‘আইনের শাসনে’র সুলুক সন্ধানে

এ বি এম খায়রুল হক
Published : 7 Oct 2021, 04:01 PM
Updated : 7 Oct 2021, 04:01 PM

আইনের শাসন বা Rule of Law অর্থ আইন দ্বারা শাসন নয়, বরং আইনই যেন শাসন করে। অধ্যাপক জে. রাজ এর ভাষায়-

"The rule of law- means literally what it says: The rule of the law. Taken in its broadest sense this  means that people should obey the law and be ruled by it." 

           ('মাইকেল জে. অ্যালেন এবং ব্রায়ান থম্পসন: কেইসেস অ্যান্ড  ম্যাটেরিয়ালস অন কনস্টিটিউশনাল অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ল' এর ১৬৭ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত)

থমাস পেইন ১৮ শতকে আমেরিকায় এসে বলেছিলেন, 'In America the law is King' । কেন এই কথা তিনি বলেছিলেন তা পরে বলছি।

এর আগে আইনের শাসন সম্বন্ধে কিছু আলোচনা প্রয়োজন। উল্লেখ্য যে অধ্যাপক, কে আলবার্ট ভ্যান ডাইসি-কে 'আইনের শাসন তত্ত্ব' এর প্রবক্তা বলা হলেও মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উইলিয়াম ই. হার্ন তার 'গভর্নমেন্ট অব ইংল্যান্ড: ইটস স্ট্রাকচার অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট' গ্রন্থে (১৮৬৭) সর্বপ্রথম 'Rule of Law' অভিধাটি উদ্ভাবন (coined) করেন। অধ্যাপক এ. ভি. ডাইসি ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'ইনট্রোডাকশন টু দ্য স্টাডি অব দ্য ল অব দ্য কনস্টিটিউশন' এ এর স্বীকৃতিও প্রদান করেন।

অধ্যাপক ডাইসি তার গ্রন্থে আইনের শাসন সম্বন্ধে বিস্তারিত তাত্ত্বিক আলোচনা সর্বপ্রথম অবতারণা করেন। ১৮৮৫ সালে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন সাংবিধানিক অবস্থান থেকে আইনের শাসন সম্পর্কে অধ্যাপক ডাইসি যে ব্যাখ্যা প্রথমে দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে তার কিছুটা অবশ্য পরিমার্জন করেন।

আইনের শাসন সম্বন্ধে অধ্যাপক ডাইসি-র ব্যাখ্যার সাথে স্যার ডাব্লিউ আইভর জেনিং-সহ অনেকেই দ্বিমত পোষণ করলেও আইনের এই পদ্ধতিগত ব্যবহার মানুষের অধিকার সংরক্ষণের এক নয়া দিগন্তের উন্মোচন করে। আবার এও সত্য যে পূর্বে হয়তো এই নামে এ পদ্ধতির পরিচিতি না থাকলেও সভ্যতার উন্মেষের সাথে সাথে এ ধারণা দুই-তিন হাজার বছর থেকেই বিদ্যমান ছিল।

আইনের শাসন ধারণাটি বিশ্লেষণ করার পূর্বে আইন ও আইনের অগ্রগতির ইতিহাস এবং আইনের শাসন নামে না হলেও এই বিশেষ মেকানিজম বা পদ্ধতির প্রয়োগ ছিল কিনা তা দেখা প্রয়োজন।

প্রথমেই বিবেচনা করা প্রয়োজন 'আইন' অর্থ কী? মোটা দাগে আইন অর্থ এমন কিছু বিধি-বিধান, যা মানুষ ও তার সামাজিক সম্পর্ককে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যাতে অত্যাচারী তার অত্যাচারের মাত্রা অনুসারে শাস্তি পায়, কেউ অন্যের ক্ষতি সাধন করলে যতদূর সম্ভব ক্ষতির পরিমাপ অনুসারে ক্ষতিপূরণ করা হয়, কারো অধিকার খর্ব হলে তার প্রতিবিধান করা যায়, যেই সকল কার্যাদি রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত, অনুশাসন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং আদালতের মাধ্যমে কার্যকর, তাই আইন। তবে আইনকে অবশ্যই সার্বজনীন, সমভাবে প্রয়োগযোগ্য এবং সুনির্দিষ্ট হতে হবে।

এমনকি ২১০০ বছর আগে রোম নগরীতে মনে করা হতো যে আইনই দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করে, ন্যায় ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে। তখনকার রোমের প্রথিতযশা কৌশুলী, বক্তা ও রাজনীতিবিদ মার্কাস টুলিয়াস সিসেরো (খ্রিস্টপূর্ব ১০৬-৪৩) তার 'দ্য ল-জ' গ্রন্থে আইনের অবস্থান সম্বন্ধে এরকম ব্যাখ্যা প্রদান করেন:

"… There is no doubt, as the law should correct wickedness and promote goodness, a code of conduct may be derived from it …

(দ্য লজ, বুক ১, ৫৮, অনুবাদ নিয়াল রাড, পৃষ্ঠা ১১৮)

অন্যত্র তিনি বলেন:

"… We are taught that every law (or at least those which are properly entitled to the name) is praiseworthy by arguments such as these: it is agreed, of course, that laws were devised to ensure the safety of citizens, the security of states, and the peaceful happy life of human beings; …. So when it come to interpreting the word, it is clear that inherent in the very name of law is the sense and idea of choosing what is just and right…"

সিসেরো আইনের অর্থ করেন-

"… Therefore law means drawing a distinction between just and unjust …"

           (দ্য লজ, বুক- ২, ১১, ১৩ অনুবাদ নিয়াল রাড, পৃষ্ঠা ১২৫, ১২৬)

অধ্যাপক জর্জ হোয়াইটক্রস প্যাটন তার লিখিত 'টেক্সট বুক অব জুরিসপ্রুডেন্স' গ্রন্থে আইনকে এভাবে বর্ণনা করেন-

"Law may shortly be described in terms of a legal order tacitly or formally accepted by a community. It consists of the body of rules which are seen to operate as binding rules in that community, backed by some mechanism accepted by the community by means of which sufficient compliance with the rules may be secured to enable the system or set of rules to continue to be seen as binding in nature."

           (জি. ডাব্লিউ প্যাটন, আ টেক্সটবুক অব জুরিসপ্রুডেন্স' ফোর্থ এডিশন. ১৯৭২, ৯৭ পৃষ্ঠা হতে উদ্ধৃত)

সভ্যতার আদি পর্বে আইন লিখিত আকারে সহজলভ্য ছিল না। দেশীয় রীতিনীতি, রাজা-মহারাজাদের ঘোষণা ও সিদ্ধান্তই ছিল আইনের উৎস যা কখনই লিখিত ছিল না। সাধারণ জনগণ আইন সম্বন্ধে অন্ধকারেই থাকত, ফলে প্রভাবশালীরাই এই সুযোগে তাদেরকে শোষণ করত। এ কারণে জনসাধারণের সম্মুখে দেশের প্রচলিত আইন লিখিত আকারে প্রকাশ করার প্রথম প্রচেষ্টা নেন খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ১৭০০ বছর পূর্বে মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের রাজা হাম্মুরাবি। গত শতাব্দীতে প্রত্নতত্ত্ববিদরা মেসোপটেমিয়া এলাকায় অনেকগুলো ফলক উদ্ধার করে যেখানে ওই দেশের প্রচলিত আইনগুলো লিপিবদ্ধ ছিল। সেই অতো বছর আগের ফলকে এই বিধানও লিখিত ছিল, যে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তকে নিরপরাধ গণ্য করা হবে, এও সে সময়ের আইনের শাসনের এক উদাহরণ। কালের প্রবাহে রাজা হাম্মুরাবি ও তার তৈরি আইনের ফলক ইতিহাসের নিচে চাপা পড়ে যায়।

একই সমস্যা এথেন্সেও ঘটেছিল। ওই নগর-রাষ্ট্রেও কোনো আইন লিপিবদ্ধ ছিল না। ফলে অশিক্ষিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সরলতার পূর্ণ সুযোগ ধনী প্রভাবশালীরা গ্রহণ করে তাদের শোষণ করত, তাদের সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিদ্যমান আইনের সুযোগ গ্রহণ করে আত্মসাৎ করত, খাতক ও তার পরিবারবর্গকে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রয় করত। ধীরে ধীরে সাধারণ জনগণ বিদ্যমান আইনে তাদের অধিকার সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী হলো এবং আইনগুলি লিখিত আকারে প্রকাশ করার দাবি প্রবলভাবে জানাতে থাকে। অভিজাত শ্রেণি বহুবছর তাদের দাবি না মানলেও অবশেষে ড্রাকো নামে এক ম্যাজিস্ট্রেটকে বিদ্যমান আইনগুলি লিখিত আকারে প্রকাশ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ড্রাকো খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালের দিকে বিদ্যমান আইনগুলো লিখিত আকারে প্রকাশ করলে সাধারণ জনগণ সে সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হয় এবং এই প্রথমবার কথিত আইনে তাদের শোচনীয় আইনগত অবস্থান বুঝতে পারে। আইনগুলো লিখিত আকারে প্রকাশিত হওয়ায় তারা একদিক দিয়ে খুশি হলেও, তারা এই প্রথমবার এই নির্মম সত্য অনুভব করতে পারল যে ধনী অভিজাত শ্রেণি যাতে দরিদ্র কৃষক শ্রেণিকে শোষণ করতে পারে, সর্বহারা করতে পারে এমনভাবেই আইনগুলো প্রণীত। এখানেই আইন দ্বারা শাসন ও আইনের শাসনের মধ্যে তফাতটি প্রকটরূপে প্রকাশ পায়। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালে আইন ছিল ঠিকই কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ধনী অভিজাত শ্রেণি আইনগুলো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য, অত্যাচারের হাতিয়ার হিসেবেই আইনকে ব্যবহার করত এবং তাদের একই শ্রেণিভুক্ত ম্যাজিস্ট্রেট ওই আইন অনুসারে বিচার করত, আইন অনুসারেই বিচার হচ্ছে তাই ভেবে ধনিকশ্রেণি আত্মপ্রসাদ লাভ করত, অথচ আইন প্রণয়নের প্রাথমিক উদ্দেশ্য যে অত্যাচারিতকে অত্যাচারের হাত হতে রক্ষা করা, এমন ধরনের চুক্তি যা দরিদ্র দুর্বলকে সর্বহারা হওয়া থেকে রক্ষা করতে সক্ষম, তা একেবারেই অনুপস্থিত ছিল, এ নির্মম সত্য এথেন্সের সাধারণ জনগণ বিদ্যমান কঠোর, স্বৈরাচার প্রসূত, যদৃচ্ছ আইন থেকে উপলব্ধি করতে পারল। সুদের হার এত অধিক পরিমাণে ছিল যে দরিদ্র খাতকরা কোনোদিনই তা পরিশোধ করতে পারত না, নিঃস্ব হয়ে সপরিবারে ক্রীতদাস হতো। আইনও যে ভয়াবহ হতে পারে, অত্যাচারের হাতিয়ার হতে পারে জনসাধারণের উপকারের বদলে ক্ষতিকর হতে পারে, আইন যে শুধু কিছু সংখ্যক ধনী অভিজাত শ্রেণির স্বার্থসিদ্ধির জন্যই প্রণীত তা ড্রাকো-র আইন প্রকাশনা সকলের সম্মুখে এমনভাবে প্রকাশিত করে যে ভবিষ্যতে যখনই কোনো কঠোর আইন প্রণীত হতো বা এখনও হয় সকলেই সেগুলোকে 'ড্রাকোনিয়ান' হিসেবে অভিহিত করে যদিও খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালের আইনগুলো ড্রাকো নিজে প্রণয়ন করেননি, তার দায়িত্ব ছিল বিদ্যমান আইনগুলোকে লিপিবদ্ধ করা মাত্র। উল্লেখ্য যে উপরোল্লিখিত 'ড্রাকোনিয়ান ল' এর সাথে- 'ড্রাকুলা'র কোনো সম্পর্ক নেই।

যা হোক, ড্রাকো কর্তৃক বিদ্যমান আইনগুলো প্রকাশ হবার পর এথেন্স নগর-রাষ্ট্রের সাধারণ অধিবাসীরা প্রবল প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। তারা বিদ্যমান কঠোর স্বেচ্ছাচারমূলক আইন বাতিল দাবি করতে থাকেন।

ওই সময়ে সোলন নামে এথেন্সে একজন নামকরা রাজনীতিবিদ ও আইনজ্ঞ ছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ৫৯৪ সালে এথেন্সবাসীর অনুরোধে তিনি আর্চন বা রাজা হিসেবে নির্বাচিত হন। প্রথমেই তিনি নতুনভাবে আইন সংস্কার ও প্রণয়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি আইন করে বিদ্যমান সকল ঋণ বাতিল করেন, কারণ ইতোমধ্যে ঋণগ্রহীতা কর্তৃক এত পরিমাণ সুদ পরিশোধ করা হয়েছে যে তাদের ঋণ মওকুফ হওয়া উচিত। ফলে এথেন্স নগরীর অধিবাসীদের সকল বন্ধকী জমি দায়মুক্ত হয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের জমি ঘরবাড়ি ফেরত পায়।

এই পদক্ষেপের সাথে বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের প্রেসিডেন্টস অর্ডার নং: ৮৮ এর মাধ্যমে খায়খালাসী পদক্ষেপ এর সাথে তুলনীয়।

তাছাড়া, যে সকল ব্যক্তি ও তার পরিবারবর্গ দেনার দায়ে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল তারা দাসত্ব থেকে মুক্তি পায়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন কেউ দেনার দায়ে কাউকে ক্রীতদাস করতে না পারে সে সম্পর্কে সোলন বিধান করেন।

এখন একটু বিরতি দেওয়া যাক। ড্রাকোর সময়ে বিদ্যমান আইন এবং সোলন প্রণীত আইন- দুইটাই আইন। মানুষের দৃষ্টিতে এ দুই ধরনের আইনের কি একই অবস্থান? দুই সময়ের দুই আইনের বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করলেই পার্থক্য পরিষ্কার হবে। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ সালে ড্রাকো যে আইনসমূহ সংগ্রহ করে লিপিবদ্ধ করেছিলেন সেগুলো এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছিল যাতে দেশের ধনী অভিজাত শ্রেণির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের সুযোগ ছিল না, প্রয়োগ হতো দরিদ্র কৃষক ও অন্যান্য সাধারণ মানুষের উপর। অথচ সোলন প্রণীত আইন ধনী দরিদ্র সকলের ওপর প্রয়োগ হতে পারতো; তাছাড়া, পূর্বের আইনে যারা সর্বহারা হয়ে ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছিল, নতুন আইনে তাদেরকে পুনর্বাসন করার ব্যবস্থা ছিল অথচ ধনী ঋণদাতাগণও ক্ষতিগ্রস্ত হন নি, হয়তো তাদের লাভের অংশ কিছুটা কমেছিল। নূতন আইন এথেন্স এর নাগরিক সমাজে এক ধরনের সমতা আনতে সক্ষম হয়েছিল যা পূর্বে একেবারেই অনুপস্থিত ছিল। আইনকে ইঞ্জিন অব অপ্রেশন বা শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পরিবর্তে আইনের যে প্রকৃত উদ্দেশ্য দুষ্টের দমন ও শিষ্টের প্রতিপালন এবং সেই আড়াই হাজার বছর পূর্বে কিছু দিনের জন্য হলেও এক ধরনের সোশাল জাস্টিস বা সামাজিক ন্যায়বিচার কায়েম হয়েছিল। তবে বর্তমান যুগে যে আইনের শাসনের কথা চিন্তা করা হয় তা স্থাপিত হয়েছিল কিনা বলা মুশকিল। কারণ সেই রাজনৈতিক অবস্থা এবং আইন এর প্রয়োগের মেকানিজম বা পদ্ধতি তখন ছিল কিনা তা জানা যায় না, তবে এটুকু হয়তো বলা যায় যে, আইনের শাসন সোলনের সময় সেভাবে না থাকলেও এর কাছাকাছি তারা পৌঁছাতে পেরেছিল।

তবে এই সুশাসন এথেন্স নগর-রাষ্ট্রে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, সোলন রাজ্যভার পরিত্যাগ করার কয়েক বছরের মধ্যেই তার প্রণীত আইন থাকলেও আইনের স্পিরিটটা আর ছিল না। বিচার ব্যবস্থাও অনেকটা আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

সক্রেটিস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৬৯-৩৯৯) এর ছাত্র  প্লেটো ও জেনোফোনের লেখা থেকে ইতিহাসবিদগণ জানতে পারেন যে খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ সালে সক্রেটিসের তথাকথিত বিচার ও প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। যেটা উল্লেখ করার বিষয় এই যে বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর অভিযোগকারীদের ক্ষোভ ছিল যে সক্রেটিস অত্যন্ত উন্নাসিক ও অহংকারী ছিলেন, তাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া সত্ত্বেও সে তো পালিয়ে গেলোই না বরঞ্চ ইচ্ছে করেই মামলার সম্মুখীন হয়েছে, পালাবার মত ভদ্রতাটুকু পর্যন্ত ছিল না। উল্লেখ্য যে, সে যুগে গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের নির্বাসনে পাঠানো হতো। কিন্তু তিনি ইচ্ছে করেই বিচারের সম্মুখীন হয়েছিলেন, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আইনের কাছ থেকে পালিয়ে যাননি, বরঞ্চ ঋষিতুল্য এই মহাজ্ঞানী দার্শনিক ইচ্ছে করেই আইনের মুখোমুখি হয়েছিলেন। বিদ্যমান আইনের শাসনকে শান্ত মনে গ্রহণ করেছিলেন।

ড্রাকো বিদ্যমান আইন লিখিত আকারে প্রকাশ করেন, সোলন আইনকে উদারভাবে প্রয়োগ করেন, সক্রেটিস আইনের বিধান গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু আইনের শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন প্লেটো (খ্রিস্টপূর্ব ৪২৭-৩৪৭)। তিনিই সর্ব প্রথম আইনকে সরকারের উপর স্থান দিয়েছিলেন। তিনি তার 'দ্য লজ' গ্রন্থে বলেন:

"… if the law is the master of government and the government is its slave, then the situation is full of promise and men enjoy all the blessings that the gods shower on a state."

(ব্রায়ান জেড তামানাহা: 'অন দ্য রুল অব ল' গ্রন্থ হতে উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা-৯)

শুধু তাই নয় অ্যারিস্টটলের লিখিত গ্রন্থ থেকেও আইনের শাসন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়:

"… justice means being ruled as well as ruling, and therefore involves rotation of office. But when we come to that, we already come to law; for such an arrangement is law.The rule of law is therefore preferable, according to the view we are stating, to that of a single citizen. In pursuance of the same view it is argued that, even if it be the better course to have individuals ruling, they should be made 'law-guardians' or 'servants' of the law…

… He who commands that law should rule may thus be regarded as commanding that God and reason alone should rule; he who commands that a man should rule adds the character of the best. … Law is thus reason without desire."

(অ্যারিস্টটল পলিটিক্স ৩, পরিচ্ছেদ ১৬, আর্নেস্ট বার্কার এর অনুবাদ হতে উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা ১২৭-১২৮)

তবে আইনই যে সরকার পরিচালনা করে, আইনই যে বিচারকের বক্তব্য, সেই ধারণা দেন সিসেরো। তিনি তার 'দ্য লজ' গ্রন্থে বলেন:

"First, then, let us praise itself in terms which are both true and appropriate to its nature…

You appreciate, then, that a magistrate's function is to take charge and to issue directives which are right, beneficial, and in accordance with the laws. As magistrates are subject to the laws, the people are subject to the magistrates. In fact it is true to say that a magistrate is a speaking law, and law a silent magistrate. Nothing is so closely bound up with the decrees and terms of nature (and by that I wish to be understood as meaning law) as authority. Without that, no house or state or clan can survive—no, nor the human race, …"

(সিসেরো: দ্য লজ বুক ৩, নিয়াল রাড অনূদিত, পৃষ্ঠা-১৫০)

এই আলোচনার প্রারম্ভে উল্লেখ করেছিলাম যে ১৭৭৬ সালে থমাস পেইন বলেছিলেন যে, 'ইন আমেরিকা দ্য ল ইজ কিং'। কেন বলেছিলেন? বলেছিলেন এই কারণে যে ইংল্যান্ডে মধ্যযুগের প্রারম্ভে- 'কিং ওয়াজ দ্য ফাউন্ডেশন অব জাস্টিস'। শুধু ইংল্যান্ডে নয় তদানিন্তন পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই রাজার যে কোন নির্দেশনাই ছিল আইন, কিন্তু ১৭ শতকের শেষভাগ থেকেই আইনের শ্রেষ্ঠত্ব ক্রমান্বয়ে স্বীকৃতি লাভ করতে থাকে। সে কারণেই ১৬৮৮ সালের মহান বিপ্লবের পর জন লক ১৬৯০ সালে বলতে পেরেছিলেন যে 'where ever law ends, tyranny begins' এবং ড. থমাস ফুলার ১৭৩৩ সালে বলতে পেরেছিলেন-  'Be you never so high, the Law is above you'। উল্লেখ্য যে, এ ধরনের বক্তব্যই অ্যারিস্টটল ২৩০০ বছর আগে দিয়েছিলেন। তাই রাজা যেমন তার ব্যক্ত আইন দ্বারা দেশ পরিচালনা করতেন, আমেরিকায় আইনের মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হয়- এ কথাই থশাস পেইন বোঝাতে চেয়েছিলেন।

এটা সত্য যে আধুনিক যুগের সঙ্গে তুলনীয় না হলেও সেই খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ সালে আইনের উৎস ও সভ্য জগত বলতে গ্রিস বিশেষ করে এথেন্স নগর-রাষ্ট্রকেই বর্তমান যুগের ইতিহাসবিদগণ স্বীকৃতি প্রদান করে থাকেন এবং তার কারণও ছিল। যে সমাজে আইন অনুপস্থিত সেই সমাজের মানুষকে, প্লেটোর ছাত্র, সেই যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক অ্যারিস্টটল, সবথেকে নিম্নশ্রেণির জীব বলে মনে করতেন। প্রায় ২২০০ বছর পরে স্যার মরিস বাওরা তার দ্য গ্রেট এক্সপেরিয়েন্স গ্রন্থে যথার্থই বলেছেন:

"In Greece, whatever type of government might exist, the law was still regarded as the foundation of society."

(আর্থার এল গুডহার্ট: দ্য রুল অব ল অ্যান্ড অ্যাবসুলেট সোভেরেইনটি' ১৯৫৮ এর ৯৪৭ পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত)

কালক্রমে খ্রিস্টপূর্ব ১৪৬ সালে রোমান শক্তি গ্রিসদেশকে রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেও রোমান আইন ও কৃষ্টি গ্রিস দেশের, বিশেষ করে এথেন্স নগর-রাষ্ট্র দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়। গ্রিস থেকে আনীত ১২টি ফলকে (Twelve Tables) লিখিত আইনগুলো ছিল রোমান আইনের ভিত্তি। এমনকি যখন ইংল্যান্ড রোম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় তখন এই আইনগুলো ইংল্যান্ডের আইনের গোড়াপত্তন করে।

খ্রিস্টপূর্ব ৫৫ এবং ৫৪ সালে জুলিয়াস সিজার দুই বার ইংল্যান্ড আক্রমণ করেন কিন্তু রোম সাম্রাজ্যভুক্ত না করে ধনসম্পদ ও কর (Tribute) আদায় করে রোমে ফিরে যান। প্রায় একশ বছর পরে ৪৩ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট টাইবেরিয়াস ক্লডিয়াস ইংল্যান্ড আক্রমণ করে দখল করেন। কিন্তু ৬১ খ্রিস্টাব্দে রানি বোডেসিয়া এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রোমান বাহিনীকে প্রথম দিকে হারিয়ে দিতে পারলেও, শেষে পরাজিত হন এবং আত্মহত্যা করেন। ইংল্যান্ড রোম সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ হয় ও রোমান আইন ও রীতি-নীতি চালু হয় এবং প্যাক্স রোমানা-র অন্তর্ভুক্ত হয়। সাড়ে তিনশ বছর পরে, ৪১০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট হনোরিয়াস ইংল্যান্ডের সকল নগর কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেন যে, রোমের পক্ষে তাদেরকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। ফলে জার্মান থেকে আগত অ্যাংলো স্যাক্সনরা ইংল্যান্ডের অনেকাংশ স্থানই দখল করে নেয়। তারা তখনকার প্রচলিত আধুনিক রোমান আইনের পরিবর্তে নিজেদের আদিম ধর্ম, আইন ও রীতি (custom) চালু করার প্রয়াস পায়।

৫৯৭ খ্রিস্টাব্দে পোপ গ্রেগরি ইংল্যান্ডে কিছু সংখ্যক ধর্মযাজক প্রেরণ করেন। তারা ৬০১ খ্রিস্টাব্দে কেন্টের রাজাকে খ্রিস্টাব্দে ধর্মে দীক্ষিত করেন। ৬৬০ খ্রিস্টাব্দে মধ্যে তদানীন্তন ব্রিটেনের বেশিরভাগ অধিবাসী খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে। ধর্মযাজকরা তাদের সাথে যে নূতন চিন্তাধারা, জ্ঞান ও দর্শন নিয়ে ইংল্যান্ডে গমন করেন তা তদানিন্তন ব্রিটেনবাসীকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে।

উল্লেখ্য, সে সময়ে ব্রিটেন বহুসংখ্যক ছোট ছোট রাজত্ব ছিল, রাজাগণ রাজ্যের প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যারন বা জমিদার, যুদ্ধে পারদর্শী নাইট-দের দ্বারা নির্বাচিত হতেন। খ্রিস্টান ধর্ম আগমনের পর রাজাদের অভিষেক (coronation) অনুষ্ঠান ধর্মযাজক খ্রিস্টান ধর্মের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করতেন। এইভাবে দেশের শাসনভার ও খ্রিস্টান ধর্ম রাজার দায়িত্বের মধ্যে আসে এবং রাজ্যে রাজা একাধারে টেম্পোরাল রুলার, অন্যদিকে ecclesiastica (চার্চ প্রধান) হন। এরকম সময়েই ধর্মযাজকরা এক তত্ত্ব ও মতবাদ প্রচার আরম্ভ করেন যে রাজ্যে একমাত্র রাজাই প্রশাসন ও আইন শৃঙ্খলার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা (fountain of law and order)। ফলে রাজাও তাদের তোষণ করে চলতেন এবং চার্চের নামে হাজার হাজার হেক্টর জমি ও অন্যান্য সম্পত্তি নিষ্কর হিসেবে বন্দোবস্ত দিতেন। ক্রমে ক্রমে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে সমগ্র ইংল্যান্ডে খ্রিস্টান চার্চ নিজেদের সঙ্ঘবদ্ধ করতে সক্ষম হয় এবং তারা এতটাই প্রভাবশালী হয় যে তাদের দৃষ্টিতে রাজা কোন অন্যায় করলে তারা রাজাকে তিরষ্কার পর্যন্ত করতে পারতো। তবে তাদের প্রভাবে সমগ্র ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রাজ্য ধীরে ধীরে একত্রিত হতে আরম্ভ করে এবং দশম শতাব্দীর দিকে সকল ছোট ছোট অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজ্যগুলো একত্রে ইংল্যান্ড নামে অভিহিত হতে থাকে।

এই সময়ে ইংল্যান্ডে আইনের শাসন দূরে থাক, বিচার ব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত আদিম। খ্রিস্টান ধর্মের আগমনের পূর্বে কোনো লিখিত আইন সেখানে ছিল না। ৮ম-৯ম শতাব্দীতে কিছু কিছু লিখিত আইনের অস্তিত্ব ছিল, অনেক পরে রাজা ক্যানিউট বিদ্যমান আইনগুলো একত্র করার পদক্ষেপ নেন।

৯ম-১০ম শতাব্দীতে বিচার পদ্ধতি ছিল একেবারেই আদিম। বাদী-বিবাদীকে তাদের দাবি প্রমাণ 'trial by battle' (যুদ্ধে জয়ী হওয়ার ভিত্তিতে) এর মাধ্যমে করতে হতো, যে পক্ষ যুদ্ধে জয়লাভ করত, রায় সে পক্ষেই যেত। তাছাড়া, সাক্ষীদের অগ্নিপরীক্ষা বা trial by battle এর মাধ্যমে সাক্ষী দিতে হতো। সাক্ষী সত্য কথা বলছে কিনা তা পরীক্ষার জন্য ফুটন্ত পানিতে বা ফুটন্ত তেলের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিতে হতো, যদি ৩ দিনের মধ্যে হাতের ক্ষত শুকাতো তাহলে ধরে নেওয়া হতো সাক্ষী সত্য বলেছে, অন্যথায় মিথ্যা বলছে। আবার আগুনের মত গরম লোহার রড হাত দিয়ে ধরতে হতো অথবা আগুনের ওপর দিয়ে হাঁটতে হতো, যদি তাড়াতাড়ি সেরে যেত তাহলে সে নির্দোষ বা সত্য সাক্ষ্য দিচ্ছে। এই হচ্ছে নবম-দশম শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের বিচার ব্যবস্থা।

এবার অন্য মহাদেশের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে আরব দেশের মক্কা নগরীতে ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব হয়। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মোহাম্মদ (সা.) মদিনা নগরীতে গমন (হিযরত) করেন। ওই নগরীতে তখন নূতন ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত মুসলিমরা ব্যতিরেকে খ্রিস্টান ও ইহুদী ধর্মালম্বী অধিবাসীরা বসবাস করত। সব রকম ধর্মালম্বী অধিবাসীদের অধিকার রক্ষার্থে হযরত মোহাম্মদ (সা.) একটি সনদ প্রণয়ন করেন। এই সনদ 'মদিনা সনদ' নামে বিখ্যাত। দেশীয় রীতিনীতি ও পবিত্র কোরআন শরীফে বর্ণিত নির্দেশনা অনুসারে বিচার করা হতো। পক্ষগণকে অন্তত দুইজন সাক্ষী দ্বারা তাদের বক্তব্য প্রমাণ করতে হতো। একবার খলিফা ওমর ফারুক (রাঃ) এক অভিযোগ নিয়ে কাজীর কাছ এলেন। কাজী সাক্ষীদের আনতে বললে খলিফা বললেন যে- 'আমি নিজেই ঘটনার সাক্ষী।' কাজী বললেন যে, 'আপনি অভিযোগকারী, আপনি নিজে খলিফা ও সুসংবাদপ্রাপ্তদের একজন হলেও অভিযোগের সপক্ষে দুইজন সাক্ষী আনতে হবে, অন্যথায় মামলা খারিজ।' এই ঘটনা প্রমাণ করে ৭ম শতাব্দীর প্রথমার্ধে মুসলিম বিশ্বের দোর্দণ্ড ক্ষমতাবান খলিফার আনা মামলা তার দ্বারাই নিয়োগপ্রাপ্ত কাজী আইনের ব্যত্যয় ঘটায় খারিজ করতে দ্বিধা বোধ করেন নি। আমার ধারণা এই ঘটনা আইনের শাসনের পরিচায়ক। তাছাড়া, সে সময়ে অন্তত প্রথম চার খলিফার আমলে আইন ও আইনের প্রয়োগে কঠিনভাবে সমতা রাখা হতো। এমনকি খলিফার পুত্রকেও অপরাধের জন্য চরম শাস্তি খলিফা নিজ হাতে দিতেও দ্বিধা করেননি। এখানেই শুধু আইনের শ্রেষ্ঠত্ব নয়, আইনের দ্বিধাহীন প্রয়োগও ছিল অবিস্মরণীয়।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক