সামান্য অসামান্য টিস্যু কিংবা টিস্যু পেপারের সমাজতত্ত্ব

বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ শতাংশ পরিমাণ বন উজাড়ের কারণ টিস্যু পেপার এবং এটা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ ব্যবহার করেন। প্রতিদিন টয়লেট টিস্যু ব্যবহারের মাধ্যমে ২৭ হাজার গাছ বাথরুমে আমরা কমোডে ফ্ল্যাশ করি।

জাভেদ কায়সারজাভেদ কায়সার
Published : 22 August 2022, 05:15 PM
Updated : 22 August 2022, 05:15 PM

বাংলা অঞ্চলে ‘টিস্যু পেপার’ বা ‘টিস্যু’ এখন একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ। যদিও টিস্যু এবং পেপার আলাদা শব্দ, কিন্তু প্রাত্যহিক উচ্চারণে দুইটিকে এক শব্দেরই উচ্চারিত হতে বেশি শোনা যায়। দৈনন্দিন জীবনে আমরা টিস্যু বা টিস্যু পেপার এর নানারকম ব্যবহার দেখে থাকি। যদিও সমাজের শ্রেণি বা স্থানভেদে টিস্যু পেপারের ব্যবহার ভিন্ন ভিন্ন। বিশেষ করে শহুরে জীবনে, অনেক ক্ষেত্রে গ্রামীণ সমাজেও টিস্যু পেপারের ব্যপক ব্যবহার লক্ষণীয়। কিন্তু এই টিস্যু পেপারের জন্ম হলো কোথা থেকে, কিংবা কোন প্রেক্ষিতে টিস্যু পেপারের জন্ম হয়েছে এবং কিভাবে আজকের রেস্টুরেন্ট, অফিস কিংবা গৃহস্থালিতে টিস্যু পেপার বিশাল জায়গা করে নিয়েছে, তা জানা দরকার। এই লেখার প্রথম অংশে টিস্যু পেপারের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং পরবর্তী অংশে বাংলাদেশে টিস্যু পেপার ব্যবহারকে ঘিরে সমাজতাত্ত্বিক কিছু ব্যখ্যা এবং উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করা হবে। এই সব উদাহরণের অধিকাংশই ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকেই নেওয়া, যা সকল বাস্তবতায় একইভাবে সঠিক এমনটা দাবি করা যাবেনা, তবে নিজের অভিজ্ঞতাগুলোর সাথে মিলিয়ে দেখা যেতে পারে।

১.

টিস্যু পেপার নামের আগমন জানার আগে টিস্যু পেপারের প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষিত জানা দরকার। বর্তমানে আমরা অনেক ধরণের টিস্যু পেপার দেখতে পাই বা প্রাত্যহিক নানা কাজে টিস্যু পেপার ব্যবহার করি। কিন্তু এই নানান ধরনের টিস্যু পেপার এর মূলে যে টিস্যু পেপারটি রয়েছে তা হচ্ছে টয়লেট টিস্যু। এই টয়লেট টিস্যুর আগমনের কিছু ঐতিহাসিক সামাজিক প্রেক্ষিত আছে, যা জানা প্রয়োজন। বিগত কয়েক দশকে বিভিন্ন সমাজে পরিচ্ছন্নতা এবং টিস্যুর সম্পর্ককে নিবিড় হিসেবে দেখা হয়। পরিচ্ছন্নতার যে ধারণা সেখানে মল ত্যাগের পর পায়ু-অঞ্চল পরিষ্কার রাখার বিষয়টি খুবই অপরিহার্য বিষয়, যা সভ্যতার উন্নতির অলিখিত শর্ত হিসেবে কাজ করেছে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বা সভ্যতায়। পায়ু-অঞ্চল পরিষ্কার রাখার জন্য বিভিন্ন প্রাকৃতিক বাস্তবতায় মানুষ বিভিন্ন ধরণের পদ্ধতি অবলম্বন করে। এই পদ্ধতিগুলো ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক চর্চার অংশ হয়ে উঠে। অর্থাৎ, গুহ্যদ্বার বা পায়ু-অঞ্চল পরিষ্কার করার সাথে স্থানীয় সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ খুব নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। বিভিন্ন সময়ে মানুষ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে পায়ু-অঞ্চল পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করেছে। এ বিষয়ক গবেষকদের মতে, অনেক প্রাচীন সময়ে পাথর বা অন্য কোন প্রাকৃতিক মসৃণ উপকরণ ব্যবহার করে পায়ু-অঞ্চল প্রথম দফায় পরিষ্কার করা হতো এবং তারপরে পানি বা তুষার (snow) দিয়ে আবার পরিষ্কার করা হতো। যেসকল অঞ্চলে পানি বা তুষারের স্বল্পতা ছিল, সেখানে অন্যান্য প্রাকৃতিক উপকরণের দিকে বেশি নির্ভরশীল করে তোলে স্থানীয় মানুষদের (Mirsky, 2013)। ইতিহাসে দেখা যায়, যেসকল অঞ্চলে পানির সংকট রয়েছে বা সকল জায়গায় পানি সহজলভ্য না কিংবা পানির আধিক্য নেই, এমন অঞ্চলগুলোতে ঝিনুক বা বিভিন্ন প্রাণীর লোম দিয়ে পায়ু পরিষ্কার করা হতো। এছাড়া গাছের পাতা, ঘাস, ভুট্টার শাঁস, খড়-কুটো, নারিকেলের খোসা, কাঠি, লাঠিসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার ছিল (Mirsky, 2013; Blakemore, 2020; Ponti, 2020)।

সভ্যতার ইতিহাসে পায়ু-অঞ্চল পরিষ্কারের জন্য ব্যবহৃত উপাদানের যে-সকল অকাট্য ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে, তার মধ্যে রোমান সভ্যতা অন্যতম। রোমান সভ্যতার বিভিন্ন সাহিত্যে বাথরুমে ব্যবহৃত একটি উপকরণের বর্ণনা বেশ জনপ্রিয়। ইতিহাসে বলা হয়, খিষ্ট্রপূর্ব প্রথম দশকের দিকে রোমান এক গ্ল্যাডিয়েটর বাথরুমে গিয়ে গলায় টেরোরিয়াম (tersorium) ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করে (Blakemore, 2020)। টেরোরিয়াম হলো একটা লম্বা লাঠির মাথায় কাপড় বেঁধে দেয়া, যা আবার লবণ বা ভিনেগার যুক্ত পানিতে ডিবানো থাকতো। এটা দেখতে অনেকটা আমাদের দেশে বর্তমানে বাথরুমের কমোড বা প্যান পরিষ্কারের জন্য যে ব্রাশ দেখা যায় অনেকটা সেরকম, তবে ব্রাশের প্লাস্টিক লোমশ জায়গায় কাপড় বাঁধা। তবে এই উপকরণ কি মানুষের পায়ু-অঞ্চল পরিষ্কারের কাজে ব্যবহৃত হতো নাকি বাথরুম পরিষ্কারের কাজে ব্যবহৃত হতো তা নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষকদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। কারো দাবি এটা ল্যাট্রিনের অংশ পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহৃত হতো আবার কারো মতে তা পায়ু-অঞ্চল পরিষ্কারে ব্যবহৃত হতো (Blakemore, 2020)। রোমান সভ্যতায় বিভিন্ন প্রাসাদ বা প্রশাসনিক দপ্তরগুলোতে বাথরুমগুলো একজনের জন্য আলাদা করে ভাগ করা ছিলোনা, বরং একটা রুমের মধ্যে অনেকে একসাথে মলমূত্র ত্যাগ করতো। কিছু গবেষকের মতে, এই ধরনের বাথরুমগুলোতে একটাই টেরোরিয়াম থাকতো, যা দিয়ে সকলেই পরিচ্ছন্নতার কাজ করতো। আমাদের বর্তমান পরিচ্ছন্নতার বাস্তবতায় এ বিষয়গুলো অনেকটা বিস্ময়কর বলে মনে হলেও, সে সময়ের বাস্তবতায় সেই চর্চাগুলো ছিল আধুনিক, উন্নত এবং পরিচ্ছন্ন।

ইতিহাসে গ্রিক এবং রোমান সভ্যতায় একধরনের সিরামিক পাথর ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়, যাকে পেসোই (pessoi) নামে ডাকা হতো (Mirsky, 2013)। প্রত্নতাত্ত্বিকরা আনুমানিক দুই হাজার বছর আগের এধরনের পাথরখণ্ড আবিষ্কার করেছেন। তবে গবেষকদের মতে, এগুলোই প্রাচীন নিদর্শন না। ১৯৯২ সালে কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক চীনের প্রাচীন সিল্ক রোডে দুই হাজার বছর আগের এক ধরনের উপকরণের নিদর্শন পায় যা সালাকা (salaka) নামে পরিচিত। এটা ছোট লাঠি বা বাঁশের কঞ্চির এক মাথায় কাপড় বেঁধে ব্যবহার করা হতো (Ponti, 2020)। বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম জীবাশ্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তা প্রমাণিত হয়। কাছাকাছি সময়ে জাপানিজরা পাতলা কাঠের মাঝারি সাইজের কাঠি ব্যবহার করতো বলে ইতিহাসবিদরা দাবি করেন। এই ধরনের কাঠিগুলোর যে দিকটা হাত দিয়ে ধরা হতো সেদিকটা চিকন এবং এর বিপরীত দিকটা একটু চওড়া কিন্তু পাতলা ও মসৃণ হতো।

পায়ু-অঞ্চল পরিষ্কার করার ইতিহাসে কাগজ ব্যবহারের ইতিহাস খুব বেশি প্রাচীন নয়। এর প্রথম নিদর্শন দেখা যায় ষষ্ঠ শতকে মাদিভাল চায়নায় যা মঙ্গোলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইয়েন চি-থুই নামক এক চৈনিক মনিষী ৫৮৯ খ্রিস্টাব্দে তার এক লেখায় একটি কাগজের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “এই কাগজে পাঁচজন ঋষিদের নাম এবং তাদের উদ্ধৃতি আছে, আমি এই কাগজকে টয়লেটের জন্য ব্যবহার করতে পারিনা”; (Ponti, 2020)। এই বক্তব্য প্রমাণ করে সে সময়ে টয়লেটে কাগজের ব্যবহার ছিল। অর্থাৎ, ষষ্ঠ শতকের কাছাকাছি সময়ে এশিয়ার কিছু অঞ্চলে কাগজের ব্যবহার শুরু হয়, এবং এই অঞ্চলের কাগজ শিল্পের বিকাশের সাথেও এর সম্পর্ক ছিল।

বাথরুম বা টয়লেট এর ব্যবহারের সাথে সামাজিক ক্রমোচ্চতার ধারণা জড়িত। কে কোথায় মল ত্যাগ করে তা দিয়ে সমাজে শ্রেণি বিন্যাসের ধরনও দেখা যায়, এবং এর সাথে বাথরুম বা টয়যলেট ব্যবহারের পর কে কী ধরনের উপকরণ ব্যবহার করতো, তাও প্রাকৃতিক পরিবেশ, সংস্কৃতি, সমাজ, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। যেহেতু আমরা ইতিহাসে মূলত অধিপতি শ্রেণির গল্পগুলো জানি, তাই তাদের ব্যবহৃত উপকরণ সম্পর্কেই বেশিরভাগ সময় জানা যায়। ইতিহাসে টিস্যু পেপার ঠিক কোন অঞ্চলে প্রথম ব্যবহার শুরু হয়েছে এর কোনও সুনিদির্ষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না, তবে বিভিন্ন উপাত্তের ভিত্তিতে অনেকেই ধারণা করেন, যে অঞ্চলে কাগজ শিল্পের বিকাশ দ্রুত ও অধিক পরিমাণে হয়েছে সেখানেই টিস্যু পেপারের আগমন ঘটেছে। সে বিবেচনায় তাদের মতে, এশীয় অঞ্চলেই কাগজ বা টিস্যুর ব্যবহার প্রথম শুরু হয়েছে। ইতিহাসে দেখা যায়, চৌদ্দশ শতকের দিকে চীনারা বছরে প্রায় এক কোটি প্যাকেট টিস্যু পেপার উৎপাদন করতো (Ponti, 2020)। সে সময়ে বর্তমানের মতো গোল করে মোড়ানো অবস্থায় টিস্যু পাওয়া যেত না, বরং ১০০০-১০০০০ পিসের কাগজের প্যাকেট পাওয়া যেত। ১৩৯৩ সালের দিকে হংউ সম্রাটের রাজপরিবারের জন্য অসংখ্য সুগন্ধি টিস্যু পেপার উৎপাদন করা হয় বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করে (Ponti, 2020; Blakemore, 2020)। যদিও এশীয় অঞ্চলে বাথরুমের পরে কাগজ বা টিস্যু পেপারের ব্যবহার অনেক দেখা যায়, কিন্তু এর বৈষয়িক বাজারজাতকরণ দেখা যায়নি, যা পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে পরবর্তীতে দেখা যায়।

পনের শতকের দিকে দুনিয়াজুড়ে কাগজ উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, কিন্তু ১৮৫৭ সালের আগ পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে টিস্যু পেপারের আগমন ঘটেনি। জোসেফ গ্যাটি নামক এক ব্যবসায়ী প্রথম বাণিজ্যিকভাবে টয়লেট পেপার নামে ৫০০পিস টিস্যুর প্যাকেট বাজারে নিয়ে আসে। একে এমনভাবে প্রচার করা হয় যা খুব দ্রুতই আমেরিকান সমাজে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রশ্ন জাগতেই পারে, তাহলে আমেরিকানরা আগে কী ব্যবহার করতো? এমন প্রশ্নের খোঁজে ব্যারি কুড্রোউইটজ নামক এক অধ্যাপক তার গবেষণায় দেখান, সতের শতাব্দী পর্যন্ত আমরিকায় ভুট্টার শাঁস একটি বহুল ব্যবহৃত উপকরণ। ভুট্টা খাওয়া বা ব্যবহারের পর ভেতরের অংশকে সংরক্ষণ করা হতো, এবং তা টয়লেট টিস্যু পেপারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হতো (Ponti, 2020; Blakemore, 2020)। আঠারো শতকের শুরুর দিকে সংবাদপত্র এবং ম্যাগাজিনের আগমন ঘটে, এবং খুব দ্রুতই জনপ্রিয়তা লাভ করে। অর্থবানরা সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিন কিনতে শুরু করেন এবং খবরের চাহিদা শেষ হলে তা টয়লেটের চাহিদা পূরণে সহায়তা করে।

১৮৫৭ সালের পর টয়লেট টিস্যু পেপার মানুষের চাহিদা পূরণের জন্য ধীরে ধীরে ধরন বদলাতে থাকে এবং মানুষের অধিক ব্যবহার উপযোগী হিসেবে বানানো শুরু হয়। কিন্তু দ্রুত তা জনপ্রিয় হতে পারেনি, কারণ এর জন্য অনেক বাড়তি খরচ করতে হতো (Ponti, 2020)। এর মধ্যেই ১৮৯০ সালে প্রথম রোল করা টিস্যুর প্যাকেট আসে বাজারে, যা নিরবিচ্ছিন্নভাবে টিস্যু সরবরাহ করতো, এবং প্রতিটি টিস্যুর ভেতরে আলাদা খাঁজকাটা থাকতো যেন নির্দিষ্ট প্রয়োজনে ছেড়া যায়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে টিস্যুপেপার জনপ্রিয় হয়ে উঠার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে ম্যাগাজিন বা পত্রিকার কাগজ বাথরুমের পাইপে আটকে যেতো এবং তা পরিষ্কার করা কষ্টকর ও খরচ সাপেক্ষ বিষয়। টয়লেট টিস্যুর কাগজের ধরন একটা সমস্যাজনক বিষয় ছিল, কারণ তা যথেষ্ট পরিমাণ নরম এবং শোষণক্ষমতা সম্পন্ন ছিল না । ১৯৩৫ সালের দিকে প্রথম নরম টয়লেট টিস্যু বাজারে আসে যা অনেকের মতে টিস্যু পেপারের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধন করেছে (Blakemore, 2020)।

টিস্যু পেপারকে সভ্যতার একটি নিদর্শন হিসেবে দেখা যায়। টয়লেট টিস্যুর বিজ্ঞাপনে প্রথমেই যে বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয় তা হচ্ছে, হাইজিন বা স্বাস্থ্যসম্মত পরিচ্ছন্নতা। এই স্বাস্থ্যগত পরিচ্ছন্নতাকে আবার সভ্যতার একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হাইজিন বা পরিচ্ছন্নতার ধারণা থেকে আসা টিস্যু পেপার সময়ের পরিক্রমায় নানা ধরনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী। বিশের উন্নত দেশগুলোতে টিস্যু পেপার ব্যবহার অনেক বেশি দেখা যায়। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে টিস্যু পেপার ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম ধরনগুলো হচ্ছে: হাইজেনিক টিস্যু, ফেশিয়াল টিস্যু, টয়লেট টিস্যু, পেপার টাওয়াল, র‍্যাপিং টিস্যু, টেবিল ন্যাপকিন ইত্যাদি। হাইজেনিক টিস্যু পেপার যা মুখ বা হাতকে পরিষ্কার করার কাজে ব্যবহার করা হয়। ফেশিয়াল টিস্যু মূলত মুখ মোছার জন্য ব্যবহৃত হয়। পেপার টাওয়াল মূলত দুই পরতের টিস্যু দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবহৃত টিস্যু হিসেবে পরিচিত। এছাড়াও টিস্যু পেপার বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয় যেমন, ১৯৭০ এর দশকে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে সাউন্ড-বক্সের সাউন্ড নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হতো। এছাড়া রাস্তা নির্মাণে কিংবা প্যাকেজিং শিল্পেও প্রচুর পরিমাণে টিস্যু পেপার ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে টিস্যু পেপারের শিল্পে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে অসংখ্য কোম্পানি বাণিজ্যিক ভাবে টিস্যু পেপার উৎপাদন করে। টিস্যু পেপার এখন এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যে কোন রেস্টুরেন্টে যদি টিস্যু পেপার না দেওয়া হয়, তবে তা মহা-অন্যায় হিসেবেই বিবেচিত হয়। আবার, কোন অফিসে কারো রুমে যদি টিস্যু পেপার না থাকে, এটা একটা ইজ্জতের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় অনেক ক্ষেত্রে। কিন্তু গত এক দশক আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে কমদামী খাবার হোটেলগুলোতে খাওয়ার পরে পত্রিকার ছেঁড়া অংশ দেওয়া হতো হাত মোছার জন্য। এখনও যে একদম দেখা যায় না, এমনটা না, তবে তা দেখে এখন অনেকেই হাসতে পারেন।

বাসা-বাড়ি, অফিস আদালত, গাড়িতে, হোটেলে, খাবারের দোকানে বিভিন্ন জায়গায় টিস্যু পেপার ব্যবহার করা হয়। টিস্যু পেপার উৎপাদনের জন্য পৃথিবীতে প্রচুর পরিমাণে গাছ কাটা হচ্ছে প্রতিদিন। টিস্যু পেপারের কাঁচামাল হিসেবে অনেক ধরনের গাছ ব্যবহৃত হয়। বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০ শতাংশ পরিমাণ বন উজাড়ের কারণ টয়লেট টিস্যু পেপার এবং এটা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩০ শতাংশ জনগণ ব্যবহার করে (Bochniak, 2021)। গবেষকদের দাবি, প্রতিদিন টয়লেট টিস্যু ব্যবহারের মাধ্যমে সাতাশ হাজার গাছ বাথরুমে আমরা কমোডে ফ্ল্যাশ করি (প্রাগুক্ত)। অন্যদিকে, এই বৃক্ষ নিধনের ফলে বেশ কিছু কোম্পানি পুনরায় ব্যবহার উপযোগী ফাইবার ব্যবহার করে টিস্যু পেপার উৎপাদন করছে। অনেকে দাবি করেন, টিস্যু পেপার অনেক ক্ষেত্রে ভালো, কারণ এর মাঝে অপ্রাকৃতিক উপাদান নেই, এবং তা দ্রুতই মাটিতে বা পানিতে মিশে যায়, যার ফলে তা পরিবেশের কম ক্ষতি করছে, অন্তত প্লাস্টিক বা পলিথিনের তুলনায়। অন্যদিকে, বিশ্বের অনেক নামীদামী রেস্টুরেন্ট তাদের খাবারের টেবিলে টিস্যু পেপার পরিবেশন করেনা, বরং পরিচ্ছন্ন কাপড়ের টেবিল ন্যাপকিন প্রদান করে খাবারের সময়, যা অনেকবার ব্যবহার উপযোগী এবং পরিবেশবান্ধব।

২.

এতো গেল টিস্যু পেপারের ইতিহাস এবং বিশ্বব্যাপী টিস্যুর ব্যবহারের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। এখন একটু মন দিতে চাই বাংলাদেশে টিস্যুর ব্যবহারের সামাজিক চর্চার উপর। এই চর্চার জায়গাটা মূলত নগর ও তথাকথিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিকেন্দ্রিক। টিস্যুর সাথে নগর মনস্তত্ত্বের একটা সম্পর্ক আছে এবং নগর জীবনের আলোকে বিভিন্ন শ্রেণি মানুষের টিস্যুর সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ এর মাধ্যমে টিস্যু পেপারের সামাজিক চর্চা ও এ কেন্দ্রিক ক্ষমতার সম্পর্কের ধরনকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই বিশ্লেষণগুলো যে একেবারেই অকাট্য সত্য, এমনটা নাও হতে পারে, তবে মিলিয়ে দেখতে দোষ কী!

বাংলাদেশে এখন বিভিন্ন দামের ও মানের টিস্যু পেপার পাওয়া যায়। দামী খাবারের দোকানে এক ধরনের নরম নরম টিস্যু দেওয়া হয়, যেখানে তাদের দোকানের বা কোম্পানির লোগো থাকে। এগুলো আবার একটি বা একাধিক নির্দিষ্ট ধরনে ভাঁজ করা থাকে, যাতে এক ধরনের আভিজাত্যের বহির্প্রকাশ ঘটে। এই টিস্যুগুলো পরিবেশন করার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের হোল্ডার বা ধারক ব্যবহার করা হয়। এই টিস্যু পেপারগুলো ওই নিদিষ্ট খাবারের দোকানে কিংবা প্রতিষ্ঠানেই ব্যবহৃত হয়। এছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদের কোম্পানির লোগো বা নামসহ টিস্যু পেপার তৈরি করে, যা একভাবে সেই কোম্পানিগুলোর মার্কেটিং এর কাজও করে থাকে।

অন্যদিকে কমদামী খাবারের রেস্তোরাঁগুলোতে একটু শক্ত কিন্তু পাতলা ধরনের টিস্যু দেওয়া হয়, যা আবার মান ভেদে আলাদা। অনেক খাবারের দোকানে একসময় এক বা দুইয়ের বেশি টিস্যু দিতে চাইত না, এখনও অনেক দোকানে দিতে চায় না। এই টিস্যু পেপারের দাম এবং ভোক্তাদের চাহিদার সমন্বয় না হলে খাবারের দোকানের মেসিয়াররা বেশি টিস্যু দিতে চান না। এক্ষেত্রে, যে সকল রেস্টুরেন্টে প্রচুর মানুষ খায়, সেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি টিস্যু পেপার দেয়ার প্রবণতা দেখা যায় খাবার সরবরাহকারীদের মাঝে। অর্থাৎ, খাবারের দোকানের ভোক্তার সংখ্যার সাথে টিস্যু পেপারের ব্যবহার একভাবে সম্পর্কযুক্ত। অন্যদিকে, যে সকল রেস্তোরাঁয় খাবারের দাম কম রাখে, তারা অধিক টিস্যু দিতে নারাজ থাকে অনেক সময়। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় কিছু কিছু দোকানে ক্যাশিয়ার এর কাছে টিস্যুর বাক্স মজুদ থাকে। খাবার শেষে হাত ধোওয়ার পরে বিল দিতে যাওয়ার সময় ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে টিস্যু সংগ্রহ করতে হয়। তবে এই ধরনের চর্চা ইদানিং বেশ কম দেখা যায়।

এই টিস্যু পেপার একটা রেস্তোরাঁর ওয়েটার বা মেসিয়ারকে মূল্যায়ন করার একটা মাধ্যম হিসেবেও বিবেচনা করেন অনেকে। যেহেতু বাংলাদেশ আমরা হাত দিয়ে খাই, খাবার আগে একবার হাত ধুতে হয় এবং পরে একবার ধুতে হয়। এই দুইবার হাত ধোয়ার পর যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ টিস্যু পেপার ওয়েটার না দেয়, তবে অনেকেই এটাকে একটা ‘ছোট অপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করেন, এবং এই টিস্যু পেপার বেশি চাওয়া, এবং বিপরীতে না দিয়ে চাওয়া নিয়েও ঝগড়া হতে দেখা যায় এই দেশে। আবার ক্রেতা বা ভোক্তা হিসেবে আপনাকে কতটা মূল্যায়ন করছে এর বহির্প্রকাশও ঘটানোর চেষ্টা করা হয় এই টিস্যু পেপারের মাধ্যমে। অনেক সময়, আপনি না চাইতেই আপানার টেবিলে অনেকগুলো টিস্যু দিয়ে যাওয়া কিংবা খাবার আগে হাত ধুয়ে ফেরার সময় একাধিক টিস্যু পেপার দেওয়াকে অনেকে ভদ্রতা বা সৌজন্যতা বলে মনে করেন। খাবার দেওয়ার আগে চোখের সামনে টিস্যু পেপার দিয়ে গ্লাস প্লেট মুছে দিলে অনেকের অন্তরে এক ধরনের প্রশান্তি লাভ হয়, এবং তা ওয়েটারের সাথে সম্পর্ক ভালো করতে সহায়তা করে। একইভাবে এর বিপরীত ঘটনাগুলো অনেকের মাঝেই ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয় যেখানে অসন্তোষ, ঝগড়া কিংবা বাকবিতণ্ডার মতো ঘটনাগুলো ঘটতে দেখা যায়।

বাংলাদেশে টিস্যু পেপার এর সাথে নিরাপত্তাবোধের একটা সম্পর্কও দেখা যায়। আমাদের দেশে সব কিছুতেই মানুষের একটা নিরাপত্তাহীনতার আশংকা দেখা যায়, সেটা টিস্যুর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বর্তমান সময়ে অনেকেই আছেন তার কাছে যদি টিস্যু না থাকে তবে তিনি খুবই অনিরাপদ বোধ করেন। এই নিরাপত্তাহীনতা জীবনের নিরাপত্তাহীনতার মতো নয়, কিন্তু, এর না থাকা অনেকের মনেই পীড়া দেয়। এর জন্য অনেকের ব্যাগে বা পকেটে অব্যবহৃত টিস্যু পেপার থাকে। টিস্যু শুধু হাত বা মুখ মোছার জন্যই না, হঠাৎ উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্যও ব্যবহৃত হয়। যেমন, হঠাৎ কোন জায়গা থেকে ময়লা এসে গায়ে পড়া কিংবা পাখির মল গায়ে পড়া কিংবা রসালো কোন খাবার খাওয়ার পরে অথবা অন্য যে কোন জরুরি প্রয়োজনে টিস্যু পেপার দরকার হতে পারে। অনেকে ব্যাগের টিস্যু হয়তো এক বছরেও ব্যবহার করেননি, কিন্তু তবুও ব্যাগের কোনায় বা পকেটে রেখে দেয়, অজানা শঙ্কায়। আমাদের সমাজে নানা ধরনের নিরাপত্তাহীনতাবোধের এটি একটি বহির্প্রকাশ হিসেবেই আমি দেখি। আবার কেউ কেউ কোথাও ফ্রি টিস্যু পেলে বাড়তি দুই তিনটি টিস্যু নিয়ে পকেটে বা ব্যাগে রাখেন। এটাকে আমি চুরি অর্থে না দেখে সেই অনিরাপত্তার জায়গা থেকেই দেখতে চাই।

আমাদের দেশে রুমালের ব্যবহার এখন অনেকাংশেই কমে গেছে বলে দাবি করাই যায়, বিপরীতে এর জায়গায় টিস্যুর ব্যাপক প্রচলন ঘটেছে। নগরের মধ্যবিত্ত সমাজ এখন টিস্যু নির্ভর সমাজ। কাউকে দ্রুত টিস্যু এগিয়ে দেয়া শুধু রেস্টুরেন্টের দেয়ালেই সীমাবদ্ধ না, বরং ঘরের ভেতর থেকে অফিস কিংবা নগরের বিভিন্ন পরিসরে, সব জায়গায় টিস্যুকেন্দ্রিক একটা জাল দেখা যায়। টিস্যুকে পবিত্রতার ধারণা থেকেও এখন গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। কোন একটা পাবলিক বাথরুম বা টয়লেটে যদি টিস্যু না থাকে, তবে সেটাকে খারাপ হিসেবে সবাই দেখেন না, আবার সবাই ভালো চোখেও দেখেন না। যেমন, কোন একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের টয়লেটে যদি টিস্যু না থাকে তবে অনেকের কাছে খারাপ লাগতে পারে, এটা নির্ভর করে সে ব্যক্তি কী ধরনের টিস্যু কেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বসবাস করছেন। তিনি যদি খুব টিস্যু-সংশ্লিষ্ট সমাজে থেকে থাকেন, তবে এই না থাকাটা তার কাছে খারাপ মনে হবে, আবার এর বিপরীত বাস্তবতা থেকে আসা ব্যক্তির কাছে এই টিস্যু না থাকা কোনও পার্থক্য তৈরি করবেনা। বরং সেখানে টিস্যু থাকলে তিনি খুশি হতে পারেন। ইদানিং বিভিন্ন বাসে বা সিএনজি চালিত অটোরিকশায় ড্রাইভারের পেছনে টিস্যুর একটা রোল দেখে অনেকেই যেমন অবাক হন, তেমনি অনেকেই একে বাহবাও দেন। অর্থাৎ, কারো কাছে টিস্যু থাকা অনেকের কাছে বিচক্ষণতার প্রতীক হিসেবে ধরা দেয়, আবার কারো কাছে এটা ‘নতুন’।

বাংলাদেশে আমরা সাধারণত হাত দিয়েই খাবার খেয়ে থাকি, বিশেষ করে বাসা-বাড়িতে। হাত দিয়ে খাবার গ্রহণের পরে হাত পরিষ্কার করার পরে অনেকে গামছা বা টাওয়াল দিয়ে হাত না মুছে টিস্যু ব্যবহার করেন। বিশেষ করে, বাসায় যখন অতিথি আসে, তখন অনেক গৃহস্থালিতে খাবারের পর টিস্যু পেপার দেয়া একটা সৌজন্যতার প্রতীক হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে, তবে অবশ্যই এটা সেই পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতার উপর নির্ভর করে। অন্যদিকে, শহুরে রেস্তোরাঁয়ও খাবারের সাথে এবং খাবারের পরে টিস্যু প্রদান করা এক ধরনের বাধ্যতামূলক কাজ। টিস্যু পেপারে মান যেমনই হোকনা কেন, খাবারের সাথে ও পরে এটা দিতেই হয় মালিকপক্ষকে। বাসায় কিংবা রেস্তোরাঁয়, টিস্যু ব্যবহার করার পর সেটা কোথায় ফেলা হচ্ছে সেটাও একটা পর্যবেক্ষণের বিষয়। এই ব্যবহৃত টিস্যু পেপার আপনি কোথায় ফেলছেন, সেটা দিয়ে অনেকেই আপনার পরিচ্ছন্নতাবোধের বিচার করে থাকে, কিংবা আপনিও করে থাকেন। বাংলাদেশের খাবারের দোকানগুলোতে, বিশেষ করে ‘ভাতের হোটেল’ নামে যে রেস্তোরাঁগুলো পরিচিত, সেগুলোর প্রায় প্রতিটি টেবিলের পাশেই একটা ঝুড়ি দেওয়া থাকে, টিস্যু ও অন্যান্য ময়লা ফেলার জন্য। তারপরেও টেবিলের নিচে, চেয়ারের পাশে বিভিন্ন জায়গায় টিস্যু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, যা একভাবে অপরিচ্ছন্নতাকে নির্দেশ করে। অন্যদিকে, একই ব্যক্তি, যিনি ‘কম-দামী’ বা ‘সস্তা’ হোটেলে টিস্যুর ব্যবহার নিয়ে অসচেতন, তিনিই আবার দেখা যায় ‘দামী’ রেস্তোরাঁতে ব্যবহৃত টিস্যুটি যত্নসহকারে ফেলছেন। আবার অনেকে যথা স্থান পাওয়া না গেলে টিস্যুগুলো ব্যাগ বা পকেটে রেখে দেন। অর্থাৎ, টিস্যুর ব্যবহার ও এর পরে তা কী করে, সেটা ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, পরিবেশ ও পারিপার্শিকতার সাথে সম্পর্কিত। ব্যক্তি তার আশেপাশের পরিবেশ, স্থান এবং সময় এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়, যা এই ক্ষুদ্র চর্চাগত জায়গাগুলো খেয়াল না করলে অনেক সময় বোঝা যায় না।

যারা দৈনন্দিন জীবনে টিস্যু ব্যবহার করেন না, তারাও একভাবে টিস্যু পেপারের চক্রের সাথে সম্পর্কিত। বিভিন্ন এলাকায় রিক্সাচালকদের পকেটে একটা পাতলা প্লাস্টিকের ব্যাগে টাকা রাখতে খেয়াল করেছেন হয়তো। অধিকাংশ সময়ে রিক্সাচালকরা গায়ের ঘাম এবং বৃষ্টি থেকে টাকাগুলোকে বাঁচানোর জন্য ফেশিয়াল টিস্যুর মিনিপ্যাক এর প্লাস্টিকের মোড়কটা ব্যবহার করেন। এই মোড়কটা কোথা থেকে সংগ্রহ করেন, এমন প্রশ্ন বেশ কয়েকজন রিক্সাচালককে করা হয়েছিল, যাদের অধিকাংশ তা রাস্তার পাশে পড়া অবস্থা থেকেই সংগ্রহ করেছেন বলে জানিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন তারা জানেন এটা টিস্যুর প্যাকেট, কিন্তু এটা তারা কিনে সংগ্রহ করেননি, কুড়িয়ে পেয়েছেন। টাকা রাখার জন্য বেশ নিরাপদ একটি ব্যাগ হিসেবে স্বাচ্ছন্দে ব্যবহার করতে পারছেন। এভাবে টিস্যুর বিভিন্ন বাক্স বা ভেতরের রোল দিয়ে DIY বা নিজে করি আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিভিন্ন জিনিস বানানোর নজির দেখতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, টিস্যু পেপারের ব্যবহারের পরিসর এখন কোন একটি নির্দিষ্ট এককে নেই। এর পরিধি বা বিস্তৃতি অনেক বিশাল জায়গায় চলে গিয়েছে, যেখানে এর নির্দিষ্ট কোন একক চরিত্র বের করা কঠিন। তবে টিস্যু পেপার যে সমাজ অধ্যায়নের একটা ছোট একক হতে পারে এ বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। আমরা চাইলে এরকম অনেক প্রাত্যহিক ব্যবহার্য উপাদান দিয়ে সমাজ অধ্যায়ন করার চেষ্টা করতে পারি, যার মধ্য দিয়ে সমাজের ক্ষমতার সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্পর্ককে অধ্যায়ন করা সম্ভব।

খাবারের পরে টিস্যু কি করছেন সেটা পরিচয় দেয় ব্যক্তির পরিচ্ছনতাবোধের। কে কোথায় টিস্যু ফেলে, কিভাবে ফেলে, তা বিস্তর পর্যবেক্ষণ করা দরকার। অনেকে টিস্যু ব্যবহার করে রেখে দেয়, পরে আবার ব্যবহার করার জন্য। এর সাথেও অনিরাপত্তার ধারণা যুক্ত। আবার অনেক টিস্যু ব্যবহারের পর যেখানে সেখানে না ফেলার জন্যও পকেট বা ব্যাগে রেখে দেয়। তাচ্ছিল্যের প্রতীক হিসেবে টিস্যুকে ব্যবহার করি আমরা দৈনন্দিন ব্যবহার্য ভাসায়। যেমন, ‌‌“‌যারা টিস্যুর মতো তোমাকে ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে’’— এখানে টিস্যু খুব সামান্য একটি ব্যবহার উপযোগী জিনিস হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু টিস্যু কি, এতটাই সামান্য জিনিস?

তথ্যসূত্র

Blakemore, E. (2020, March 31). What did people do before toilet paper? National Geographic Society. https://www.nationalgeographic.com/history/article/what-people-do-before-toilet-paper সর্বশেষ ভিজিটঃ ২০ মে, ২০২২


Bochniak, L. (2021, April 21). Flushing Down Our Forests: Toilet Paper and Other Deforestation Issues. 89 Initiatives. https://89initiative.com/flushing-down-our-forests-toilet-paper-and-other-deforestation-issues/ সর্বশেষ ভিজিটঃ ২০ মে, ২০২২

Mirsky, S. (2013, March 1). Toilet Issue: Anthropologists Uncover All the Ways We've Wiped. An analysis of old customs makes us privy to a slice of ancient life. Scientific American. https://www.scientificamerican.com/article/toilet-tissue-anthropologists-uncover-all-the-ways-weve-wiped/ সর্বশেষ ভিজিটঃ ২৩ জুন, ২০২২
Pontiaor, C. (2020, April 15). All the Ways We’ve Wiped: The History of Toilet Paper and What Came Before. History Stories. https://www.history.com/news/toilet-paper-hygiene-ancient-rome-china সর্বশেষ ভিজিটঃ ২০ মে, ২০২২

Pugh, B. (2020). Did You Know That Toilet Paper Can Be Dangerous To Your Health?

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক