Published : 07 Sep 2025, 09:42 PM
২০০৫ সালের নভেম্বর মাসে কোনো একদিন মিছিল-সমাবেশ শেষে মধুর ক্যান্টিন হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশ দিয়ে শাহবাগের দিকে যাচ্ছি। সঙ্গে দুই সহযোদ্ধা––আনিস ও আলী রিয়াজ। মসজিদের পুবদিকে রাস্তার পাশের ফুটপাতে একজন টিয়া পাখি নিয়ে হাত দেখে মানুষের ভবিষ্যৎ গণনা করছেন। হঠাৎ কৌতূহলবশত আমিও হাত দেখাতে গেলাম।
টিয়া পাখিটি খাঁচা থেকে বের হয়ে অনেক চিঠির মধ্য থেকে একটা চিঠি ঠোঁটে নিয়ে ভবিষ্যৎ গণনাকারীকে দিল। সেই চিঠি পড়ে আমার হাত ধরে ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান বলতে শুরু করে দিলেন ভদ্রলোক। কিছু কিছু বিষয় মিলে গেল, যেমনটা মিলে সবার ক্ষেত্রেই। মিলল না বেশির ভাগ।
হাত দেখানো শেষে আমার মাথায় দুষ্টুমি ভর করল। টাকা-পয়সা না দিয়েই হাঁটা ধরলাম। ভবিষ্যৎ গণনাকারী আমাকে “এ ভাই” করে ডাক দিয়ে বললেন, “টাকা দিলেন না যে?”
আমি বললাম, “আমি টাকা দেব না।”
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কেন?”
আমি বললাম, “আপনি আপনার ভবিষ্যৎ আজকে গণণা করেননি?”
গণনাকারী ভ্যাবাচেকা খেয়ে বললেন, “বুঝলাম না?”
আমি আবার বললাম, “আপনি তো আমার ভবিষ্যৎ বললেন, কিন্তু আপনার নিজের ভবিষ্যৎ দেখেননি যে আজ আপনাকে একজন হাত দেখিয়ে টাকা দেবে না। আর সেই ব্যক্তিটা আমি।”
এরপর আবার হাঁটা ধরলাম। এবার তিনি আর আমাকে ডাকলেন না। আমার সহযোদ্ধারা এ বিষয় নিয়ে সেদিন ব্যাপক মজা নিয়েছিল।
গল্পটা মনে পড়ল, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে দু-দুটি জরিপের ফলাফল দেখার পর। ভোট প্রার্থীরা এখানে নিজের ভাগ্য নিজেই গণনা করেছে। তবে তারা জানেন, ভোটের শেষে ইচ্ছেপূরণের এই জরিপ সর্বৈ মিথ্যে প্রতিপন্ন হতে পারে। তবু জয়ের আওয়াজ দিয়ে যদি ভোটদাতাদের প্রভাবিত করা যায়? ডাকসু নির্বাচনের আগে ঘোষিত জরিপে শিবিরের জয় রীতিমতন রসিকতায় পরিণত হয়েছে—অন্য প্রার্থীরা বলছেন, ওরা প্রশ্ন করেছেন নিজেরা, উত্তরও দিয়েছেন নিজেরা, আর শেষে নিজেরাই নিজেদের সম্ভাব্য বিজয়ী ঘোষণা করেছেন। ফলে জরিপ দুটির অবস্থা হয়েছে আতাহার আর মোতাহারের গল্পের মতো।
যখন কেউ কোনো বিষয়ে বেশি বেশি বাড়িয়ে অস্বাভাবিক কিছু বলে, তখন গ্রামবাংলার মানুষ তাকে উদ্দেশ্য করে বলে, “হ্যাঁ, খায়দায় আতাহার, মোটা হয় মোতাহার!”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—মুক্তচিন্তা, গবেষণা, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় দুর্গ। কিন্তু সাম্প্রতিক ডাকসু নির্বাচনের হাওয়া যেন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—এখানেও রাজনৈতিক নাটক, সিনেমা, কলাবাজি আর স্যাটায়ার চলতে পারে।
সম্প্রতি ‘সোচ্চার’ নামের ওয়াচডগ সংস্থা এক জরিপ প্রকাশ করেছে। সেখানে ভিপি পদে শিবিরের প্রার্থী সাদিক কায়েম পেয়েছেন ৩২ শতাংশ সমর্থন, ছাত্রদলের আবিদুল ইসলাম খান ৭ শতাংশ। ৩৪ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছেন, তাদের কোনো মতামত নেই। গুগল ফরমে অনলাইনে ৯৯১ জনের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হলো। কে কোথায় বসে উত্তর দিল, তা জানা নেই। ফেইসবুকের বট আইডিগুলোও নাকি ভোটার হয়ে গেল। এরপর ফলাফল? শিবির এগিয়ে!
শুনতে নিরপেক্ষ মনে হলেও আসল গল্প এখানেই—‘সোচ্চার’নাম সংগঠনটির সভাপতি আনাস ইবনে মুনির আর সহ-সভাপতি শাহিনুর রহমান নিজেরাই শিবির-সমর্থিত প্যানেলের হয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছেন। মানে, নিজেরাই প্রার্থী, নিজেরাই জরিপকারী, আবার নিজেরাই আগেভাগে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা দিয়েছেন, এমনটা অভিযোগ করছেন অন্য প্রার্থীরা। যা বাংলার লোককথায় এক কথায় বলা যায়, খায় আতাহার, মোটা হয় মোতাহার।
দ্বিতীয় জরিপ করলো ‘ন্যারেটিভ’ নামের আরেকটি সংগঠনের। তারা নাকি মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, ৫২৬ জন শিক্ষার্থীর ওপর তাদের জরিপ। কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯টি হলের মধ্যে ৫টিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অনাবাসিক শিক্ষার্থীদেরও বাদ দেওয়া হয়েছে, অথচ বাস্তবে ভোটারদের একটা বড় অংশ তো অনাবাসিক।
ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে জরিপের নামে যে নাটক চলছে, তা শুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। দুদিনে দুই সংগঠন জরিপ করল—দুটোতেই দেখা গেল, শিবির এগিয়ে!
ন্যারেটিভ জরিপের নমুনা নিয়েছে ১৪টি হল থেকে, বাদ পড়েছে ৫টা হল। কারণ নাকি প্রতিনিধি মেলেনি। শুনে মনে হচ্ছে, জরিপ নয়, বরং বিরিয়ানির দাওয়াত—যেখানে যার হাতে চামচ ছিল, সে-ই খেয়েছে! এখানেও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের বাদ দেওয়া হয়েছে, অথচ ভোটারদের বড় অংশ তো অনাবাসিক। মানে, বাজারে মাছ না দেখে জরিপে সিদ্ধান্ত: ইলিশ এবার অনেক হয়েছে।
বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে ‘মামাবাড়ি’ শব্দটি বোঝায় যেখানে নিয়ম-কানুন বা ন্যায্যতার তোয়াক্কা না করে খালাতো-মামাতো সম্পর্ক দিয়েই ভাগ-বাটোয়ারা হয়। ডাকসুর জরিপ নিয়েও তাই প্রশ্ন ওঠে— এটা কি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, নাকি মামাবাড়ির ভাগাভাগি? ভোটের আগে নিজেরাই নিজেদের জয়ঘোষণা করার রাজনৈতিক নাটক-সিনেমা বাংলাদেশে নতুন নয়।
পুরোনো হিসাব বনাম নতুন গল্প। ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদে ফলাফল ছিল নুরুল হক নুর (কোটা সংস্কার): ১১,০৬২ ভোট (৪৫.১৫শতাংশ)। রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন (ছাত্রলীগ): ৯,১২৯ ভোট (৩৭.২৬শতাংশ)। অরণি সেমন্তি খান (স্বতন্ত্র): ২,৬৭৬ ভোট (১০.৯২শতাংশ)। লিটন নন্দী (ছাত্র ইউনিয়ন): ১,২১৬ ভোট (৪.৯৬শতাংশ)। মোস্তাফিজুর রহমান (ছাত্রদল): ২৪৫ ভোট (১শতাংশ)।
এবার পরিস্থিতি বদলেছে, ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ, ছাত্রদল মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর জোট প্রতিরোধ পর্ষদও লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই। স্বতন্ত্ররাও কম শক্তিশালী নয়। আছে বাগছাস। তারা সবাই লড়ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সম্মান ও মর্যদা রক্ষার জন্য। যেমন লড়েছিল মহান মুক্তিযোদ্ধারা—জামায়াত-রাজাকার-আলবদরের তথাকথিত ‘মুসলমান ও ইসলাম’ বিরোধী আখ্যা মাথায় নিয়ে। তাহলে শিবিরের ৩২শতাংশ সমর্থন হঠাৎ করে কোথা থেকে? মানসিক যুদ্ধ কৌশল—প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা, বিভ্রান্তি সৃষ্টি। বিজ্ঞাপনী প্রচারণা—‘আমরা এগিয়ে আছি’ বার বার বলার মানসিক প্রভাব। প্রতীকী খেলা—ভোটের চেয়ে জরিপ প্রকাশের নাটক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় রাজনীতির হিসাব বলছে— জামায়াত-শিবিরের সম্মিলিত ভোট ৬–৭ শতাংশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটা হাজার খানেক বা বড় জোর দ্বিগুণ ভোটে অনুবাদ হয়। অবশ্য শিবিরের গুপ্ত রাজনীতির কারণে যথাযথ অনুমান করা কঠিন। তবে এটা ধারণা করা যায়, বিজয়ী হওয়ার মতো হাজার দশেক ভোট যদি শিবিরের থাকত, তাহলে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দিত না তারা, যুদ্ধাপরাধীদের ছবির প্রদর্শনীও বন্ধ করতে বাধ্য হতো না। নারীর ভোট, জগন্নাথ হল বা আদিবাসী ভোট, মুক্তচিন্তার সচেতন ভোট–শিবিরের জন্য আঙুর ফল টকের মতো। অবশিষ্ট ভোট সাধারণ ছাত্রদের। কিন্তু সেই ভোট ছাত্রদলসহ অন্যান্যদের দিকেই যাওয়ার কথা।
ছাত্রদল এবার সিরিয়াস প্রার্থী দিয়েছে। সুবিধা—ছাত্রলীগ নেই। অসুবিধা—বাম, লিবারেল ও মুক্তচিন্তার ভোট ব্যাংক ছোট, ছাত্রদলের জন্য সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী। মফস্বল থেকে আসা শিক্ষার্থীরা দেশপ্রেম ও পরিবারের আদর্শে বড় হয়ে ছাত্রদলের দিকে যাবে। শিবিরের সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গুপ্ত ও নতুন অল্প প্রকাশ হয়ে ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারবে না।
জরিপ নাকি নাটক? যদি শিবিরের বাস্তব ভোট নির্দিষ্ট হয়, জরিপ প্রকাশ কেন? উত্তর—প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার ‘মাইন্ড গেম’। যুদ্ধের অর্ধেক লড়াই মাঠে, বাকিটা হয় মনের ভেতর। ঠিক মুক্তিযুদ্ধের সময় গোলাম আজমের সেই কথার মতো— “পাকিস্তান যদি না থাকে তাহলে জামায়াত কর্মীদের দুনিয়ায় বেঁচে থেকে লাভ নাই।” আরো নাকি বলেছিলেন, “বাংলাদেশ নামের কিছু হলে আমি আত্মহত্যা করব।” বাস্তবতা হচ্ছে, তিনি এই বাংলাদেশের আলো-হাওয়ায় বেঁচেছিলেন স্বাধীনতার পর আরও অনেকদিন। নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য দলকে দিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম কম করাননি।
ডাকসুতে বিজয়ী হতে না পারলে গোলাম আজমের মতো এমন কিছু করার ঘোষণা দেননি ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রার্থীরা। তবে মজার ব্যাপার হলো, এক জরিপে শিবিরের প্রার্থী ভিপি পদের জন্য ৪২ শতাংশ ভোটে এগিয়ে, আরেকটায় ৩২ শতাংশ। বাস্তব মাঠে কত ভোট পাবেন, তা নিয়ে শিক্ষার্থীরা ভোটের দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলছেন।
ডাকসুর ইতিহাসে প্রথমবার মনে হচ্ছে, ভোটের আগে জরিপ নয়, জরিপই ভোট দিচ্ছে শিবিরকে। মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। কিন্তু জামায়াত-শিবিরের ইতিহাস সতর্ক করে—গণতন্ত্রকে কেবল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার, নারীমুক্তি বিরোধী ও একরঙা, বৈচিত্র্যবিহীন, রুদ্ধ সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখে—যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা, যুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সবার বাংলাদেশ দর্শনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্তে ভেজা মাটিতে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকারদের শহীদ ও জাতীয় বীর হিসেবে প্রদর্শন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি— এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিকতার জন্য হুমকি।