বিএনপিনামা: অমিত শাহ থেকে আখিম ট্র্যোস্টার

অজয় দাশগুপ্তঅজয় দাশগুপ্ত
Published : 27 April 2022, 01:39 PM
Updated : 27 April 2022, 01:39 PM

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গুলশানে দলীয় কার্যালয়ে ২০১৫ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে এক সংবাদ সম্মেলন শেষে সবাইকে বিস্মিত করে বলে ফেললেন দুটি শব্দ– 'অবরোধ চলবে'। এক বছর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিএনপি এবং তার জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী এবং আরও কয়েকটি ধর্মান্ধ দল এ নির্বাচন বানচাল করার জন্য সহিংস পথ অনুসরণ করে ব্যর্থ হয়। এরপর এক বছর তারা অনেকটা চুপচাপ ছিল। কিন্তু বছর যেতে না যেতেই কেন দলের প্রধান নেতা বললেন– 'অবরোধ চলবে'? বিএনপি কিংবা ২০ দলীয় জোট তো কোনো অবরোধ ডাকেনি। তাহলে 'অবরোধ চলবে' বলার অর্থ কী?

এ অবাক করা কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকে তিনি গুলশান অফিস ছেড়ে পল্টনের দলীয় কার্যালয়ে যেতে চাইলেন। পুলিশ তাতে বাধা দেয়। তার ঘোষণার পরপরই বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা বাংলাদেশের নানা স্থানে শুরু করে জ্বালাও-পোড়াও। অবরোধ আরোপের চেষ্টা করে। কিন্তু জনজীবন অনেকটা স্বাভাবিকই থাকে। সড়ক-মহাসড়কে প্রচুর যানবাহন। দোকান-হাটবাজার খোলা। ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যায়। কারখানা খোলা। কৃষকরা মাঠে ব্যস্ত। বিএনপি প্রমাদ গোণে। তাই 'অবরোধ চলবে' ঘোষণার মতোই ৯ জানুয়ারি সকল সংবাদপত্রে বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশান অফিস থেকে জানানো হয়– ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি দলের সভাপতি অমিত শাহ খালেদা জিয়াকে আগের রাতে ফোন করে তাকে 'অবরুদ্ধ' করে রাখার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার স্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বিগ্ন।

কিন্তু একদিন যেতে না যেতেই ফাঁস হয়ে গেল গোমর। বিজেপি সভাপতির একান্ত সচিব এস রানা দিল্লিতে সাংবাদিকদের জানান– 'বাংলাদেশে কাউকে অমিত শাহ্ ফোন করেননি। বাংলাদেশ থেকে কোন ফোনও আসেনি। খালেদা জিয়ার সঙ্গে অমিত শাহ্ ফোনে কথা বলেছেন, তার শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে খোঁজ করেছেন বলে যে খবর প্রচারিত হয়েছে, তা পুরোপুরি মিথ্যা'। [প্রথম আলো, ১১ জানুয়ারি, ২০১৫]

পত্রিকাটি ১৩ জানুয়ারি (২০১৫) একটি খবর প্রকাশ করে 'বিএনপির দুটি পদক্ষেপে বিভ্রান্তি' শিরোনামে। এতে লেখা হয়– 'সম্প্রতি দুটি অসত্য খবরে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের ছয় সদস্য খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করা এবং তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছেন বলে যে খবর প্রচারিত হয়, তা ভিত্তিহীন। কংগ্রেসের সদস্যরাই বলেছেন, তারা এমন বিবৃতি দেননি। দ্বিতীয়ত, বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হলো যে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ ও বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মধ্যে টেলিফোনে আলাপ হয়েছে। কিন্তু পরে অমিত শাহ-এর একান্ত সচিব এস রানা নিশ্চিত করেছেন, এ রকম কোনো টেলিফোন আলাপ হয়নি। প্রথম ঘটনাটির দায় মূলত প্রথম আলোসহ এ দেশের সংবাদমাধ্যমের। তারা লন্ডন থেকে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস নামের এক অখ্যাত ব্রিটিশ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণের সূত্রে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের বিবৃতির খবরটি ছেপেছে। দেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর উচিত ছিল মূল সূত্র থেকে খবরের সত্যতা যাচাই করা। ইন্টানেটের যুগে অনলাইনভিত্তিক সাংবাদিকতার দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ দিকটি এর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে।'

প্রথম আলো লিখেছে, 'দ্বিতীয় অসত্য খবরটির দায় বিএনপির। অমিত শাহ-খালেদা জিয়া ফোনালাপের বিশুদ্ধ গুজবটি তারাই রটিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা এ দেশের সংবাদমাধ্যমকে বিভ্রান্ত করেছে। বিএনপির এমন বিভ্রান্তি ছড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না; গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা লাভের এমন প্রবণতা অতি নিন্দনীয়।' [প্রথম আলো, ১৩ জানুয়ারি, ২০১৫]

কথায় বলে, কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না। বিএনপির নামের দলটি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতি করে চলেছে বছরের পর বছর ধরে। বাংলাদেশের জনগণ জানেন, বিশ্ববাসী জানেন– ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সে সময় ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কে তার বাড়ি ঘেরাও করতে এগিয়ে আসছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ট্যাংক বহর, মেশিনগানসজ্জিত সাঁজোয়া গাড়ি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ধীরস্থির, সর্বত্র টেলিফোন-ওয়্যারলেসের মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দিলেন– আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। এ ঘোষণার কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় শত্রুরাষ্ট্র পাকিস্তানে। বাংলাদেশজুড়ে শুরু হয় প্রতিরোধ সংগ্রাম।

অথচ বিএনপির মিথ্যাচার– জিয়াউর রহমান ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক। এমন দল রাজনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য, বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য গুজব রটাবে, তাতে বিস্ময় কী!

বলা হয়ে থাকে– বিএনপির গুজব তৈরির কারখানা রয়েছে লন্ডন শহরে। এতিমের টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দণ্ডিত তারেক রহমান ২০১৫ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব ছিলেন। বিএনপির গঠনতন্ত্রে একটি ধারা ছিল– দুর্নীতির দায়ে কেউ অভিযুক্ত হলে তাকে দলের কোনো পদ দেওয়া হবে না। স্থানীয় বা জাতীয় কোনো নির্বাচনেও তিনি প্রার্থী হতে পারবেন না। কিন্তু বিএনপি গঠনতন্ত্রের এই ধারাটি গোপনে তুলে দিয়েছে। বিএনপি তাকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেছে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালে বাংলাদেশ সরকার লন্ডন শহরকে কেন্দ্র করে ইউরোপজুড়ে প্রচার চালিয়েছিল। এ প্রচারের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট– ক. বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধ করার জন্য ইয়াহিয়া জান্তার ওপর চাপ সৃষ্টি। খ. বাংলাদেশের জন্য স্বীকৃতি আদায়। গ. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি। দুর্ভাগ্য, এই লন্ডন শহরকে এখন একটি মহল কাজে লাগাচ্ছে বাংলাদেশবিরোধী প্রচার চালানোর জন্য।

২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে বিএনপি মিথ্যাচার করেছিল ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতাদের নাম ব্যবহার করে। সাত বছর পর দলটি একই ধরনের মিথ্যাচার করে বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত আখিম ট্র্যোস্টারের নাম ব্যবহার করে। ১৭ মার্চ বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত গিয়েছিলেন বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে। তিনি কী বিষয়ে কথা বলেছেন এবং উপস্থিত বিএনপির নেতারা কী বলেছেন– সে সব নিয়ে জার্মান দূতাবাসের কেউ কিছু বলেননি। কিন্তু বৈঠক পরবর্তী প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপির নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান– বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্রদূত কনসার্ন। আগামী নির্বাচন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র– অনেক বিষয়ে কথা হয়েছে।

এ আলোচনার এক মাস তিন দিন পর ২০ এপ্রিল জার্মান রাষ্ট্রদূত আখিম ট্র্যোস্টার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদমাধ্যমের কূটনৈতিক বিটে দয়িত্বপালনরত সংগঠন ডিক্যাবের সভায় রীতিমতো বোমা ফাটান। তিনি বলেন, 'আমাকে উদ্ধৃত করে বিএনপি নেতার বক্তব্যে আমি অসন্তুষ্ট। বিএনপি কেন নির্বাচনে অংশ নেয়নি, আগামী নির্বাচনে কেন অংশ নিতে চায় না– সে বিষয়ে বলেছেন। এর বেশি কিছু আলোচনা হয়নি।'

তবে বিএনপি এত সহজে হার মানার পাত্র নয়। তাদের মিথ্যাচার-ভাণ্ডার যথেষ্ট মজবুত। রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের প্রতিবাদ করে দলের মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম বলেছেন, 'জার্মান রাষ্ট্রদূত বিএনপির বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি আমির খসরু মাহমুদের বক্তব্যের মিসকোট করেছেন।' [ইউএনবি, ২১ এপ্রিল, ২০২২]

খোলামেলা কথা বৈকি বিএনপি মহাসচিবের। দলের শীর্ষনেতারা কয়েকদিন ধরে 'আন্তর্জাতিক অঙ্গনে' তৎপর। বাংলাদেশে নিযুক্ত কূটনীতিকদের নিয়ে তারা ইফতার পার্টি করেছে। কয়েকজন কূটনীতিক বিএনপি চেয়ারপার্সনের অফিসে গিয়ে কথাও বলেছেন। কেউ কেউ বলেন, বিএনপি কী শর্তে ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে, সেটা জানতে-বুঝতে চান বিদেশিরা। আবার কেউ কেউ বলছেন, বিদেশি কোনো কোনো মহল বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চায়।

দেখা যাক, ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদানে অর্জিত বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে চলতে পারে কিনা। কেউ কেউ বলেন, 'গরীব দেশ হয়েও যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি উন্নত দেশের সরাসরি নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংকের হুমকি উপেক্ষা করে নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দৃঢ়তার খেসারত দিতে হবে বৈকি।'

বাংলাদেশকে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, সন্দেহ নেই। আমাদের এটাও জানা, বাস্কেট কেস হিসেবে বহু বছর উপেক্ষিত বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের সারিতে আসন নিয়েছে। সামনে রয়েছে রূপকল্প-২০৪১। লক্ষ্য স্পষ্ট– উন্নত বিশ্বের সারিতে পাকাপোক্ত স্থান করে নেবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বলেছেন, 'বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ভূ-রাজনৈতিক কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে।' [বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৪ এপ্রিল, ২০২২]

বিশ্ব দেখছে– এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। এগিয়ে চলার পথে অনেক সমস্যা আছে। অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। এ সব জয় করার চেষ্টাও আছে। বিএনপি নেতারা কি এসবের খবর রাখেন? নাকি লন্ডনের গুজবের কারখানার ওপরেই তাদের আস্থা বহাল থাকবে?

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক