Published : 09 Nov 2025, 03:21 AM
জাহানারা ইমামের সংগ্রহের বইগুলো একদিন বাংলা একাডেমির গুদামে ‘অপ্রয়োজনীয়’ হয়ে গেল। কেজি দরে বিক্রি হলো ইতিহাস, বিক্রি হলো স্মৃতি, বিক্রি হলো এক শহীদ জননীর সংগ্রহ, যা তিনি ‘জাতির বিবেকের প্রতীক’ বলে পরিচিত বাংলা একাডেমিকে দান করে গিয়েছিলেন।
বই বিক্রির ঘটনাটি ঠিক কবে ঘটেছে, কেউ জানত না। একমাত্র বাংলা একাডেমি জানে, কারণ তারাই এই বইগুলো ‘পুরোনো এবং পরিত্যক্ত বই’ হিসেবে বিক্রি করেছে। নজরে আসে পুরোনো বই বিক্রির ফেইসবুক পেজ ‘পুস্তক জোন’ কিছু মূল্যবান বই বিক্রির পোস্ট দেওয়ার পর। এরপর ‘প্রথম আলো’তে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও তোলপাড় শুরু হয়।
'পুস্তক জোন' গত ২২ সেপ্টেম্বর জর্জ বার্নাড শ-এর ‘প্লেস আনপ্লিজেন্ট’ বইটি বিক্রির পোস্ট দেয়। এরপর ২৮ সেপ্টেম্বর তারা ‘অচেনা দিগন্ত’ নামের আরেকটি বই বিক্রির পোস্ট দেয়। দেখা গেল, এসব বইয়ের ভেতরে রয়েছে বাংলাদেশের খ্যাতনামা এবং ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির সিল। শুধু তাই নয়, ওই বইগুলোতে আরও রয়েছে ‘জাহানারা ইমামের ব্যক্তিগত সংগ্রহ’–এর সিলও।
খবরে বলা হয়েছে, জাহানারা ইমামের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালার অন্তত ২০টি বাংলা ও ইংরেজি বই বাংলা একাডেমি থেকে কেজি দরে বিক্রি করা হয়েছে। বইগুলো বিক্রি করছে পুরোনো বই বিক্রি করার কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। সবচেয়ে বেশি সংগ্রহ রয়েছে ‘বিচিত্র বিচিত্র বই’ পেইজে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হৈচৈয়ের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। প্রথমত, বাংলা একাডেমি এটি করেছে। দ্বিতীয়ত, বইগুলো জাহানারা ইমামের ব্যক্তিগত সংগ্রহের, যা দান করা হয়েছে বাংলা একাডেমিকে। এই বইগুলোর মধ্যে রয়েছে শহীদুল্লাহ কায়সারের কালজয়ী উপন্যাস ‘সংশপ্তক’ও। ১৯৬৭ সালে এই বইটি শহীদ সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার নিজেই উপহার দিয়েছিলেন ইমাম দম্পতিকে।
তবে এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে এসেছে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজমের বক্তব্যও। তিনি বলেছেন, “২০১৪ সালে একটা কমিটি গঠন করা হয়েছিল বাংলা একাডেমির লাইব্রেরিতে কোন বই থাকবে আর কোনটা থাকবে না, তা বাছাই করার জন্য। বাছাই করে জাহানারা ইমামের সংগ্রহশালা যা ছিল, সেগুলো আলমারিতে রেখেছে। আর যেগুলো পরিত্যক্ত, সেগুলো গোডাউনে রাখা হয়েছিল। গোডাউন ভর্তি হয়ে যাওয়ায় সেগুলো নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।”
জাহানারা ইমাম ও শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি জন্মের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। শহীদুল্লাহ কায়সারকে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে আলবদর-রাজাকার বাহিনী ধরে নিয়ে হত্যা করে। অন্যদিকে জাহানারা ইমামের বড় ছেল শহীদ শাফী ইমাম রুমী ১৯৭১ সালে 'ক্র্যাক প্লাটুনের' সদস্য হিসেবে ঢাকার বিভিন্ন গেরিলা অপারেশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩০ অগাস্ট পাকিস্তানি বাহিনী সুরকার আলতাফ মাহমুদসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে রুমীকেও আটক করে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে। এসকল ইতিহাস এদেশের মানুষের জানা। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসব স্মৃতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে—বেদনাদায়ক কারণেই।
নব্বইয়ের দশকে জাহানারা ইমাম গঠন করেছিলেন ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’, শহীদদের হত্যার বিচার দাবিতে। তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’ অনেককেই মুক্তিযুদ্ধ চিনতে শিখিয়েছিল, যা মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা ও ত্যাগের দিনলিপি। মুক্তিযুদ্ধের আগে থাকতেই জাহানারা ইমাম লেখালেখি করতেন। পরেও লিখেছেন। কিন্তু তিনি যদি ‘একাত্তরের দিনগুলি’ ছাড়া আর কিছুই না লিখতেন, তবু বাংলাদেশের মানুষ তাকে চিরকাল স্মরণে রাখত।

কিন্তু জাহানারা ইমাম থেমে থাকেননি। অসুস্থ শরীর নিয়েও ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’ গঠন করে নেমেছিলেন এক দুঃসাহসিক কাজে। মুক্তিযুদ্ধের দুই দশক পরে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতিকে আমাদের প্রজন্মের কাছে হাজির করেছিল। যুদ্ধের ক্ষত এবং গৌরব নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, দুলজান্নেসা, কাঁকন বিবি, সেতারা বেগম, গুরু দাসীসহ আরও অনেকে। এসবের পেছনে যার উৎসাহ-প্রেরণা ছিল, তিনি শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। তার সঙ্গে প্রথম থেকেই ছিলেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। আমাদের মনে আছে, তিনি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা মাথায় নিয়েই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কারা এবং কেন দিয়েছিল সেই রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা? এটিও সকলের স্মরণে থাকার কথা।
কাজেই তার দান করা ব্যক্তিগত বইগুলো ‘পরিত্যক্ত’ হয়ে কেজি দরে বিক্রি হলে বেদনা একটু বেশিই হয়। তিনি এগুলো দিয়েছেন বাংলা একাডেমিকে, কোনো ব্যক্তিকে নয়। সুতরাং সংরক্ষণ ও মর্যাদার সঙ্গে ব্যবহার করা একাডেমির দায়িত্ব ছিল। এখন প্রশ্ন, কীভাবে এই বইগুলো ‘পরিত্যক্ত’ তালিকায় এল? ২০১৪ সালের কমিটির যে দোহাই দেওয়া হয়েছে, আমি নিশ্চিত ওই কমিটির সদস্যরা এই বাছাই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন না। তাহলে কে বা কারা কী প্রক্রিয়ায় এই কাজটি করল? বই বাছাইয়ে কোনো নীতিমালা ছিল কি না, কবে এই কাজটি সম্পাদিত হয়েছে? একাধিক কপির যুক্তিও দানকৃত বইয়ের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। আর তাছাড়া শহীদুল্লাহ কায়সারের স্বাক্ষরসহ কপিও কি একাধিক? এটাও কি আমাদের মানতে হবে?
দানকৃত বই কোনো অবস্থাতেই বিক্রি করা যায় না। তাহলে কি এটি বাংলা একাডেমির কর্মকর্তারা জানতেন না? এটি কি প্রথম ঘটনা, নাকি আগেও এমন হয়েছে? আর যদি জাহানারা ইমামের সংগ্রহের আলমারি এখনো সংরক্ষিত থাকে, তবে কীভাবে এসব বই বাজারে এল, সেটি এখন খতিয়ে দেখা জরুরি। না হলে এই দায় সরাসরি একাডেমির বর্তমান প্রশাসনের ওপরই বর্তায়।
অনেকেই অনেক ধরনের আশঙ্কা করছেন। কারও কারও মনে হচ্ছে, তবে কি জাহানারা ইমামের সংগ্রহ করা বই বলেই সেটি আদর্শিক কারণে ‘পরিত্যক্ত’ হিসেবে স্থান পেয়েছে? কারণ তার সকল স্মৃতি এবং চিহ্নকে পরিত্যক্ত করতে হবে? এই সরকারের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিপরীতে অবস্থান অনেকটা যেন এই চিন্তায় ধারালো যুক্তি হিসেবে অনেককেই কুপোকাৎ করছে। জাহানারা ইমাম যেসব যুদ্ধাপরাধীর শাস্তি চেয়ে আন্দোলন চালিয়েছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, তারাই এখন বাংলাদেশের অনেক কিছুর নিয়ন্ত্রক। তাই হয়তো এসব ভাবনা নিছক অমূলক হিসেবে দেখছেন না মানুষ। কারণ এই সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েকদিন পর থেকে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলির সভাপতি শাহরিয়ার কবির জেলে আটক আছেন। যেনতেন মামলায় নয়, তাকে একাধিক হত্যা মামলায় আটক করে রাখা হয়েছে । তিনি খুবই অসুস্থ। তারপরও জামিন মিলছে না।
বাংলা একাডেমির এই ঘটনা নিছক প্রশাসনিক ‘ভুল’ নয়, বরং তা গভীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতীকে রূপ নিয়েছে। যখন জাহানারা ইমামের ব্যক্তিগত সংগ্রহের ২০টি বই একসঙ্গে বিক্রির তালিকায় যায়, তখন এটি শুধু বই বিক্রির ঘটনা থাকে না, এটি ইতিহাস, স্মৃতি ও শ্রদ্ধাকে পরিত্যক্ত করার এক প্রতীকী ঘটনায় পরিণত হয়।
বাংলা একাডেমিতে আরও কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর ব্যক্তিগত সংগ্রহের অনেক বই রয়েছে। তবে এটিও ঠিক যে, সেগুলো বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ থাকে। ধুলোর কারণে অনেক রুমেই ঢোকাই যায় না। বাংলা একাডেমি যদি সেগুলো যথাযথ সংরক্ষণে না রাখতে পারে, তাহলে সংগ্রহ না করাই ভালো। সংরক্ষণের খামতি নিয়ে আলোচনা হতে পারে, অন্য কীভাবে সেটি সংরক্ষণ করা যায় কিংবা জনসাধারণের অধিক ব্যবহারযোগ্য করা যায় তা নিয়ে কর্মপরিকল্পনা হতে পারে। কিন্তু কেজি দরে ব্যক্তিগত সংগ্রহের বই বিক্রি সত্যিই আহত হওয়ার মতো সংবাদ। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের স্মৃতি, তার বই, এসব শুধু কাগজ নয়; এগুলো জাতির আত্মমর্যাদার অংশ।