২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সংবাদমাধ্যম নিয়ে সরকারের আশ্বাসের সঙ্গে কর্মকাণ্ডের মিল নেই

সরকার বদলায়, শাসনের ধরণ বদলায়; কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে কোণঠাসা করার পুরনো কৌশল কেন বদলায় না?

সংবাদমাধ্যম নিয়ে সরকারের আশ্বাসের সঙ্গে কর্মকাণ্ডের মিল নেই
ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও বদলায় না সংবাদমাধ্যমকে শৃঙ্খলিত করে রাখার পুরোনো সংস্কৃতি। ছবি: এআই

মাহবুবুল হক ভূঁইয়া মাহবুবুল হক ভূঁইয়া

Published : 08 Sep 2026, 01:57 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:56 AM

আন্দালিব রহমান পার্থ তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পরই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে সরকার কোনোভাবেই সংবাদমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না। কিন্তু এই আশ্বাসের ঠিক পরদিনই ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির তার নাগরিকত্ব নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাম উল্লেখ না করে একটি সংবাদপত্রকে তীব্র আক্রমণ করেন। মূলত পত্রিকাটি তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ছেড়েছেন কি না, সে বিষয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করেছিল।

সংবাদ সম্পর্কে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য চাওয়া হলে তিনি দ্বৈত নাগরিকত্ব ছেড়েছেন কি না—সেই সহজ প্রশ্নের সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। ‘হ্যাঁ’ বললে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আইনি প্রশ্ন তৈরি হতো, আর ‘না’ বললে অসত্য ভাষণের ঝুঁকি থাকত। ফলে তিনি দুই মিনিটের বক্তব্যে হাস্যরস করে বিষয়টি পাশ কাটানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্রটির সাংবাদিকতা নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন।

একই দিনে স্টার নিউজের এক প্রতিবেদকের সঙ্গে চট্টগ্রাম-৭ আসনের সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীর একটি ফোনালাপ প্রকাশ্যে এসেছে। ওই প্রতিবেদক সরকারি ই-জিপি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘দোহাটেক’-এর অফিসে অনিয়মসংক্রান্ত সংবাদের বক্তব্য নিতে গিয়েছিলেন। খবর পেয়ে সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী সরাসরি প্রতিবেদককে ফোন করে সেখানে যাওয়ার কারণ জানতে চান এবং সেখান থেকে অবিলম্বে ‘রওয়ানা দিয়ে দিতে’ বলেন।

এর আগে জুন মাসে বগুড়ায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে জড়িয়ে অপপ্রচার ও মানহানিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে একটি মামলা হয়। সেই মামলায় মো. রেজানুর ইসলাম নামে স্থানীয় এক সম্পাদককে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগও আনা হয়।

এই তিনটি ঘটনাকে পৃথক বা বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো বিশ্লেষণ করলে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর ক্ষমতার চাপ প্রয়োগের তিনটি বিপজ্জনক প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে দেওয়া সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার আশ্বাসের সম্পূর্ণ বিপরীত।

সংবাদমাধ্যমকে ঘায়েল করার এই সরকারি কৌশল নতুন কিছু নয়; বাংলাদেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তা হয়ে আসছে। সরকার বদলায়, শাসনের ধরণ বদলায়; কিন্তু সংবাদমাধ্যমকে কোণঠাসা করার পুরনো কৌশল বদলায় না। বিগত ২০০৯-২০২৪ মেয়াদে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া আক্রমণাত্মক বক্তব্যের পর নানাবিধ বাস্তব ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়েছে সংবাদমাধ্যমকে। ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে আসা এজাতীয় বক্তব্য মূলত তাদের অনুসারী ও প্রশাসন যন্ত্রের কাছে সংকেত হিসেবে কাজ করে। হামলা-মামলা করে সাংবাদিকদের কোণঠাসা করার ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তার নাগরিকত্ব নিয়ে খবর প্রকাশ করায় সংবাদপত্রটিকে আক্রমণ করতে গিয়ে ২০০৮ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট টেনেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি চিহ্নিত রাজনৈতিক গোষ্ঠিও ওই পত্রিকাটিকে ঘায়েল করতে একই কৌশল ব্যবহার করে আসছে। তবে সাধারণ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর মন্তব্যের সঙ্গে রাষ্ট্রের একজন মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রভাব এক নয়। একজন মন্ত্রীর বক্তব্যের পেছনে রাষ্ট্রীয় নির্বাহী ক্ষমতার অপ্রত্যক্ষ মনস্তাত্ত্বিক চাপ যুক্ত থাকে।

নাগরিকত্বের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিলেও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিজেকে ‘অ-সুবিধাবাদী’ দাবি করে দেশে এসে সেবা দেওয়ার ন্যায্যতা প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সুবিধাজনক সময়ে ‘অভাগা জাতি’কে সেবা দিতে দেশে আসা দ্বৈত নাগরিক রাজনীতিবিদ বা কর্মকর্তাদের অভাব নেই; আবার পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে বিপুল সম্পদ নিয়ে বিদেশের ঠিকানায় ফিরে যাওয়ার অসংখ্য দৃষ্টান্তও সংবাদমাধ্যমে বিদ্যমান।

অন্যদিকে সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরীর ঘটনাটি সংবাদের তথ্য সংগ্রহের স্বাধীন প্রক্রিয়ায় সরাসরি হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার নগ্ন প্রদর্শন। তিনি সাংবাদিককে নির্দেশ দেওয়ার সময় শুধু একজন সংসদ সদস্য হিসেবে নিজের পরিচয় দেননি, বরং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পুত্র হিসেবে নিজের পারিবারিক রাজনৈতিক প্রভাবকেও তুলে ধরেছেন। পরবর্তীতে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি অবশ্য দাবি করেন যে, পারিবারিক সুসম্পর্কের খাতিরে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবেই তিনি সাংবাদিককে সেখান থেকে চলে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু কথোপকথনের ধরণ ও শব্দচয়ন স্পষ্টত হুমকিমূলক ছিল।

তৃতীয় ঘটনাটিতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে দুই পক্ষের আপস-মীমাংসার পর গ্রেপ্তারকৃত সম্পাদক রেজানুর রহমানের জামিনের ব্যবস্থা করা হয়। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়নি; বরং কেবল জামিন দেওয়া হয়েছে। ফলে আইনের তরবারি ঝুলিয়ে রেখে সাংবাদিকদের একটি স্থায়ী ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে কাজ করতে বাধ্য করার কৌশলটি এখানেও দৃশ্যমান।

এই তিনটি ঘটনার ধরণ আলাদা হলেও এর যৌথ মনস্তাত্ত্বিক পরিণতি একই: সংবাদমাধ্যমকে ক্ষমতাবানদের প্রশ্ন করা থেকে নিরুৎসাহিত করা; তথ্য ও সংবাদ সংগ্রহের স্বাভাবিক স্বাধীনতা সংকুচিত করা এবং সাংবাদিকদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্ম-নিয়ন্ত্রণের পরিবেশ তৈরি করা।

এর ফলে সাংবাদিকেরা ভবিষ্যতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করতে ভয় পাবেন এবং কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ প্রশ্ন বেছে নিতে বাধ্য হবেন, যা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার ভিত্তিকে ধসিয়ে দেয়।

সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, সরকারের নীতিনির্ধারকদের স্ববিরোধী অবস্থান। বর্তমান বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে গণতন্ত্রের মৌলিক উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে সদ্যসাবেক তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনও একাধিকবার বলেছেন যে, মুক্ত গণমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র টিকতে পারে না এবং সরকারের কাজ জনগণের স্বার্থে হচ্ছে কি না—তা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন তোলা উচিত।

অথচ বাস্তবে এইচআরএসএস-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ২০০টি হামলায় ৩৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। জয়পুরহাট ও নাটোরে ইউএনও কার্যালয়ের ভেতরেই সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ক্ষমতাসীন দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।

সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা যখন নিজেরা প্রকাশ্যে সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণ করেন, তখন তা স্থানীয় নেতাকর্মীদেরও সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হতে উসকানি দেয়। মুখে সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের কথা বলে বাস্তবে দমনপীড়নের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হলে মুক্ত সাংবাদিকতা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

মাহবুবুল হক ভূঁইয়া কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি গবেষণারত। ই-মেইল: tareq.mcj@gmail.com