রাশিয়া: নতজানু হবার আদিম আখ্যান

ঠিক কীভাবে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন? কীভাবে জনগণের সম্পত্তি হাতিয়ে নিয়েছিল দুর্বৃত্তের দল?

শাহাব আহমেদশাহাব আহমেদ
Published : 30 Sept 2022, 04:49 PM
Updated : 30 Sept 2022, 04:49 PM

খুশির কী আছে ক্ষেতের উপর যদি একশ বারও মেঘ আসে;

আমি তো জানি এখন থেকেই বিদ্যুৎ খুঁজছে আমার ধানের গোলার ঠিকানা।

—মির্জা গালিব/ আবু সয়ীদ আইয়ুব

১.

গর্বাচেভকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, ন্যাটো পুবদিকে মানে রাশিয়ার দিকে এক ইঞ্চিও এগুবে না। অথচ তারা এগুতে এগুতে সারা পূর্ব ইউরোপকে কব্জা করে নিয়েছে। প্রশ্ন হলো শক্তিশালী রাশিয়া তা করতে দিল কেন? এবং আগে অন্য দেশগুলোকে যেভাবে যেতে দিয়েছে, ইউক্রেইনকে সেভাবে যেতে দিলেই তো যুদ্ধটা বাঁধতো না, মানুষ বাঁচতো এবং রাশিয়া ‘সভ্য’ দুনিয়ার সন্মানিত সদস্য হিসেবে ইউরোপীয় মূল্যবোধের অংশীদার থাকতো।

উত্তর হলো: রাশিয়া শক্তিশালী ছিল না, তাকে নতজানু করা হয়েছিল। তাই ন্যাটোর দুঃসাহসের প্লীহা এতটা বেড়েছিল। এখন রাশিয়া আর নতজানু নয়, ন্যাটোর নষ্টামির সঠিক উত্তর দিতে সে সক্ষম।

এবং যে ‘ইউরোপীয় মূল্যবোধ’ নিয়ে এত ট্রাম্পেট বাজানো হয়, তা আসলে কী?

আফ্রিকা থেকে মানুষ ধরে এনে দাস হিসেবে বিক্রি করা এবং সারাদুনিয়াব্যাপী দেশের পরে দেশ দখল করে অমানবিক শোষণ নিপীড়ন যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে কোটি কোটি মানুষ হত্যা করা এবং মুখে মুখে যীশু ও গণতন্ত্রের যপ করা। ইউরোপীয় মূল্যবোধের ঝোলায় আছে দু দুটি মহাযুদ্ধ, যারা শত শত বর্ষ ধরে নিজেরা নিজেদের হত্যা করে, ধর্ষণ করে মহান ‘ইভিল ইউনিয়ন’ তৈরি (ইইউ) করেছে এবং একে অন্যের টুঁটি চেপে ধরছে। মুক্তচিন্তার কিছু মহান মানুষ ও শিল্প সাহিত্য দর্শন ও বিজ্ঞানের কিছু মহৎ সৃষ্টি ছাড়া (যারা নিজেরাও ইউরোপে ছিল নিঃস্ব, নিপীড়িত, নিগৃহীত ও নিহত) ইউরোপ পৃথিবীকে কী দিয়েছে? হিংসা ও ক্লেদ, যেখানে প্রাচ্য দিয়েছে মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, ধর্ম ও শান্তির দর্শন। রাশিয়া ইউরোপীয় মূল্যবোধের অংশ নয়, কোনওদিন ছিল না।

কীভাবে রাশিয়াকে নতজানু করা হয়েছিল?

১৯৯১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নে কাস্তে-হাতুড়ি সমন্বিত লাল পতাকা নামিয়ে ফেলা হয়। ১৯৯২ সালের জানুয়ারি মাসের ১ তারিখে সোভিয়েত জনগণকে নতুন অর্থনৈতিক রিফর্ম উপহার দেয় ইয়েলৎসিন-গাইদার-চুভাইস প্রশাসন। তাদের পরামর্শদাতা হয় আমেরিকা থেকে আসা একগুচ্ছ স্পেশালিস্ট।

তারা ৭০ বছর ধরে চলে আসা সরকারি মূল্য-নিয়ন্ত্রণ ও কেন্দ্রিয় বণ্টন ব্যবস্থা তুলে দিয়ে রুবলকে স্বাধীন সন্তরণে পাঠায়। রুবল আমেরিকার হিতোপদেশ নিয়ে রাশিয়ার অর্থনৈতিক রিফর্মের শেয়াল ও মুর্গির দ্বন্দ্ববাদ মেনে সাঁতরাতে অস্বীকার করে। ফলে সে ডুবে যায়।

মাত্র গত সন্ধ্যায় যে খাদ্যের দাম ছিল ২ রুবল, সকালে তার দাম হয় ৯৭ রুবল, যে রুটির দাম ছিল ৫০ কোপেক, সকালে হয় ৩০ রুবল। ফ্রি ফ্লোটিং মার্কেট, দামের কোনো মা-বাপ নেই। শিল্পপণ্য ও যন্ত্রপাতির দামও হয় আকাশচুম্বী। যে ডিজেল জেনারেটরের দাম ছিল ১ লাখ রুবল, তার দাম হয় ৩০ লাখ রুবল। অথচ বৃদ্ধদের পেনশন ১ হাজার রুবল থেকে বেড়ে হয় মাত্র ২ বা ৩ হাজার রুবল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে এই প্রথম রাশিয়ার রাস্তা-ঘাটে মৃতমানুষ দেখা যেতে শুরু করে। ১৯৯২ সালের তুলনায় মৃত্যুর হার বাড়ে ২০ শতাংশ এবং জন্মের হার কমে ১৪ শতাংশ। সুবোধ নাগরিকের সারা জীবনের জমানো ব্যাংক ডিপোজিট ও পেনশন এক রাতের মধ্যে কাগজে পরিণত হয়। এই সময়টায় আমি সেই দেশে ছিলাম।

বিপ্লবের পর পর ১৯১৮-১৯২১ সালের রাশিয়ার অবস্থা এমন ছিল। ১৯২১ সালে যখন ‘ক্রনস্টাডট বিদ্রো’ সংঘটিত হয় বলশেভিক সরকারের বিরুদ্ধে, তখন খাদ্য ছিল না, জ্বালানি ছিল না, ছিল অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি শীত। মানুষ ক্ষুধায় ও শীতে মরছিল।

১৯১৩ সালে তারা যে বেতন পেতো, ১৯২১ সালের শুরুতে তার মূল্য হয় মাত্র ২১ কোপেক।

সে বছরেরই মাঝামাঝি তা কমে দাঁড়ায় ১৬ কোপেকে। খাদ্যের রেশন প্রথা চালু করা হয়। ক্রনস্টাডটে শ্রমিকপ্রতি দিনে মাত্র ৬০০-৮০০ গ্রাম রুটি দেয়া হতো, পেত্রোগ্রাদে ৩০০-৪০০ গ্রাম, আর মস্কোতে ২২৫ গ্রাম। মাংস দেওয়া হতো যথাক্রমে ১০০ গ্রাম, ৫০ গ্রাম ও ৭ গ্রাম। চিনি ৬০-৮০ গ্রাম, ৩০-৪০ গ্রাম ও ১০ গ্রাম। বুদ্ধিজীবীদেরকে যেহেতু রাষ্ট্রের একটি পরজীবী শ্রেণি বলে গণ্য করা হতো, তাদের রুটির নরম ছিল অনেক কম।

১৯১৭ সালে পেত্রোগ্রাদে লোকসংখ্যা ছিল ২৪ লাখ, তাদের মধ্যে শ্রমিক ছিল ৩ লাখ। ১৯২১ সালে জনসংখ্যা নেমে হয় মাত্র ৫ লাখ এবং শ্রমিকের সংখ্যা ৮০ হাজার।

১৯২১ সালের ক্রনস্টাড বিদ্রোহের মাত্র কিছুদিন আগে জ্বালানির অভাবে পেত্রগ্রাদে ৯৩টি ফ্যাক্টরি বন্ধ করে অবশিষ্ট মাত্র ৮০ হাজার শ্রমিকের থেকে আরও ৩০ হাজারকে রাস্তায় ঠেলে দেওয়া হয়।

ফলে পেত্রোগ্রাদ এবার লেনিনের সরকারের বিরুদ্ধে ফুসে উঠে শ্লোগান তোলে: “বলশেভিকমুক্ত সোভিয়েত চাই’, “ক্ষুধা থেকে বাঁচতে চাও?”, “কমিশারদের খতম করো”- এই ছিল চিত্র। সেই বিপ্লবকে রক্ষা করা হয়েছিল। লেনিন অবিলম্বে কতগুলো বাস্তব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন ন্যাপে উত্তরণের মাধ্যমে। জবরদস্তি করে শস্য কেড়ে নেওয়ার ‘যুদ্ধ কমিউনিজম’ বাতিল করে কৃষকদের নিজস্ব শস্য বেচা-কেনা করার অধিকার দিয়ে, সীমিতভাবে ব্যক্তিমালিকানা বৈধ করে দেন। এভাবে বিপ্লবের পর পর নিষিদ্ধ করে দেওয়া ব্যবসা-বাণিজ্য চালানোর মার্কেট ইকোনমি উন্মুক্ত করা হয়। সাথে আসে দেশকে উকুন মুক্ত করার জন্য শ্লোগান,

“জিতিবে কে জোরে বলুন

 হয় বিপ্লব, নয় উকুন!” 

উকুন অপরিচ্ছন্নতা ও অস্বাস্থ্যকর জীবন থেকে আসে। শুরু হয় গণস্বাস্থ্য উন্নয়নের বিশাল প্রোগ্রাম। সবাইকে অক্ষরজ্ঞান দিয়ে, লিখতে ও পড়তে শেখানো। শিল্পায়নের পূর্বশর্ত হিসেবে আসে সর্বজনীন বিদ্যুতায়নের ডাক। জাতিসমূহকে ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে চার্চ ও রাষ্ট্রকে পৃথক করা হয়। আসে যুগ যুগ ধরে চলে আসা গৃহ ও পুরুষের দাসত্ব থেকে নারীকে মুক্ত করার প্রোগ্রাম।

এবং গুড়িয়ে দেওয়া শুরু হয় শতাব্দী প্রাচীন অন্ধকারের মন্দিরসমূহ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯৩০ সালের ‘রাশিয়ার চিঠি’ পড়লে দেখা যায় কত অল্প সময়ে এরা কী উন্নতি করেছে :

“মনে হলো, আরব্য উপন্যাসের জাদুকরের কীর্তি। বছর দশক আগেই এরা ঠিক আমাদেরই দেশে জন-মজুরদের মতোই নিরক্ষর নিঃসহায় নিরন্ন ছিল, তাদেরই মত অন্ধসংস্কার এবং মূঢ় ধার্মিকতা। দুঃখ বিপদে এরা দেবতার দ্বারে মাথা খুঁড়েছে; পরলোকের ভয়ে পাণ্ডা পুরুতদের কাছে এদের বুদ্ধি ছিল বাঁধা, আর ইহলোকের ভয়ে রাজপুরুষ মহাজন ও জমিদারের হাতে; যারা এদের জুতো-পেটা করতো তাদের সেই জুতো সাফ করা এদের কাজ ছিল।”

এই যে পরিবর্তনের জোয়ার এনেছিল রুশ বিপ্লব, কোথায় গেল সেই অর্জন? কেন ৭০ বছর পরে, ১৯৯২ সালে, সুপার পাওয়ার রাশিয়ার এক বিশাল জনগোষ্ঠীর অবস্থা ছিল সেই ১৯২১ সালের মতই?

কেন কিছুই বদলায়নি?

অথচ মহাকাশ বিজয় হয়েছে। বিশাল সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব তৈরি হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের হাজার হাজার লাখে লাখে ছাত্র-ছাত্রী এনে বিনামূল্যে পড়াশুনো শিখিয়ে স্ব স্ব দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সারা দুনিয়ার ভাতৃপ্রতীম কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকে লালন পালন করা হয়েছে অর্থ সাহায্য, পার্টি স্কুল, পার্টি হোটেল, বিমান ভাড়া, খাদ্য, চিকিৎসার খরচ বহন করে।

কিন্তু অর্ডিনারি সোভিয়েত পেনশিওনার, যারা যুদ্ধ করে নাৎসিবাদের মহামারী থেকে বিশ্বকে রক্ষা করেছে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নকে মহান গৌরীসেন বানিয়েছে, তারা আজ ক্ষুধায় রাস্তায় পড়ে পড়ে মারা যাচ্ছে। অথবা তাদের ফ্লাটগুলো বিভিন্ন কূট চালে কেড়ে নিয়ে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছে কিংবা তারা নিঁখোজ হয়ে যাচ্ছে।

মানুষ মানুষের জন্য নয়।

সারা বিশ্বের সমাজতন্ত্রীরা এতকাল সোভিয়েত ছদ্ম সমাজতন্ত্রের মধু খেয়েছে, স্ট্যালিন ও তৎপরবর্তি প্রতিটি নেতাকে মহান নেতা বলে তোষামোদ করেছে, মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তত্ত্ব কপচাতে কচলাতে এমনই ‘ফানাফিল্লা’ অবস্থায় পৌঁছেছে যে তাদের চোখে পড়ে নাই এই দেশটিতে মানুষের মৌলিক অধিকার সামান্যতমও নেই। তারা সমস্বরে চিৎকার করছে এই পতন সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্ত। সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস করে দিল বিশ্বমানবতার মধুচক্র, যেন সাম্রাজ্যবাদ আগে চক্রান্ত করে নাই। লেনিন ট্রটস্কিরা টিকে ছিলেন উনিশ শ আঠারো, উনিশ, বিশ ও একুশ সালের সেই দুঃসময়ে। কিন্তু গর্বাচেভরা পারলেন না।

পারলেন না, কারণ চাইলেন না দেশটা টিকে থাকুক।

১৯৯২ সালে তারাই দাবি করেন যে, একটি বিড়াল, একটি কুকুরও ইউরোপের পুঁজিবাদি দুনিয়ায় বেশি স্বাধীনতা ভোগ করে, বেশি যত্ন পায়। একজন শ্রমিকের অবস্থা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে এদের চেয়েও ভালো। তারপরেও তারা প্রয়োজনে ধর্মঘট করতে পারে। শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, চলাচল, ভ্রমণ, বিশ্রাম, ছুটি, বিচার ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার ইওরোপের প্রতিটি পুঁজিবাদী দেশে তাদের তুলনায় বেশী নিশ্চিত।

এতকাল তাদের যা বলা হয়েছে, তা সত্য নয়।

লেনিন কি কোমল ছিলেন?

হ্যাঁ, তার কমরেডদের প্রতি, পরিবার পরিজনের প্রতি, কৃষক শ্রমিক শিশুদের প্রতি। কিন্তু লেনিন ইস্পাতের মত দৃঢ় ও অনমনীয় ছিলেন তার বিশ্বাসে। আর যাদের তিনি বিপ্লবের শত্রু মনে করতেন তাদের প্রতি ছিলেন নির্দয়, নির্মম। তাদের একজনকেও তিনি ক্ষমা করেন নাই এবং দৈহিকভাবে শত্রুদের নির্মূল করতে দ্বিধাবোধ করেন নাই।

জারের পরিবারের শিশুসহ কাউকে বাঁচতে দেওয়া হয়নি ১৯১৯ সালে। একজন কবি, নিকোলাই গুমিলেওভকে, লেনিনের মনে হয়েছে বিপ্লবের শত্রু, তাকে ১৯২১ সালে ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠানো হয়েছে ‘ক্রনস্টাডট বিদ্রোহে’ যুক্ত থাকার অভিযোগে।

তার হাত কাঁপেনি। বিবেকে বাঁধেনি।

শ্রদ্ধেয় প্লেখানভের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, বন্ধু মার্তভকে দেশচ্যুত করেছেন। কিন্তু কই শত তর্ক বিতর্ক করা সত্ত্বেও ট্রটস্কি, জিনোভিয়েভ, কামেনেভ, বুখারিন, রিকভ, তমস্কি ইত্যাদির একজনকেও তিনি পার্টি থেকে বের করে দেননি, দৈহিকভাবে নির্মূল করেননি।

কেন?

লেনিন তাদেরকে বিপ্লবের শত্রু মনে করেননি।

তিনি শত্রুকে ক্ষমা করেন না। ক্ষমতা তার জন্য ব্যক্তিগত স্বার্থ বা হিসাব নিকাশের বিষয় নয়। ক্ষমতা তার আদর্শ অর্জনের হাতিয়ার। যারা সেই আদর্শ অর্জনে তার সঙ্গী, তারা তর্ক করলেও কমরেড। ভেড়া তর্ক করে না, ব্যা ব্যা করে সম্মতি জানায়। মার্কস এবং এঙ্গেলসও তর্ক করেছেন একে অন্যের সাথে।

তর্ক করেছেন অন্যদের সাথে, ‘তর্কেই সত্যের জন্ম হয়’- এই ছিল তাদের বোধ। লক্ষ্য অর্জন হতো, কী হতো না- সেটা অন্য প্রসঙ্গ, কিন্তু লেনিন বিশ্বাস করতেন সমাজতন্ত্র ও মানবতার মুক্তি অর্জন সম্ভব।

এত বড় স্বপ্ন দেখার জন্য তার উত্তরসূরি ছিলেন খুব ছোট, ক্ষমতা যার কাছে ছিল অবিকল তাই, যা ছিল রোমের একনায়ক (৩৭-৪১ AD) ক্যালিগুলার কাছে। ক্যালিগুলা বলেছিলেন: “এটাই দুঃখ যে, রোমের জনগণের মাথা একটি নয়, এককোপে কেটে ফেলা যায় না।”

সিনেট তার সাথে তর্ক করে বলে, তিনি তাদের মতামত ও ক্ষমতায় বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তার ঘোড়া ইন্কিটেটাসকে (Incitatus) সিনেটের কনস্যুল নিযুক্ত করার হুমকি দেন। শুধু ঘাতকের ছুরি রোমকে রক্ষা করে ঘোড়া কনস্যুলের নিপীড়ন থেকে।

কিন্তু রাশিয়ায় তেমন কোনো ঘাতক ছিল না বলেই ক্ষমতার লোভ ক্যালিগুলাকেও হার মানিয়েছিল। ক্যালিগুলার দুঃস্বপ্নেও কখনও ধারণা হয়নি যে এত মানুষ হত্যা করা যায় এত ঠাণ্ডা মাথায়। রাশিয়ায় একে একে খুন করা হয়েছিল তাদের যারা বহু ত্যাগ, নির্বাসন ও জেলের নরক অতিক্রম করে বিপ্লব করেছিলেন ১৯১৭ সালে। সব বিতর্ক বন্ধ করে বিনা বাক্যে হাত তুলে সমর্থন করার সংস্কৃতি চালু করা হয়েছিল ডেমোক্রাটিক সেন্ট্রালিজমের নামে।

ভিন্নমত পরিণত হয়েছিল নিরবচ্ছিন্ন একমতে।

সেই মত ছিল একটাই: বাইরের চামড়াটি রেখে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে লেনিনের দেহটিকে বিতাড়ন করতে হবে, পার্টিকে মুক্ত করতে হবে তার অনুসারীদের থেকে। তাই তার কুঁচকানো মমি সংরক্ষণ করা হয়েছিল বিবেকের বাধা না শুনে ‘কাল্ট’ সৃষ্টি করার জন্য। লেনিনের লক্ষ্যের সাথে লেনিন-পরবর্তী কম্যুনিস্ট নেতাদের লক্ষ্য ভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সারা বিশ্বের নেতারা পরিণত হয়েছিলেন নতুন ক্যালিগুলার বিশ্বস্ত ইন্কিটেটাসে।

ক্যালিগুলার মডেলের পথে হেঁটে ১৯৯২ সালে রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর সরকারের কাছে পাওনা ছিল ২ ট্রিলিয়ন রুবল কিন্ত সরকার তা পরিশোধ করতে পারেনি। কোম্পানিগুলো দেউলিয়া হয়ে যায়। কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার টাকা নেই, কিছুদিন তৈরি পণ্য দিয়ে বেতন দেয়, পরে তা-ও শেষ হয়ে যায়।

দোকানে লাইন আছে, পণ্য নেই।

লেনিন বিপ্লব ছাড়া আর কিছু করে যাবার সময় পাননি। তার উত্তরসূরি ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত লৌহ করতলে রেখেছেন সবকিছু, তারপরে তারই যোগ্য ক্যাডার এবং শিষ্যরা দেশ চালিয়েছে। ক্রুশ্চেভ এই মহান নেতাকে গালাগালি করেছে বলে সে তার শিষ্য থেকে খারিজ হয়ে যায় না। সে দুষ্ট গুরুর সবচেয়ে সক্ষম শিষ্য। সে মার্কস লেনিনের বই পড়ে নয় (সে লেখাপড়া জানতো কিনা সন্দেহ) দুষ্ট গুরুর কাছ থেকে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ শিখেছে।

অনেকেই বলেন স্ট্যালিন ছিলেন বিশুদ্ধ, ক্রুশ্চেভেরা সংশোধনবাদী। তারাই এই দেশের পতনের কারণ। অথচ এরাই সোভিয়েত ইউনিয়নে এসেছেন পার্টি স্কুলে মার্কসবাদ শিখতে, সর্দি কাশির চিকিৎসা ও অ্যানুয়্যাল চেকআপ করাতে। এসেছেন ক্রুশ্চেভের আমলে, ব্রেজনেভের আমলে, আন্দ্রোপভ, চেরনেন্কো, গর্বাচভের আমলে- কিন্তু সংশোধনবাদ নিয়ে তাদের টু শব্দটিও করতে দেখা যায়নি। কারণটা পরিস্কার হয় ১৯৯১ সালের ১৯-২০ অগাস্টের মস্কো অভ্যুত্থানের পরে, যখন লেনিন-স্ট্যালিনের পার্টি নিষিদ্ধ করা হয় এবং থলের বিড়াল পথে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। প্রতিটি সোভিয়েত পত্র-পত্রিকায় কোন্ দেশের পার্টি নিয়মিত কত টাকা পেত তার তালিকা প্রকাশিত হয়।

বিগত ৭০ বছরের রাষ্ট্রশাসনের শেষ সময়টায় ক্ষমতায় ছিল যারা মার্কসবাদ নামক একটি মানবিক আইডিয়াকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মানবজাতির ইতিহাসের সবচাইতে অমানবিক কাজগুলোর সমমানের কাজ করার পরিকল্পনা তারাই করে। এই যেমন বরিস ইয়েলৎসিন, যিনি ছিলেন মস্কো কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। আনাতোলি চুভাইস, ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টির তথা আমাদের সব কমরেডের নেতা। এ রকম নাম অজস্র।

ফরাসি বিপ্লবের সময়ে যে পদ্ধতি ব্যবহার করে চার্চ, ইমিগ্রান্ট এবং রাজপরিবারের জমি ও সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে শুধু ধনিক শ্রেণির হাতে দেওয়া হয়েছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পরে তাই করা হয় রাশিয়ায়। ফ্রান্সের মতই সাধারণ মানুষ এর ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারেনি।

১৯৯১ সালের গ্রীষ্মে আইন প্রণয়ন করা হয় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সমস্ত কলকারখানা ও সম্পদ পাবলিক শেয়ার কোম্পানিতে পরিণত করে জনগণের কাছে বিক্রি করা হবে। প্রতিজন নাগরিকের নামে ব্যাংকে ‘প্রাইভেটাইজেশন অ্যাকাউন্ট’ খোলা হবে। সেই অ্যাকাউন্টে সরকার একটা নির্দিষ্ট অংকের টাকা জমা দেবে, যা দিয়ে তারা যেকোনও কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারবে। নাগরিকের নামধারী এই অ্যাকাউন্টগুলো হস্তান্তর বা বিক্রয়যোগ্য হবে না।

বিরাষ্ট্রীয়করণের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল শক্তিমান, সক্রিয় ও কার্যকর সম্পত্তির মালিক তৈরি করে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোতে গতিশীলতা দেওয়া। শুধু তাই নয়, বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো মানোন্নত পণ্য উৎপাদন করা। ফলে যে বাজার অর্থনীতি তৈরি হবার কথা তা হবে মানবিক এবং সমাজের বেশীরভাগ মানুষের স্বার্থ রক্ষাকারী।

কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি সমূহের তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা ‘গসকম ইমুশেস্তভা’-র চেয়ারম্যান আনাতোলি চুভাইস ও প্রধানমন্ত্রী ইগর গাইদার এর বিরোধিতা করেন। সোভিয়েত রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠন করার দৃশ্যমান মূল ইনস্ট্রুমেন্ট মনে করা হয় এদের। তারা বিকল্প হিসেবে ‘বেনামি ভাউচার’ ব্যবহারের প্রস্তাব দেন।

ইউরো-এশিয়ার বিশাল জায়ান্ট রাশিয়াকে ইউরোপ ও আমেরিকা চিরকাল তার শত্রু হিসেবে দেখেছে, রাশিয়ার সাথে তাদের সম্পর্ক ছিল শুধু যুদ্ধের। হয় তারা রাশিয়াকে আক্রমণ করে সহজে জয় করতে চেয়েছে, নয় অন্য রাষ্ট্রের সাথে তাদের যুদ্ধে রাশিয়াকে চেয়েছে সহযোদ্ধা হিসেবে। রাশিয়া নিজে যুদ্ধ নিয়ে অন্যের ঘরে গিয়েছে কম, তবে একেবারেই যায়নি এমন নয়। সেই রাশিয়ার বিপদ উত্তরণের জন্য, অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ১৯৯২ সালে ২০০ জনেরও বেশি বিদেশি বিভীষণকে চাকরি দেওয়া হয়। অসংখ্য সিআইএ এবং ইউএস আর্মির গুপ্ত এজেন্ট ছিল তাদের মধ্যে। না থাকাটাই ছিল নির্বোধের কাজ, পুঁজিবাদী পৃথিবী যে শত্রুকে ঘায়েল করেছে, তাকে মূলে ধ্বংস না করে থামতে পারে না। রাশিয়ার ক্ষমতায় যারা আসে, সেই ‘ক্লেপ্টোক্রাট’ সম্প্রদায়ও নির্বোধ ছিল না। তারা সজ্ঞানেই ডেকে এনেছিল বয়েল, ক্রিস্টোফার, শারোবেল, অ্যাকেরম্যান, ফিশার, ওয়াইমেন, কামিনস্কি, উইলসন ইত্যাদি বড় বড় পুঁজির দাসকে। হার্ভার্ডের প্রফেসর স্লেইফার ছিল প্রাক্তন সোভিয়েত নাগরিক, ১৯৭৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ইমিগ্রেশন নিয়ে চলে যায়। কিন্তু সে ফিরে আসে চুভাইসের বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়ায় কনসালট্যান্ট হিসেবে। ২০০৫ সালে মহান এই কনসালট্যান্ট ‘নিজস্ব পজিশন ও ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থ আদায় করার অভিযোগে’ আমেরিকায় গ্রেপ্তার হয়। ‘কনফ্লিক্ট অব ইনটারেস্ট’ আইনের আওতায় মাল্টি মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়, যা ছিল ষোল আনা চুরির অর্থ থেকে মাত্র ১ আনা জরিমানা দেওয়ার সমান।

চুভাইস গসকম-ইমুশেস্তভার ১৪১নং অর্ডারে বিরাষ্ট্রিকরণের বৈদেশিক শাখার প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করেন আমেরিকার ‘জোনাথান হেই’ নামে আরেক মহানকে, যে ছিল সিআইএ-র লোক এবং গোয়েন্দা সংস্থাটির কাজে রাশিয়ায় এসে ব্যক্তিগত অর্থের পাহাড় গড়ে তোলার কাজে নিযুক্ত হবার অভিযোগে হেই সহ আরও অনেকেরই আমেরিকায় বিচার, জেল ও জরিমানা হয়।

এই চুভাইসই পীড়াপীড়ি করে ইয়েলৎসিনকে দিয়ে একটি স্পেশাল অর্ডার স্বাক্ষর করিয়ে ‘নামধারী’ ভাউচার সমূহকে ‘বেনামি’ ভাউচারে পরিণত করেন। কাজটি করা হয় পার্লামেন্টের (দুমা) সুপ্রিম সোভিয়েতের গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময়ে। এই দুমাই ইয়েলৎসিনকে ক্রান্তিকালের ‘বিপদ তাড়ন পাচন’ হিসেবে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়েছিল কিছুদিন আগে। তিনি ইমার্জেন্সি আইন সই করতে পারতেন। সেই আইন ১০ দিনের মধ্যে দুমার সুপ্রিম সোভিয়েত কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত না হলে বাস্তবায়িত হয়ে যেতো। এমপিরা কৃষ্ণ সাগর, গ্রিস, সাইপ্রাস, ক্যানারি দ্বীপ, ফ্লোরিডায় ছুটিতে উর্বশী রৌদ্রস্নানে ব্যস্ত ছিল, তারা টেরই পায়নি মস্কোতে কী ঘটছে। ছুটি শেষে ফিরে এসে দেখে ‘যা হইবার তা হইয়া গেছে’। পুকুর চুরি নয়, আইন করে নগ্নভাবে সমুদ্রচুরির স্থায়ী বন্দোবস্ত করা হয়ে গেছে সবার অগোচরে।

এই নতুন আইনের আওতায় আস্তে আস্তে গুটি কয় 'অলিগার্খের' হাতে চলে যায় সেই দেশের সমস্ত সম্পদ। ইতিহাসের ইটের বদলে হয় পাটকেলের হিসেব-নিকেশ। বলশেভিকেরা আইন করে অন্যের সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রের হাতে দিয়েছিল, 'নব্য রুশীরা (যারা ছিল ১০০ শতাংশ কমিউনিস্ট নেতৃত্ব) সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রের হাত থেকে কেড়ে কয়েক জনের হাতে দিয়ে দেয়, যাদের নিজের পকেট থেকে এক পয়সাও খরচ করতে হয় না।

যারা উৎপাদনের সাথে জড়িত ছিল (মানে কোনো কলকারখানা, খনি বা দোকানে কর্মরত) তাদের স্ব স্ব কোম্পানির শেয়ার কেনার তত্ত্বগত সুযোগ দেওয়া হয়। অন্যদিকে যারা উৎপাদনের সাথে জড়িত নয় (ডাক্তার, শিক্ষক, বিজ্ঞানী ইত্যাদি) তাদের প্রথম থেকেই প্রাইভেটাইজেশনের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।

১৯৯২ সালের গ্রীষ্মে সারা দেশে যত সম্পদ ছিল তার মূল্য ধরা হয় হাস্যকর ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন রুবল (তখন ১ ডলার= ৩৫ রুবল )। এই অংকের সমমানের ১০ হাজার রুবল নমিনাল মূল্যের প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ভাউচার ছাপানো হয়।

শিশুসহ প্রতি নাগরিককে বিনামূল্যে ১টি করে ‘ভাউচার’ দেওয়া শুরু হয়। এতে কারো নাম ছিল না। তত্ত্বগতভাবে এই ভাউচার দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারার কথা । ভাউচারের দাম বা গুরুত্ব ছিল বিভিন্ন কোম্পানির জন্য বিভিন্ন। কোম্পানির প্রফিটাবিলিটির ওপরে ভিত্তি করে কোনো জায়গায় হয়তো ১ ভাউচার দিয়ে ৩টি শেয়ার কেনা যেত, আবার কোথাও ৩০০টি। কোথাও ভাউচার-ক্রীত শেয়ারের দাম লেখা হত - ১ রুবল, আবার কোথাও ১ লাখ রুবল কিন্তু তাতে কোনো ইতর বিশেষ হতো না।

‘রেড ডাইরেক্টর’দের জন্য এই বেনামী ভাউচার ছিল ঐশী ওহীর মতো। এরা পার্টি লাইনে ডাইরেক্টরের পদ দখল করেছে এবং এদের হাতে ক্ষমতা ছিল প্রচুর। তারাই প্রতিটি কোম্পানি, ফ্যাক্টরির সামনে বেনামে বসায় ‘আমরা ভাউচার কিনি’ এই সাইনবোর্ড সম্মিলিত ডেস্ক।

যারা স্বেচ্ছায় বিক্রি করতে ইতস্তত করে মাসের পর মাস সেই শ্রমিকদের বেতন ধরে রেখে, ভয় দেখিয়ে, বিভ্রান্তিকর প্রপাগাণ্ডা চালিয়ে- অল্পদিনের মধ্যেই বেনামী ভাউচারগুলো কুক্ষিগত করে নেয় এবং ভোরে মোরগ ডাকার আগেই এই কোম্পানিগুলো তাদের মালিকানায় চলে আসে।

প্রকৃতপক্ষে বেশিরভাগ লোক জানতোই না এই ভাউচার দিয়ে কী করা যায়, তারা নগদ কিছু রুবলের বিনিময়ে ওগুলো বিক্রি করে দেয়। যদিও আনাতোলি চুভাইস ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ১টি ভাউচার দিয়ে ২টি ‘ভোলগা’ গাড়ি কেনা সম্ভব (তৎকালীন রাশিয়ার খুব দামি গাড়ি), কিন্তু জনগণ বাস্তবে বড়জোর ২ বোতল ভদকা কিনতে পেরেছে।

এসময়ে রাশিয়ায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠতে থাকে বিভিন্ন ধরনের ‘চেক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’ সংক্ষেপে যাদের বলা হতো ‘চিফ’। রাশিয়ায় বসবাসকারী যে কেউ, সে বোবা, কালা, কানা, বুদ্ধিমান, গবেট যাই হোক না কেন ‘MMM – ইনভেস্ট’, ‘হপের- ইনভেস্ট’, ‘আলফা – ক্যাপিটাল’, ‘ফার্স্ট ভাউচার ফান্ড’, ‘মস্কো রিয়েল এস্টেট’, ‘অলবি’, ‘আববা’, ‘হেরমেস’, ‘নেফত-আলমাজ ইনভেস্ট’, ‘লুকঅয়েল ফান্ড’ ইত্যাদি আলাদিনের চেরাগ বিক্রয়কারী এই সংগঠনগুলোর নাম শুনে থাকবে। কারণ প্রতিটি টিভি চ্যানেলে ছিল তাদের রঙ্গিন বিজ্ঞাপন প্রতি ৩-৫ মিনিট পর পর। স্ট্যালিনের বিড়ালকে মরিচ খাওয়ানোর পদ্ধতি অবলম্বন করে এরা জনগণের মগজে পুশ করতে সক্ষম হয় যে চিফে ১০০ রুবল ইনভেস্ট করলে বছর শেষে তা হবে ৬০০ রুবল, ১ হাজার হবে ৬ হাজার আর ১ লাখ ফুলেফেঁপে হবে ৬ লাখ সোনার হরিণ।

৭০ বছর শৃঙ্খলিত, প্রতারিত, নিঃস্ব এবং মুদ্রাস্ফীতির সুনামিতে ভাসমান মানুষ তাদের শেষ সম্বল নিয়ে ছুটে যায় এই প্রাক্তন সাম্যবাদী নেতাদের প্রতিশ্রুত শান্তির কোলে। চিফগুলোর হাতে প্রচুর পরিমাণ ভাউচার জমা হয় এবং তারা নিলামে গিয়ে সেই ভাউচার দিয়ে বিভিন্ন কলকারখানা দোকানপাট ইত্যাদি কিনে নেয়।

বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এই নিলামগুলোতে সবার যাবার অনুমতি ছিল না, শুধু আমন্ত্রিত কোম্পানিসমূহই অংশগ্রহণ করতে পারতো, কেননা নিলামগুলোও নিয়ন্ত্রিত হতো বিভিন্ন গোষ্ঠির দ্বারা, যারা নিজেরা এই সম্পদগুলো কিনতে আগ্রহী ছিল। তাই যত চুপচাপ এবং যতখানি সম্ভব প্রতিদ্বন্দ্বী এড়িয়ে এই নিলামগুলো পরিচালিত হতো।

নিলামের কর্মকর্তারা নিজেরাই বেনামে ৪-৫টি কোম্পানি তৈরি করে অংশগ্রহণ করে সবচেয়ে লাভজনক কোম্পানিগুলো কিনে নেয় জলের দরে।

‘চেক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড’গুলো বেশকিছুদিন বিজ্ঞাপনের কামান দেগে জনগণের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়ে বিভিন্ন লাভজনক কোম্পানি ক্রয় করে, তারপরে অতি গোপনে তাদের মালিকানা ট্রান্সফার করে তাদেরই বেনামী অন্য কোনও কোম্পানির কাছে। তারপরে চিফগুলো নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে, জনগণের টাকা মেরে দেয়।

যারা ভাউচার বিক্রি করে ২ বোতল ভোদকা কিনেছিল তারা ছিল বুদ্ধিমান। কারণ যারা প্রচুর লাভের আশায় চিফগুলোতে ইনভেস্ট করেছিল, তারা এক পয়সাও পায়নি। সরকার এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, কারণ ক্ষমতার বিভিন্ন পোস্ট দখল করে ছিল তারাই।

ভাউচারের মাধ্যমে বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়া পরিকল্পিতভাবে ব্যর্থ প্রতিপন্ন করা হয়। সম্পদের বিরাট একটি অংশ বিক্রি হয়ে যায় কিন্তু কোষাগারে কোনো টাকা আসে না। রাষ্ট্র চালাবার অর্থসংকট দেখা দেয়। অন্যদিকে ৩ শতাং শের নীচে জনপ্রিয়তা নিয়ে ঘনিয়ে আসে বরিস ইয়েলৎসিনের রি-ইলেকশন ক্যাম্পেইন।

ভোটে জেতার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন।

১৯৯৫ সালে রাশিয়ার নব্য টাইকুন, ‘অনেক্সিম ব্যাংকে’র চেয়ারম্যান ভ্লাদিমির পতানিন বাজেটের ডেফিসিট কমানোর জন্য এবং ব্যবসায়ীদের থেকে অর্থ পাবার জন্য ‘লোনস ফর শেয়ারস’ (Loans for shares) বা ‘বন্ধকী অকশান’ এর ধারণার সৃষ্টি করেন।

রাষ্ট্রিয় সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক ও উপপ্রধানমন্ত্রী আনাতোলি চুভাইস, প্রধানমন্ত্রী ইগর গাইদার এবং সম্পদ বিতরণের অকশান পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত আলফ্রেড কোখ্ এ প্রস্তাব সমর্থন করেন। আনাতোলি চুভাইস বরিস ইয়েলৎসিনকে প্রস্তাবটি গেলাতে সক্ষম হন। তখনও পর্যন্ত রাষ্ট্রের হাতে থাকা, লাভজনক কিছু বড় বড় কোম্পানির (তেল, গ্যাস, নিকেল, স্বর্ণ, শিপিং ইত্যাদি) আংশিক শেয়ার কিছু বেসরকারী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রেখে সরকার স্বল্প সময়ের জন্য টাকা ধার নেবে। সময় মত (সেপ্টেম্বর, ১৯৯৬ সালের মধ্যে) টাকা ফেরত দিতে না পারলে এই ব্যাংকগুলো কোম্পানির মালিকানাপ্রাপ্ত হবে।

বাস্তবে এই ব্যবসায়ীরা তাদের সরকারি ক্ষমতা ও কানেকশান ব্যবহার করে সরকারি ব্যাংকগুলো থেকে কোনো গ্যারান্টি ছাড়া টাকা ধার করে, তা-ই সরকারকে দেয়। বিনিময়ে বড় বড় তেল কোম্পানি, খনি, এবং লাভজনক কোম্পানিগুলো তাদের কাছে বন্ধকী হয়ে আসে। পরিকল্পনা মতো রাষ্ট্র টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে সবচেয়ে লাভজনক কোম্পানিগুলো তাদের মালিকানায় চলে যায়। শুধু তাই নয়, তারা সরকারী ব্যাংক থেকে যে ঋণ নিয়েছিল তা ফেরত না দিয়ে ঋণ-খেলাপী হয়। পরে সদয় সরকার তাদের ঋণ মওকুফ করে দেয়।

সুতরাং এই স্কিম তৈরি করে তারাই, যারা রাষ্ট্রক্ষমতায়। যেমন বৃহত্তম তেলকোম্পানি ‘গাজপ্রমে’র মালিক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী প্রাক্তন কমরেড চের্নোমের্দিন।

শুধুমাত্র কয়েকটি ক্ষমতাশালী ব্যাংককে বন্ধকী নিলামে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়। রাশিয়ার ৫০০ বিশাল কোম্পানির ৮০ শতাংশ বিক্রি করা হয় এইভাবে গুপ্ত দরজা দিয়ে। ৩২৪ টি ফ্যাক্টরি বিক্রয় হয় গড়ে ৪ মিলিয়নের নীচে। যেমন: ‘উরালমাস’, যার শ্রমিক সংখ্যা ৩৪ হাজার, বিক্রি হয় মাত্র ৩ দশমিক ৭২ মিলিয়ন ডলারে।

‘চিলিয়াবিনস্কি মেটাল কম্বিনাট’ ৩৫ হাজার শ্রমিকসহ ৩ দশমিক ৭৩ মিলিয়ন ডলারে। ‘কভরভস্কি মেকানিকাল ফ্যাক্টরি’(যে ফ্যাক্টরি সোভিয়েত ইউনিয়নের সমস্ত আর্মি এবং মিলিশিয়ার বন্দুক সাপ্লাই করতো) ১০ হাজার ৬০০ শ্রমিকসহ বিক্রি হয় মাত্র ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলারে।

আর ‘চিলিয়াবিন্সক ট্রাক্টর ফ্যাক্টরি’- ৫৪ হাজার ৩০০ শ্রমিকসহ বিক্রি হয় মাত্র ২ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারে।

সোভিয়েত ইউনিয়নকে সুপার পাওয়ার বানিয়েছিল যেই কোম্পানিগুলো, ১৯৯৩ সালে তাদের ৮০ শতাংশ বিক্রি করে রাষ্ট্র হাতে পায় মাত্র ৯০ মিলিয়ন ডলার, যা ছিল তার বাজেটের ১০০ ভাগের মাত্র ১ ভাগ।

জাইগান্টিক লাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘নরিলস্কি নিকেল’ এর নিলাম জিতে নেয় ভ্লাদিমির পতানিনের কোম্পানি। এই কোম্পানি ছিল বিশ্বের ২৫ শতাংশ নিকেল বিক্রেতা এবং রাশিয়ার ৯০ শতাংশের বেশি নিকেল, ৬০ শতাংশের বেশি কপার উৎপাদনকারী, যার ছিল ৯৫-১০০ বছর চলার মতো রিজার্ভ, বছরে মুনাফা করতো ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। এবং উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৭০ শতাংশ, বিক্রি করা হয় মাত্র ১৭০ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার দামে।

মাত্র তিনটি ব্যাংককে এর নিলামে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়। তারা মূল্য প্রস্তাব করে ১৭০, ১৭০ এবং ১৭০ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার।

আদতে তিনটি কোম্পানিই ছিল বেনামে পতানিনের। অন্য কোম্পানি, ‘রাস্সিস্কি ক্রেডিট ব্যাংক’ ৩৫৫ মিলিয়ন ডলার দাম প্রস্তাব করলেও, নিলাম পরিচালক পতানিন এই ব্যাংককে নিলামে অংশগ্রহণ করা থেকে ডিসকোয়ালিফাই করে এই মর্মে যে, রাস্সিস্কি ক্রেডিট ব্যাংকের চার্টার ক্যাপিটাল প্রস্তাবিত টাকার অংকের চেয়ে কম। অথচ পতানিনের যে কোম্পানি ১৭০ দশমিক ১ মিলিয়নে বিড জিতে তার চার্টার ক্যাপিটালও ছিল প্রস্তাবিত টাকার অংকের চেয়ে কম। কয়েকবছরের মাথায় নরিলস্কি নিকেলের দাম দাঁড়ায় প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার, তা-ও বহু বহু বছর আগের কথা।

বন্ধকী নিলামের মাধ্যমে কুক্ষিগত করা আরও কয়েকটি কোম্পানি:

‘সিবনেফত’ ১০০ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয় যার প্রকৃত মূল্য ছিল প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার।

‘ইউকোস’ ১৫৯ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয় যার প্রকৃত মূল্য ছিল প্রায় ৫ বিলিয়ন, এটির মালিক খদরকোভস্কিকে ২০০৩ সালে জেলে পুরে রাষ্ট্র কর্তৃক দখল করে নেওয়ার সময় দাম ছিল ৩৫ বিলিয়ন ডলার।

‘মেচেল’ বিক্রি হয়েছিল ১৩ মিলিয়ন ডলারে। যার প্রকৃত মূল্য ছিল ১২ বিলিয়ন ডলার।

‘মুরমানসক মেরিন শিপিং কোম্পানি’ বিক্রি হয়েছিল ৪ দশমিক ১২৬ মিলিয়ন ডলারে যার প্রকৃত মূল্য ২৪৮ মিলিয়ন।

এ ছাড়াও একইভাবে জলের দরে বিক্রি হয়

লুকঅয়েল, সুরগুতনেফতেগাজ, নভোলিপেৎস্ক স্টিল কমপ্লেক্স, নভোরাস্সিস্ক মেরিন শিপিং কোম্পানি।

এইভাবে রাশিয়া জন্ম দেয় বেরেজভস্কি, খদরকোভস্কি, আব্রামোভিচ ইত্যাদি অসংখ্য অলিগার্খের। বলিভিয়া, পোল্যান্ড ও রাশিয়ার শক থেরাপির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ, জেফরি সাক্সের মতে:

"রাশিয়ান নেতৃত্ব মার্কসবাদীদের ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে সবচাইতে ফ্যানটাসটিক ধারণাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তাদের ধারণা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে সামান্য কিছু ক্যাপিটালিস্টের পদসেবা করা এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রাষ্ট্রের অর্থ তাদের পকেটে ট্রান্সফার করা। একে ‘শক থেরাপি’ বলে না। এই অসৎ, দুরভিসন্ধিমূলক ও পূর্বপরিকল্পিত কাজের একটাই লক্ষ্য: ছোট একগ্রুপ লোকের হাতে রাষ্ট্রের বিশাল সম্পদের হস্তান্তর।"

এই হলো রাশিয়ার নিঃস্বায়ন ও নতজানু হবার আদিম আখ্যান। এবং ন্যাটো তাকে প্রতিটি পথের ধার থেকে উঠিয়ে দিয়ে দিয়ে এস্তোনিয়া, লিথুনিয়া, লাটভিয়া পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে।

বিশাল হয়েও যে নিঃস্ব, যে দুর্বল, তার কণ্ঠ চিরেই তো বের হয় দীর্ঘশ্বাস।

“মন্দির নয়, কাবা নয়, কারো দরজা নয়, আস্তানা নয়

বসে আছি পথের ধারে, সেখান থেকেও আমাকে উঠিয়ে দেয় কেন?”

—মির্জা গালিব/ আবু সয়ীদ আইয়ুব

সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক