Published : 08 Aug 2026, 02:17 PM
বাকস্বাধীনতা মানুষের মৌলিক ও জন্মগত অধিকার। মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও মতপ্রকাশের জন্য বাকস্বাধীনতা অত্যন্ত জরুরি। কাগজে-কলমে বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে জনগণের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাকিস্তানের সামরিকায়িত রাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের দ্বন্দ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল বাকস্বাধীনতা হরণ। ওই বাকস্বাধীনতার অধিকার অর্জন ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের অন্যতম মূলমন্ত্র।
১৯৭১ সালে পুরোনো রাষ্ট্র গেছে, নতুন রাষ্ট্র এসেছে। মানুষ তার রাজনৈতিক অধিকারের পক্ষে বহু আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। এ ভূখণ্ডে যত বড় বড় গণআন্দোলন হয়েছে, সবকটিতেই শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে বাকস্বাধীনতা হরণের ঘোরতর অভিযোগ সামনে এসেছে। মানুষ যখনই অধিকারের কথা বলেছে, তখনই তাদের ওপর নেমে এসেছে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। ১৯৫২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব আন্দোলন তাই একসূত্রে গাথা। তাই কেবল সংবিধানে বাকস্বাধীনতার কথা থাকলে হয় না; রাষ্ট্র, সরকার ও সংখ্যাগরিষ্ঠের চরিত্র গণতান্ত্রিক হতে হয়। বাকস্বাধীনতা হরণ মূলত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চর্চার অভাব থেকেই সৃষ্টি হয়।
স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়েও আমরা কি আসলেই এই স্বাধীনতাকে অর্জন এবং পরিচর্যা করতে শিখেছি? আমরা কি শিখেছি নিজ মতের বিরুদ্ধ মতকে সম্মান করতে? ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য থেকে বেরিয়ে এসে আমরা কি শিখেছি গঠনমূলক পর্যালোচনা করতে? যদি তা না শিখে থাকি, তাহলে স্বাধীনতা নিয়ে কিসের এত গর্ব?
আরও গভীরে গিয়ে দেখা যায়, বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে সবচেয়ে সংকুচিত করে রাখা হয়েছে মূলত নারীদের। বিশ্বায়নের এ যুগেও নারীর মতপ্রকাশে বহু বাধাবিপত্তি সৃষ্টি করা হয়। নারীকে ‘অবলা’ গণ্য করে একটি গোষ্ঠী; তাই নারীর মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা এবং জীবনযাপনকে তারা বাক্সবন্দি করে রাখতে চায়। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ত্রুটি আর অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরেন যে নারীরা, অবিচারের প্রতিবাদ করেন যে নারীরা, ধর্মের নামে শেকল পরানোর বিরুদ্ধে কলম ধরেন যে নারীরা, তাদের দিতে হয় চরম মূল্য। তাই যুগের পর যুগ রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, তসলিমা নাসরিন কিংবা মালালা ইউসুফজাইয়ের মতো নারীদের ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়েছে। কখনো হয়েছেন লাঞ্ছিত-অপমানিত, কখনো নির্বাসিত।
একটু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ধরনগত ও প্রকাশগত দিক থেকে এই নারীর মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তারা সবাই মূলনীতির দিক থেকে একই আদর্শের ধারক ও বাহক। তারা সবাই কথা বলেছেন নারীর প্রতি মানবসমাজে যুগ যুগ ধরে ঘটে যাওয়া অন্যায়-অবিচার আর দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে। একজন নারী হয়েও তারা প্রশ্ন করতে জানেন, আঙুল তুলে কথা বলতে জানেন এবং ধর্মীয় অপব্যাখ্যার কঠোর সমালোচনা করতে জানেন। এটা পুরুষতান্ত্রিক মৌলবাদী সমাজের পছন্দ নয়। তাই ঘুরেফিরে তাদের বক্তব্য একটাই, নারীর কোনো বাকস্বাধীনতা থাকতে পারবে না!
যুক্তির বিরুদ্ধে পাল্টা যুক্তিতে যাদের ভয়, যুক্তি দিয়ে যুক্তিকে পরাজিত করতে পারেন না যারা, তাদের শেষ অস্ত্র হলো ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা এবং বাকস্বাধীনতার কণ্ঠরোধ করা। এটাও এক চরমমাত্রার ফ্যাসিবাদ।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘন বা বাধাগ্রস্ত করা যদি ফ্যাসিবাদের স্বরূপকে প্রকাশ করে, তাহলে সকল সময়ে সকল দেশে সকল সরকারপ্রধান বিশেষ গোষ্ঠীর মনোরঞ্জনের উপজীব্য হিসেবে নারীকে ব্যবহার করে থাকেন, হেনস্তা করেন, সাধারণ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন, তারাও কি ফ্যাসিবাদের দোসর নন? নাকি ওই বিশেষ গোষ্ঠীর ছত্রচ্ছায়ায় তারা এতটাই নিরাপদ বোধ করেন যে, অতীত থেকে শিক্ষা নিতে ভুলে যান?
বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের মতামতকে যে কেউ ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ বা অপছন্দ করতে পারেন; তাই বলে কি তিনি তার জন্মভূমিতে সমাহিত হবার অধিকার রাখেন না? একজন ব্যক্তি হিসেবে আপনি লেখক তসলিমা নাসরিনের লেখাকে ঘৃণা বা তিরস্কার করতে পারেন; তাই বলে কি তার দেশে আসার অধিকার আপনি হরণ করতে পারেন? তাকে তার স্বজন হারানোর মতো হৃদয়বিদারক ঘটনায় শেষ দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে পারেন? সকল যুগের সকল সরকারই যদি একজন নারীর প্রতি এ ধরনের মনোভাব পোষণ করে, তাহলে এদেশের নারীরা যাবে কোথায়? কোথায় গিয়ে তারা ন্যায়বিচার পাবে?
কেবল আপনি শুনতে চান না বলে কি সবাই তার মতপ্রকাশ বন্ধ করে দেবে? আপনি দিতেন? না, দিতেন না। কিন্তু অন্যের বেলায় আমরা আশা করি যে, সে বা অপর ব্যক্তি এমন কিছু বলবে না, যা আমাদের শুনতে ভালো লাগে না। অথচ আমরা নিজেদের মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে খুব কম মানুষই এ কথাটা মাথায় রাখি। নিজে যা খুশি তা বলা বা করাকে আমরা স্বাধীনতা বলে ধরে নিলেও, অন্যের ক্ষেত্রে আমরা নৈতিকতার মানদণ্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে যাই। অন্যের মতকে বয়কট করি, অসম্মান করি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। এজন্যই বোধহয় চৈনিক দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছেন, “যা তুমি নিজের জন্য কামনা করো না, তা অন্যের প্রতি করো না।”
একজন তসলিমা নাসরিন, যার আদর্শ আপনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তাকে যেভাবে মূল্যায়িত করছেন, আপনি নিজেও কি ওভাবেই মূল্যায়িত হতে চান? মতপ্রকাশের জন্য নিজের দেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে অন্য দেশে পরজীবীর জীবনযাপন করতে চান? এভেলিন বিট্রিস হলের ভাষ্য অনুযায়ী, বাকস্বাধীনতা প্রশ্নে আঠারো শতকের বিখ্যাত ফরাসি লেখক, দার্শনিক ও ইতিহাসবিদ ভলতেয়ারের মনোভাব ছিল এরকম: “আপনি যা বলছেন তা আমি ঘৃণা করি, কিন্তু আপনার কথা বলার অধিকার আমি আমৃত্যু রক্ষা করব।” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জর্জ অরওয়েল, মিশেল ফুকোদের মতো বিখ্যাত লেখকরাও বাকস্বাধীনতার কথা বলেছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো, তসলিমা নাসরিনের নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়েছে তাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে। তার চেয়েও নিষ্ঠুরতম সত্য হলো, একজন লেখককে তার মতপ্রকাশ ও লেখালেখির কারণে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে।
তসলিমাকে দেশে ফিরে আসতে দেওয়া হচ্ছে না, কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠের মনোরঞ্জন তিনি করেন না। আবার, তারা পাল্টা যুক্তিও দিতে পারেন না। তসলিমা নাসরিন তাদের জন্য মাথাব্যথার কারণ। তাদের আদর্শ যদি এতই শক্তিশালী হয়, তাহলে এক তসলিমা নাসরিনকে সামনাসামনি মোকাবিলা করতে সমস্যা কোথায়?
বাংলাদেশে একের পর এক সরকার গেছে, এসেছে। কিন্তু তসলিমা নাসরিনের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে কারও কোনো ইতিবাচক ভূমিকা দেখা যায় না। কারণ, তাতে ধর্মীয় মৌলবাদীরা খেপে যাবে! যুক্তির বদলে যুক্তি নেই, শুধু সংখ্যাগুরুত্বের অস্ত্র ও অহমের জোর।
বাকস্বাধীনতার অধিকার কি তাহলে শুধুই সংবিধানে সাজিয়ে রাখার বিষয়, যা একজন প্রথাবিরোধী লেখককে সুরক্ষা দিতে পারে না?
রুদমিলা মাহবুব ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের