Published : 02 Jun 2026, 09:55 AM
নেতানিয়াহু এখন পর্যন্ত কাউকেই হারাতে পারেননি। কোনো লক্ষ্য অর্জন তো দূরের কথা। তিনি গাজায় নারকীয় গণহত্যা, সিরিয়ায় পুনঃপুন আক্রমণ কিংবা ইরানে আকাশপথে বোমা হামলা করেন। বারবার বিভিন্ন দেশে বিমান হামলা, গুপ্তহত্যা, পেজার হামলা ও স্থল অভিযান চালিয়ে নিজেই নিজ বিজয়ের ঢোল পেটান। অথচ কোনো শত্রুই পরাজিত হয়নি।
প্রচারযুদ্ধ আর নাটকীয় সংবাদ সম্মেলনের পর্দা সরালেই ভিন্ন এক চিত্র দেখা যায়। নেতানিয়াহু ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত একজন রাজনীতিক। ইহুদি পতাকা গায়ে জড়িয়ে তিনি নিজেকে পশ্চিমা সভ্যতার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেন। এটি তার রাজনীতির কেন্দ্র। আর সে রাজনীতি আজ এক ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের জন্ম দিয়েছে।
নেতানিয়াহু সবকিছু হারিয়েছেন
সবচেয়ে তীব্র সমালোচনা এসেছে ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের ভেতর থেকেই। ইরান অভিযানের পর এখন যুদ্ধবিরতি চলছে। এ অবস্থায় বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ নীরবতা ভাঙেন। তার দাবি, এ যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েলের কোনো ভূমিকাই ছিল না। তার ভাষায়, “ইসরায়েলের সমগ্র ইতিহাসে এমন রাজনৈতিক বিপর্যয় আর কখনো হয়নি।”
লাপিদের মতে, নেতানিয়াহু দেশকে এক কৌশলগত পতনের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। এর ভিত্তি ঔদ্ধত্য, দায়িত্বহীনতা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবহেলা। আর আমেরিকার কাছে বিক্রি করা মিথ্যা। ফলে দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাসও ক্ষয়ে গেছে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীকে যা করতে বলা হয়েছিল, তারা তা করেছে। কিন্তু বাকি সবখানেই নেতানিয়াহু ব্যর্থ হয়েছেন।
নেতানিয়াহু নিজেকে ডেভিড বেন-গুরিয়নের উত্তরসূরি ভাবেন। বেন-গুরিয়ন প্রতিষ্ঠান গড়তেন, নেতানিয়াহুর আমলে সেগুলো অন্তঃসারশূন্য। বেন-গুরিয়ন মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতেন, নেতানিয়াহু করেন বিভক্ত। বেন-গুরিয়ন রাষ্ট্র গড়তেন, নেতানিয়াহু ক্ষমতা আঁকড়ে রাখেন।
যুদ্ধ নেতানিয়াহুর কাছে আইনি ঝামেলা এড়ানোর কৌশল
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এক আসামি। ইসরায়েলের ইতিহাসে তিনিই প্রথম প্রধানমন্ত্রী, যিনি ঘুষ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের একাধিক মামলার মুখোমুখি। প্রতিবারই শুনানি পিছিয়েছে, স্থগিত হয়েছে কিংবা নানান ফন্দিফিকির করেছেন।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অজুহাত তুলে তিনি বারবার সময় চান। দাবি করেন, অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। অথচ মামলা থেকে বাঁচতেই তিনি গাজা, লেবানন ও ইরানের যুদ্ধকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানিয়েছেন। আদালত যখনই সাক্ষ্যগ্রহণের সময় ঠিক করে, তিনি নতুন সংঘাত বা সামরিক অভিযান সূচনা করেন।
নেসেট সদস্য নামা লাজিমি সরাসরি বলেছেন, নেতানিয়াহু “নিজ স্বার্থে ইসরায়েল এবং আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ বাজি ধরেছেন।” গিলাদ কারিভ আরও এক কদম এগিয়ে নেতানিয়াহু ও তার যুদ্ধবাজ চক্রকে দায়ী করেন। তার মতে, কেবল এক ব্যক্তিকে সাজা থেকে বাঁচাতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং ইসরায়েলিদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর কাছে যুদ্ধ কোনো শেষ সিদ্ধান্ত বা পথ নয়। এটি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল।
সম্মিলিত সমালোচনার ঝড়
ইসরায়েলের অন্যতম নির্ভীক সাংবাদিক এবং ‘হারেৎজ’ পত্রিকার বিশ্লেষক গিডিয়ন লেভির পর্যবেক্ষণ, ইসরায়েল পাহাড়সম ভীতি সৃষ্টি করে, কিন্তু কৌশলগত সাফল্য পায় সামান্যই। ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যুদ্ধ শেষে আমরা কী পাব? কেউ কি সত্যিই মনে করে, দুই বছর আগের তুলনায় ইসরায়েল আজ বেশি নিরাপদ? আমার তা মনে হয় না। কারণ যুদ্ধের মূল্য কী, সে বিষয়ে যুদ্ধবাজদের ধারণাই নেই।”
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন মিয়ারশাইমারও একই সুরে কথা বলেন। কড়া ভাষায় বলেন, গাজায় ইসরায়েল ব্যর্থ হয়েছে। নেতানিয়াহু হামাসকে পরাজিত করতে পারেননি। ফিলিস্তিনিরা নিজেদের ঘরে ফিরছিল, আর জিম্মি ও বন্দি বিনিময়ের অনুপাত ছিল অসম ও অপমানজনক। মিয়ারশাইমারের ভাষায়, “আমি দেখছি নেতানিয়াহু শুধু উত্তেজনা বাড়িয়েই চলেছেন।” তার মতে, উত্তেজনা বৃদ্ধি মানে বিজয় নয়। আরও গভীর অচলাবস্থা, আরও বেশি বিচ্ছিন্নতা এবং আরও বড় লোকসানের পথ।
কৌশলগত দিক নিয়েও তিনি ছিলেন স্পষ্ট। তার মতে, ইসরায়েল “শুধু সম্মান নয়, অর্থনীতিরও ব্যাপক ক্ষতি করছে।” তিনি আশঙ্কা করেন, দেশটির উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির উৎপাদনশীল উদ্যোক্তারা ক্রমেই দেশ ছাড়বে। আর ইরান প্রসঙ্গে তার মূল্যায়ন আরও কঠোর, নেতানিয়াহুর নীতি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা কমায়নি, আরও বাড়িয়েছে।
‘দ্য গ্রেজোন’ পত্রিকার সম্পাদক ম্যাক্স ব্লুমেনথালও একই ধরনের সতর্কবার্তা দেন। তিনি বিশদভাবে নথিভুক্ত করে দেখান, কীভাবে নেতানিয়াহুর যুদ্ধনীতি ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তার মতে, এর ফলে এমন সব সংঘাতের পক্ষে সমর্থন যোগানো হয়েছে, যা ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদ সমর্থন করে। এতে আমেরিকার সম্পদ ও আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষয় হচ্ছে।
তবে এসব সমালোচনার মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক সতর্কবার্তা এসেছে অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন কর্নেল লরেন্স উইলকারসনের কাছ থেকে। তার মতে, নেতানিয়াহু ইসরায়েলকে এক অস্তিত্বগত সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তার ভাষায়, “লেভান্তের বুক থেকে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল বিলীন হয়ে যাবে।” উইলকারসনের ধারণা, সামরিক বাহিনীর অতিবিস্তার, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং কৌশলগত বিচ্ছিন্নতা মিলেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিনি আরও আশঙ্কা করেন, চরম চাপে পড়লে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের অঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের দিকেও হাত বাড়াতে পারেন।
জাতিসংঘের সাবেক অস্ত্র পরিদর্শক স্কট রিটার দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক আচরণ পর্যবেক্ষণ করছেন। ইরাকের কথিত গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে উন্মাদনা ছড়ানো হচ্ছিল, তখন নেতানিয়াহু মার্কিন কংগ্রেসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রিটারের মতে, তার আচরণে একটি ধারাবাহিক ধারা স্পষ্ট—বহিরাগত হুমকি অতিরঞ্জিত করা, ভয় ছড়িয়ে জনমত সংগঠিত করা এবং অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে যুদ্ধকে স্থায়ী হাতিয়ার বানানো। রিটারের ভাষায়, নেতানিয়াহু ইসরায়েলি রাজনীতির কোনো ব্যতিক্রম নন, সে ধারারই চূড়ান্ত প্রকাশ।
হিসাব-নিকাশ
নেতানিয়াহুর চারপাশের দেয়াল এখন দ্রুত সরে পড়ছে। দুর্নীতির বিচার চলছে—বিলম্বিত, স্থগিত, কারসাজিপূর্ণ; তবু অনিবার্য। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত তার এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাকে এক কৌশলগত বিপর্যয়ের প্রতীক বলে আখ্যা দিচ্ছে। এমনকি তার গোয়েন্দা প্রধানরাও আইনি ফাঁকি গোপন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
বেন-গুরিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন নেতানিয়াহু। তিনি এমন এক নেতা হতে চাইতেন, যিনি ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করেছেন, শত্রুদের গুঁড়িয়ে দিয়েছেন এবং জাতির প্রতিষ্ঠাতাদের কাতারে নিজের নাম লিখেছেন। কিন্তু ইতিহাস আজ ভিন্ন হিসাব কষছে।
নেতানিয়াহুর উত্তরাধিকার হয়ে থাকছে দুর্নীতির নথিপত্র ও যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ অথবা কসাইখানা। তার বোমার আঘাতে প্রতিটি সীমান্তে আতঙ্ক আর ক্ষোভ নিয়ে নতুন প্রজন্ম বড় হচ্ছে। ১৯৭৩ সালের পর এ অঞ্চল আর কখনো এতটা অস্থির ছিল না।
তিনি কাউকে পরাজিত করতে পারেননি। কিছু গড়তেও পারেননি। বরং ইসরায়েলকে আরও একা করেছেন, আরও বিচ্ছিন্ন করেছেন।
ইতিহাস তার প্রতি দয়া দেখাবে না। ইতিহাস এখনই তার সমাধির ফলক লিখে ফেলছে। আর তা লেখা হচ্ছে গাজার ধ্বংসাবশেষে, তার নিজের সেনাপতিদের ভাষ্যে এবং শেষ যুদ্ধের ধোঁয়া কেটে গেলে অপেক্ষমাণ অভিযোগনামায়।
যে মানুষটি বেন-গুরিয়ন হতে চান, তিনি এখন শেষ পর্যন্ত এক সতর্কবার্তা। ব্যক্তিগত টিকে থাকার লড়াই রাষ্ট্র পরিচালনার ছদ্মবেশ নিলে কিংবা অহংকারকে কৌশল বলে চালানো হলে, পরিণতি কী হতে পারে—নেতানিয়াহুর গল্প সে প্রশ্নেরই এক জোরালো উত্তর।
লেখাটি মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনূদিত; এর লেখক জসিম আল আজ্জাভি প্রখ্যাত ইরাকি সাংবাদিক ও জনপ্রিয় টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, যিনি বিশেষ করে আল জাজিরা এবং আবু ধাবি টিভিতে কাজের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর গভীর বিশ্লেষণধর্মী অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। আল জাজিরা ইংলিশের অন্যতম জনপ্রিয় শো ‘ইনসাইড ইরাক’ সঞ্চালনা করে খ্যাতি অর্জন করেন। স্পষ্টভাষী এবং নিরপেক্ষ উপস্থাপনার জন্য পরিচিত আজ্জাভি মূলত জটিল ভূ-রাজনীতিকে সহজভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন।