুক্ত তথ্য থাকতে পারে। তবে এটি যে ইতিহাস গবেষণা ও ঘটনাপ্রবাহ জানার একটি বিশেষ সূত্র তাতে সন্দেহ নেই।
ঐতিহাসিক এই ঘটনা নিয়ে যাদের আরও আগ্রহ রয়েছে তারা একটি তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনের খোঁজ করতে পারেন। উল্লেখ্য রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার পর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারক রুহুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি বেসামরিক কমিশন গঠিত হয়েছিল। যে কমিশনের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি এটিএম আফজাল ও খুলনা জেলা ও সেশন জজ সৈয়দ সিরাজুদ্দিন আহমদ। যতদূর জানা যায়, এই প্রতিবেদনটি সংবাদমাধ্যমের কাছে এসেছিল ১৯৮১ সালের অগাস্ট মাসে। সে সময় জিয়া হত্যাকাণ্ড তদন্তে গঠিত এই কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোও অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সে আলোচনা আরও বিস্তৃত।
সূত্র:
১. M. Choudhury, Ziauddin (2009), Assassination of Ziaur Rahman and the Aftermath, Dhaka: UPL.
২. 4th June and 5th June, 1981, The Bangladesh Observer.
৩. খান (অব.), মে.জে. মনজুর রশীদ (২০১৫) আমার সৈনিক জীবন: পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, ঢাকা: প্রথমা প্রকাশন।